 |
কাকিমাপুরাণ
আমরা তিনজন বড় কম ভাড়াতে থাকি
যুবতী কাকিমা নুনধরা ছাতে হেঁটে বেড়ায়
প্রতিদিন মেলে দেয় ছাদের রোদ্দুরের বাসি আর বিষণ্ন ব্রা
বইখাতা খুলিনি, আজ বাতাসে লোডশেডিং
নিজের ঘরটি শরীরের সঙ্গে বহন করে
গলিটার মোড় থেকে ফিরে আসি।
সন্ধ্যা নেমে এলে
অভিমন্যুর মতো আমরা তিনজন ঢুকে যাই
কাকিমার মৃত অন্তর্বাসে।
আধুনিক মানুষ
টিকে থাকা বংশ বিস্তার কুকুরও ভাবে
(মগজ থাকলে সেও মার্কস হতো)
একত্রে বসবাসের এই ফিউডাল ধারণা নিয়ে
আমার ভাই
পুরোনো থ্রি নট থ্রি সিরিশ কাগজে ঘঁষে
অবিকল গুহা মানুষের মতো
লোকাল পূর্ণিমায় একবার আমি সলঙ্গা গিয়ে
নিশির প্রেমে পড়েছিলাম
আমি অতিক্রম করেছিলাম
আমার পৌত্রের প্রজন্ম
আমি তো রক্তের ভেতর কোনো স্বপ্ন খুঁজি না
এই জৈবিকতা আমার হেডমাস্টার পিতাকে মানায়
ভিড়বাসের দাঁত খিঁচানো কন্ডাক্টরের
বগলের নিচে নির্ভুল নির্জনতা
যিশুর জন্মের দুই হাজার বছর পরের মানুষেরা
খুব নিঃসঙ্গ হয়,
অনন্তকাল শুধু ঘুরে ঘুরে থেমে থাকে
অনন্তকাল।
তোমরা নিদ্রাহীনতার ওষুধ খোঁজো
বোঝো না
শোনিতের অন্ধকারে
সিদ্ধার্থের শঙ্খ।
আবদুল বারী
কোনো কোনো দুপুরে হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে
অপরিসীম দুঃখের ভেতর
ধীরে ধীরে চেতনায় ফিরে আসে সৌরসংসার
আমি এই পৃথিবীর জীব!
অলঙ্ঘনীয় গ্রিক ট্রাজেডির মতো
মানুষের অর্থহীন আবর্তন
কেন এসেছি এখানে?
এই চেতনা, অনুভূতি, বোধ
অস্তিত্বের উপলব্ধি,
‘আমি’ ‘আমি’
মফস্বলী কিশোরের ব্যক্তিগত রুম
মধ্যাহ্নে ফেটে পড়ে গুমোট চিৎকারে!
আর আপনি সব বুঝে নির্বিকার
যন্ত্র হয়ে গেছেন
দুঃখ আর দুর্বলতা কেন লুকান পিতা
ইতিহাস কালো করে।
আপনাদের প্রজন্মকে আমরা এখন
মূল্যায়ন করতে শিখেছি,
পিতা, আমি হতাশ হইনি
বৃদ্ধির আবেগ সত্তার এই ভূলোকে
জনগণকে আমরা বিশ্বাস করি না
জানি, ইতরের মতো উদার তারা,
গণহিস্টিরিয়াকে একসময় আপনারা শ্রেণীঐক্য ভাবতেন।
বদরুদ্দীন উমরের সাথে যখন আপনার ঐক্য হলো না
তখন আপনি কেন বুঝলেন না
মানুষ আলো চায়
তাই ফিরে আসে।
‘প্রচলিত মুসলিম আইন অবাঞ্ছিত শিরঃপীড়া’ লিখে
আপনি যখন বিশেষ ক্ষমতা আইনে
গারদের ভেতর
সফেদালীর কুনিগাঙের গল্প শোনেন
তখন আপনার মগজের আত্মীয়রা কে কোথায়
মোহর খুঁজছিলেন, আপনি জানেন?
আপনার চিন্তার স্বজনরা এখন কোথায়?
