 |
| ছবি: (ফাইল ফটো) |
বইমেলা থেকে: দখিনা বাতাস। বসন্তের এ বাতাসের সঙ্গে মূলমঞ্চ থেকে ভেসে আসছে বেহালার সূর। সে সূর বিদায়ের! বিরহের। বিষাদের। মূলমঞ্চের সূরের সঙ্গে যেনো বাতাসও খেলা করছে! সে বাতাসের সঙ্গে ছাই উড়ছে! অগ্নিদ্বগ্ধ বইয়ের ছাই বাংলা একাডেমীর প্রাঙ্গণে যেনো বিলাপ তুলে বলছে-‘আমারও প্রাণ আছে, আমাকে হত্যার বিচার পাই নি!’।
জ্ঞানের বাহন নতুন এসব বইয়ের কান্নায় যেনো ভারি হয়ে যাচ্ছে মেলা প্রাঙ্গণ। একে একে সব বাতি নিভে যাচ্ছে। মেলা ছেড়ে যাচ্ছে মানুষ। বাংলা একাডেমীর গেট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শেষ হয়ে গেলো অমর একুশের গ্রন্থমেলা। আর এ দিকে পোড়া বইয়ের ছাই আর অর্ধদ্বগ্ধ বই পড়ে আছে মেলায়।
নানা ঘটনা দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়ে শেষ হলো চলতি বছরের অমর একুশে গ্রন্থমেলা। লম্বা সময় ধরে চলার পরও অনেকেই বলেছেন, এখনও মনে হচ্ছে, এই সেদিন শুরু হয়েছে মেলা। এরই মধ্যে কী করে যে ২৮টি দিন চলে গেছে, টেরই পেলাম না! বলা বাহুল্য, অমর একুশে গ্রন্থমেলার এই হচ্ছে বৈশিষ্ট্য। সকলেই মেলাটি ধরে রাখতে চান। বইয়ের সঙ্গে থেকে যেতে চান। তবে শুরু আছে যার, শেষ তার হবেই। মেলাও শেষ হয়ে গেছে।
শাহবাগ আর মেলা যেনো একাকার
যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে রাজপথে নেমে আসে তরুণ প্রজন্ম। গোটা জাতি একাত্ম হয় গণজাগরণ মঞ্চে। বইয়ের পাঠক, লেখক, প্রকাশকরাও শাহবাগ আন্দোলনে যোগ দেন। ফলে বিক্রি যথেষ্ট কমে যায় এবার।
ইত্যাদি প্রকাশনীর স্বত্ত্বাধিকারী জহিরুল আবেদীন জুয়েল বলেন, অন্য বছরের তুলনায় বিক্রি অনেক কম হয়েছে। শাহবাগের দিকেই এবার বেশি দৃষ্টি ছিল বইপ্রেমীদের। মেলায় তারা কম এসেছেন। আর এলেও পছন্দের বই খুঁজে নেয়ার জন্য সময় দিতে পারেন নি। ফলে বিক্রি বাড়ানো সম্ভব হয়নি। একই কারণে এবার যতো বই আসার কথা ছিল ততো বই মেলায় আসেনি বলে জানা গেছে।
ঐতিহ্য প্রকাশনীর স্বত্ত্বাধিকারী আরিফুর রহমান নাইম বলেন, এবার এক-তৃতীয়াংশ বই মেলায় আনতে পারিনি আমরা। প্রস্তুতি থাকা স্বত্ত্বেও সব দিক বিবেচনা করে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। অন্য অনেক প্রকাশনীর বেলায় একই ব্যাপার ঘটেছে। তবে এর পরও প্রকাশকরা বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে তরুণরা জেগে উঠেছে। গোটা জাতি এ আন্দোলনে একাত্ম। এটি অনেক বড় পাওয়া।
৩০৭০ বই, বিক্রি ১০ কোটি টাকা
অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ২৮ দিনে নতুন বই এসেছে ৩ হাজার ৭০টি। গ্রন্থমেলায় ২৫ ভাগ কমিশনে বই বিক্রি হয়। বাংলা একাডেমী যথারীতি ৩০ ভাগ কমিশনে বই বিক্রি করে। বাংলা একাডেমী জানায়, ২৭শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলা একাডেমী ৬৭ লক্ষ ৪০ হাজার ৭৮০ টাকার বই বিক্রি করে এবং গতকাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমীসহ মেলায় মোট বিক্রির পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি ১৪ লক্ষ ৭৩ হাজার টাকা। (একাডেমীর সাধারণ জরিপ অনুযায়ী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ২৬শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিক্রির যে হিসাব প্রদান করা হয়েছে সে হিসাব অনুসারে বাংলা একাডেমীর বিক্রিসহ মেলায় মোট বিক্রির পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি ১৪ লক্ষ ৭৩ হাজার টাকা।)
নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিবেদন দিতে পারেনি তদন্ত কমিটি
