 |
যশোর: ৬ মার্চ, বুধবার যশোরের ভয়াবহ উদীচী ট্র্যাজেডির ১৪তম বার্ষিকী। ১৯৯৯ সালের এই দিনে যশোর টাউন হল মাঠে সাম্প্রদায়িক একটি চক্র বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর জাতীয় সম্মেলন মঞ্চে বর্বরোচিত বোমা হামলা চালায়।
এতে ১০ জন নিহত ও ২ শতাধিক নারী-পুরুষ আহত হন। মর্মান্তিক এ ঘটনার পর মামলা হলেও বিচার কাজ শেষ হয়নি হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছরেরও। থমকে রয়েছে মামলার কার্যক্রম। ন্যায় বিচার না পেয়ে হতাশ নিহতের স্বজন ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা।
শোকাবহ এ দিনটিকে সাংস্কৃতিক অঙ্গণের ‘কলঙ্কিত দিন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। প্রতিবছর এ দিনটিতে শহীদের স্মরণসভা, মশাল প্রজ্জ্বলন ও প্রতিবাদী গানসহ নানা কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন সংস্কৃতি অঙ্গণের কর্মী ও শহীদদের পরিবারের সদস্যরা।
প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী শহীদদের স্মরণে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
উদীচী-র যশোর শাখার সাধারণ সম্পাদক ডিএম শাহিদুজ্জামান বাংলানিউজকে জানান, ১৪ বছর আগে ৬ মার্চ গভীর রাতে যশোর টাউন হল ময়দানে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক মঞ্চস্থলে বর্বরোচিত বোমা হামলায় নিহত হন ১০ জন এবং আহত হন ২ শতাধিক। ওই ঘটনায় অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
অথচ হত্যাকাণ্ড ও বিস্ফোরণ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আজও শাস্তির মুখোমুখি করা সম্ভব হয়নি। যদিও ঘাতকদের বিচার করতে সরকার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। তবে, আপিলের পর খালাসপ্রাপ্তদের আত্মসমর্পণ করিয়ে জামিন দেওয়া ছাড়া মামলার বিচারিক কোনো অগ্রগতি হয়নি।
তিনি বলেন, “যেভাবেই হোক, মামলার বিচার কাজ আবার শুরু করার দাবি করছি। আমরা চাই, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক!”
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ১৪তম বার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী যশোর শাখা ৬ মার্চ বুধবার বিভিন্ন কর্মসূচির গ্রহণ করেছে। এ কর্মসূচির মধ্যে বিকেল ৫টা ১ মিনিটে উদীচী কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদী গান ও সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে টাউন হল মাঠের শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হবে।
একই স্থানে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে মশাল প্রজ্বলন করা হবে।
যেভাবে বোমা হামলা:
১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোর টাউন হল মাঠে আয়োজিত বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের শেষদিন ছিল। এদিন রাত ১টার দিকে মঞ্চের পেছনে পর পর দুটি শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটে।
এতে প্রাণ হারান নূর ইসলাম, নাজমুল হুদা তপন, সন্ধ্যা রাণী ঘোষ, ইলিয়াস মুন্সী, শাহ আলম বাবুল, বাবুল সূত্রধর, শাহ আলম, বুলু, রতন রায় ও রামকৃষ্ণ।
আহতদের কেউ দুই পা, কারো এক পা, কারো হাত, কেউবা শ্রবণশক্তি হারিয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেন। এ ঘটনার পর দিন অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার পূর্বাপর অবস্থা:
উদীচী হত্যাযজ্ঞের পর মামলা হলে ১৯৯৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলামসহ ২৪ জনের নামে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
পরে তরিকুল ইসলামের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত অভিযোগপত্র থেকে তার নাম বাদ দিয়ে দেয়। পরে ২০০৬ সালের ৩০ মে যশোরের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল আদালত এ মামলার রায়ে ২৩ আসামির সবাইকে বেকসুর খালাস দেন।
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ন্যায়বিচার হয়নি বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পুনর্তদন্তের আবেদন করলে মামলাটির বর্ধিত তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডিকে।
মামলায় নতুন মোড়:
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে গ্রেফতার হলে উদীচীর বোমা হামলা মামলা নতুন মোড় নেয়।
এ বছরের ১৯ নভেম্বর আদালতে হান্নান তার দেওয়া জবানবন্দিতে উদীচী বোমা হামলায় নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তার স্বীকারোক্তিতে পুলিশ হরকাতুল জিহাদের সদস্য বরিশালের আবুল হোসেন ও মাদারীপুরের মাওলানা আবদুর রউফকে আটক করে।
এরপর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর উদীচী মামলার রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা হয়। ২০১১ সালের ৪ মে সরকারের দায়ের করা আপিলটি গ্রহণ করেন বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান মিয়া ও কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। এর ফলে, মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়।
এ মামলার খালাসপ্রাপ্তদের আবার আত্মসমর্পণের জন্য সমন জারির নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত। এ সংক্রান্ত একটি পত্র ২০১১ সালের ২০ জুন যশোর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এসে পৌঁছায়।
এরপর ২১ জুন খালাসপ্রাপ্ত ২৩ আসামির বিরুদ্ধে সমন জারি করেন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।
কিন্তু এর আগেই খালাসপ্রাপ্ত ২৩ জনের মধ্যে মহিউদ্দিন আলমগীর, আহসান কবীর হাসান ও মিজানুর রহমান মিজান নামে ৩ জনের মৃত্যু হয়। আদালতের কাছে তাদের মৃত্যুর কাগজপত্র দাখিল হওয়ায় বাকি ২০ জনের বিরুদ্ধে সমন জারি করা হয়।
সমনে উল্লেখ করা হয়, এক মাসের মধ্যে সবাইকে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে হবে। এর পর ১৭ জন বিভিন্ন সময়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। কিন্তু, শফিকুল ইসলাম মিন্টা, শরিফুল ইসলাম লিটু ও সোহরাব নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করায় তাদের বিরুদ্ধে ২৪ জুলাই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন আদালত।
মামলার সর্বশেষ অবস্থা:
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি আটক হন এ মামলার অন্যতম আসামি শফিকুল ইসলাম মিন্টা। পরবর্তী সময় তাকেও এ মামলায় জামিন দেন আদালত। পরে আর এ মামলার কার্যক্রম এগোয়নি।
আর্থিক সহায়তা:
এক যুগ পর ২০১১ সালে ২৪ জানুয়ারি উদীচীর সম্মেলনে নিহত ও আহত অস্বচ্ছল ১১ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ১৪ লাখ টাকার চেক বিতরণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে দেওয়া হয় এ অর্থ সহায়তা।
শহীদদের স্মরণ:
শহরের টাউন মাঠে ১০ শহীদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে। প্রতি বছরে এখানে ৬ মার্চ পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্যে দিয়ে শহীদদের স্মরণ করা হয়।
বাংলাদেশ সময়: ০০৪০ ঘণ্টা, মার্চ ০৬, ২০১৩
সম্পাদনা: প্রভাষ চৌধুরী, নিউজরুম এডিটর, আশিস বিশ্বাস, অ্যাসিস্ট্যান্ট আউটপুট এডিটর