১৯৯৮ সনে আপনি
আকিরা কুরোশাওয়ার
‘ইকিরু’ হয়ে যান।
পাঠাগারের নতুন প্রস্তাবিত প্রজেক্ট প্রোফাইলে একটি
স্মার্ট অনুবাদ করে দেবার মতো সময়
এখন কমরেড আহমদ ছফার নেই।
উনি তো জানেন না, আপনার
দুপুরের আহার অর্থের দায়ভারে
বিজ্ঞান উপুড় হয়ে থাকে ভাতের থালায়।
‘প্রাকসিস জার্নাল’-এর নিষিদ্ধ পাতা একদিন আমাকে
এক গুহার কাছে এনে
বিশ্বাস করেন পিতা
আমাকের একফোঁটা আলোও দেয়নি।
কোথায় আছেন সলিমুল্লাহ খান? আমি জানি না
সইফ উদ দাহার মরে গেলেন
আবুল কাশেম ফজলুল হক ‘লোকায়ত’-এর মানুষের বিকাশের
বাংলা বানান নিয়ে মাথা ঘামান
রাজা রামমোহন হয়ে আহমদ শরীফ
উদ্বিগ্ন থাকেন।
পিতা আপনার স্বপ্নের ভেতর শুধু
ডাহুক নেমে আসে।
কিছুই পাননি বলে আপনি আহা সাধু
পিতা, এই অসঙ্গত অন্ধকার জানে
মিলিত মানুষ কখনো আমাকে ডাকেনি
বরং আমি ডেকেছি তাদের
কেননা নিঃসঙ্গপ্রিয় মানুষ কখনো একা থাকতে পারে না
আপনি জানেন
রোদ্দুরে বালকের হাতে অপ্রয়োজনীয় চন্দ্রমল্লিকা
আজো অর্থহীন নয়
মানুষ একত্র হলে নিঃসঙ্গ হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শিল্পমুদ্রা
মানুষের স্বাভাবিক সমূহ পতন
পিতা, অন্ধকারের আত্মার ভেতর
আমি কোনো মোহর খুঁজতে নামিনি।
কোথায় ফিরবো জানি না
একদিন ঘোরের মধ্যে
খুব সন্ধ্যায়
পতন আমাকে ডেকেছিলো, পতন।
সুবোধ প্রেমিকের মতো, আমি
তার গালে গাল রেখেছিলাম
প্রায় আমাকে বাড়ি ফিরতে হতো রাত্তিরে
ফেরার পথেই ছিলো
তিতির কান্নার মতো এক নিস্তব্ধ মাঠ
মাঝে মাঝে কী হতো জানি না
রক্তের নালার মতো ফেরবার সরুপথ-
দুপাশের অদ্ভুত জমাট শূন্যতা
একেক দিন আমাকে কীভাবে যে ছুঁয়ে দিতো
সেদিন আমার ফেরা হতো না
সারারাত আবর্তিত বুকের দহ
কোথাও ফিরতে ইচ্ছে করতো না আর
শৈশবের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক ছিলো না
পাটের গন্ধে ফিরে আসা সহসা কৈশোর
আমার দৃশ্য জুড়ে শুধু পিতাহীন অরণ্য প্রহর
পিতা আমাকে ফিরতে বলে এখন
অথচ
শৈশবের বিষণ্ন কান্নায়
তার বুক আমার ছিলো না।
আমি ছিলাম রোগা ভোগা
প্রায়ই জ্বরের ঘোরে বেঘোরে কেটে যেতো
‘দি এ টিম’-এর রাতগুলো।
এখন আমার বিশ্বাস হয় না
উষ্ণ ভাতের মতো রাতের বেলা
বাবা আমার বিছানার পাশে পায়চারি করতেন
এক সময় নিঃসাড়ে উঠে এসে
বলতেন, ‘সোনালী শাহজাদা’র কথা।
বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরতেন
আমি খুব অস্বস্তি বোধ করতাম
অসুস্থ শরীর বুকের মমত্ব বোঝে না
বাবা সম্রাট বাবরের গল্প বলতেন
আমি বিহ্বল হয়ে সত্যি বিশ্বাস করেছিলাম,
এক অলৌকিকতা প্রত্যক্ষণের আশায় উৎকণ্ঠায়
ছটফট অস্বস্তি নিয়ে নিশ্চুপ
বুঝতে চাইতাম
আমার বুকের জ্বরগুলো বাবার বুকে যায় কিনা!
আমি আজো বুঝি না
বয়স কেন দূরত্ব এনে দেয়!
অভিজ্ঞতা, সংগ্রহ, পরিচয়তা কেন
মানুষকে ক্রমশ নিঃসঙ্গ একলা করে দেয়
একদিন বিকেলে আমার কোথাও যাবার জায়গা ছিলো না
আমি নিজের আত্মার পায়ে হাঁটু মুড়ে বসে
এক মুঠো অন্ধকার চেয়েছি।
পতনের আছে অন্ধকার
সৃষ্টির শুরু অন্ধকারে
অন্ধকার থেকে উঠে আসা এই প্রাণ
আসলে পতনে আছে টান
জন্মের টান আমাকে পতনে ফেরায়
এই যে পৃথিবী
সবাই নিজস্ব কূপে বসবাস করে
অনন্ত আকাশ ভেবে
আমার বুকে ধস নেমে যায়
নিঃশব্দ থেকে উঠে আসে কোলাহল
পতনের মতো সুতীব্র টান
আমি কোথাও অনুভব করি না,
এমন কি যাকে না পেলে আমার পৃথিবী
মিথ্যে হয়ে যায়
তার স্পর্শও আমাকে এতোটা ছোঁয় না
আমাকে ফিরতে বলো
কোথায় ফিরবো!
বাংলাদেশ সময় : ১২৪১ ঘণ্টা, ২৪ জানুয়ারি ২০১৩