২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলায় অগ্নিকাণ্ডের প্রতিবেদন দেয়ার কথা থাকলেও বৃহস্পতিবার রাতেও প্রতিবেদন দিতে পারেনি কমিটি। বাংলা একাডেমীর পরিচালক ও গ্রন্থমেলা কমিটির সদস্য সচিব শাহিদা খাতুন মূলমঞ্চে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘‘এ বিষয়ে গঠিত তিনটি কমিটি এই ঘটনার তদন্ত পরিচালনা করছে। আশা করা যায় অতি দ্রুত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন পেশ করবে।’’
সরকারের পক্ষ থেকে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
সমাপনী আয়োজন
বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৩-র সমাপনী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন শাহিদা খাতুন। শুভেচ্ছা ভাষণ দেন ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মামদুদুর রশিদ এবং স্টেপ মিডিয়া লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা জাহিদ খান। প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমীর সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আবুল কালাম আজাদ বলেন, সৃজনশীল সমাজ গঠনে বাংলা একাডেমীর গ্রন্থমেলা বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। এই মেলার মধ্য দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির যে বাঙময় প্রকাশ ঘটে তা সত্যিই আশাব্যঞ্জক ঘটনা। তিনি বলেন, দেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে বই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে এই গ্রন্থমেলার আয়োজন সার্থক হবে।
ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, এবারে গ্রন্থমেলায় আমরা নতুনত্ব আনতে চেয়েছি। এরই ফলশ্রুতি হিসেবে গ্রন্থমেলায় কেবল প্রকাশকরা অংশগ্রহণ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, বিষাদের মধ্য দিয়ে আমরা গ্রন্থমেলাকে বিদায় জানাচ্ছি কারণ এক মাসে বাংলা একাডেমীর গ্রন্থমেলা পরিণত হয় প্রতিটি গ্রন্থপ্রেমী বাঙালির প্রাণের মেলায়।
পুরস্কার প্রদান
সর্বাধিক সংখ্যক মানসম্মত গ্রন্থ প্রকাশের জন্য এবার ‘শহীদ মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হয় ইউপিএল, শুদ্ধস্বর এবং আগামী প্রকাশনীকে। সেরাগ্রন্থের জন্য ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হয় প্রথমা প্রকাশনের ‘উয়ারি বটেশ্বর; শেকড়ের সন্ধানে’ গ্রন্থটিকে। প্রথমা প্রকাশনের পক্ষে প্রধান নির্বাহী জাফর আহমদ রাশেদ, শুদ্ধস্বরের পক্ষে প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী, ইউপিএলের পক্ষে ইফতেখার উদ্দিন শাহিন এবং আগামী প্রকাশনীর পক্ষে তিশমার হাতে পুষ্পস্তবক, ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেন সংস্কৃতি মন্ত্রী, বাংলা একামেডীর সভাপতি এবং মহাপরিচালক। গ্রন্থমেলার সাজসজ্জা ও অবকাঠামো নির্মাণ, ব্যবস্থাপনা সহযোগিতা এবং আনুষঙ্গিক সহায়তার জন্য ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড, স্টেপ মেডিয়া, এক্সপ্রেশনস এবং চ্যানেল আইকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী গোলাম সারোয়ার। সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী বুলবুল মহলানবিশ, পার্থ তানভীর নভেদ, লাইসা আহমেদ লিসা, শ্রেয়সী রায়, স্বপ্না রায়, বদরুন্নেসা ডালিয়া, শেখ জমিরউদ্দিন, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, জয় শাহরিয়ার, সরদার মো. রহমাতুল্লা, দিলদার হোসেন মুক্তার এবং মো. মুরাদ হোসেন বাদল।
বাংলাদেশ সময়: ২০০০ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৩
এডিএ/জেডএম