ঢাকা: সাভার ট্র্যাজেডি রানা প্লাজা ধসের ঘটনা যেন অসংখ্য মানুষের ‘বিষাদ সিন্ধু’তে পতিত হওয়া। আর ভবনের মালিক সোহেল রানা অবক্ষয়িত সমাজের নষ্ট প্রজন্মের প্রতিনিধি। তবে ভয়াবহ এ ঘটনায় শোকের ভেতরও মনবতার চিহ্ন রাখতে সক্ষম হয়েছি আমরা।
সাভারে ভবন ধসের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান এমনই মন্তব্য করেছেন।
কমিটির প্রধান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইন উদ্দিন খন্দকার বুধবার বিকেলে সচিবালয়ে চারশ’ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
মাইন উদ্দিন খন্দকার বলেন, রানা প্লাজা ধসের ট্র্যাজেডি আমাদের তৈরি পোশাকখাতের ভাবমূর্তিকে প্রচণ্ডভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শ্রমকিদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। তার এখন কারখানায় ঢুকতে গিয়ে ফাটল খুঁজে বেড়ায়।
এ দেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্পের উন্মেষকাল সুদীর্ঘ নয় উল্লেখ করে মাইন উদ্দিন বলেন, এক্ষেত্রে শিল্প মালিকেরা মূলত প্রথম প্রজন্ম মালিক। সঙ্গত কারণে কারখানা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কারিগরি ও সামাজিক জ্ঞানের ব্যাপক ঘাটতি ছিল। প্রথম প্রজন্মের শিল্প মালিকেরা অতি মাত্রায় মূদ্রামোহগ্রস্ত থেকেছেন। তাদের মধ্যে সামাজিক, পরিবেশগত ও মানবিক দায়গ্রস্ততার ঘাটতিও প্রবল। তাই বারবার পোশাক কারখানায় মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে।
বিপনী বিতান রানা প্লাজায় কারখানা স্থাপন করা হয়েছে জানিয়ে কমিটির প্রধান বলেন, ভবন ধসে বহু পরিবার বিপন্ন হয়েছে। শত শত গরিব-নিম্নবর্গের পরিবার সর্বশান্ত হয়েছে। হাজার হাজার স্বপ্ন ধুলিস্মাৎ হয়েছে। অজুত কষ্টের সিন্ধু রচিত হয়েছে। যে কষ্ট, যে দুঃখ, যে স্বপ্ন ভঙ্গ তা অপূরণীয়।
তাদের আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন কমিটির প্রধান।
সোহেল রানাকে ভবন নির্মাণের অযোগ্য উল্লেখ করে মাইন উদ্দিন খন্দকার বলেন, তিনি উঠে এসেছেন অবক্ষয়িত সমাজের ভেতর থেকে। ভোগবাদ ও আধুনিক মুক্তবাজার অর্থনীতির বিকৃত ব্যবস্থার ভেতর থেকে উঠে আসা এ মানুষ হঠাৎ করে কালো টাকার বিপুল মালিক হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করে টাকা দিয়ে সব কিছু করতে চাইতেন।
ভবন মালিকের হঠাৎ কালো টাকার মালিক বনে যাওয়া ও মূদ্রালোভই এ সামাজিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। এ ধস অবক্ষয়িত সমাজের প্রতীকী ধস। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে অন্যায় করে কেউ পার পেতে পারে না।
তবে এ ভয়াবহ ঘটনার মধ্য দিয়ে মানবিকতা ও অনেক গৌরবের ইতিহাসও বের হয়ে এসেছে বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি।
বিভিন্ন পর্যায়ে ১৫০ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে জানিয়ে কমিটির প্রধান বলেন, এ মৃত্যুকূপে যারা পতিত হয়েছিল তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। চিকিৎসকদের প্রশ্ন করা হয়েছে। আটকে পড়াদের উদ্ধার করতে প্রাণপণ যুদ্ধ করেছে। একজনকে বাঁচাতে কায়কোবাদ অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃতুবরণ করেছেন।
এ ঘটনা কেবল ভয়াবহ শোকের পাদপীঠ নয়, অনেক গৌরবেরও উত্থান স্থল। আমরা যে মহানুভব, মানুষের বিপন্নতায় পাশে দাঁড়াতে পারি, মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য এমন অসংখ্য ছোট ছোট গৌরবের ঘটনা সংগঠিত হয়েছে। এদিক থেকে এ ঘটনা দুঃখ-গৌবরময় হয়ে ইতিহাসে পরিণত হয়েছে।
রানা প্লাজা ধসের পর মাইন উদ্দিন খন্দকারকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ভবন ধসের পাঁচটি কারণ, সাতটি পর্যবেক্ষণ ও মতামত এবং ১২টি দীর্ঘমেয়াদিসহ তিনটি আশু চূড়ান্ত সুপারিশ করেছে।
ভবন ধসের ঘটনার জন্য রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা, ওই ভবন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত এবং পাঁচ গার্মেন্টস মালিককে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
ভবন নির্মাণে নানা অনিয়মে সহযোগিতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দণ্ডবিধির ৩০৪ এবং ৩৪ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া পোশাক শিল্পের জন্য একটি পল্লী গড়ে তোলা ও ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণের সুপারশিও করেছে কমিটি।
বাংলাদেশ সময় ২২২৪ ঘণ্টা, মে ২২, ২০১৩
এমআইএইচ/সম্পাদনা: মাহমুদুল ইসলাম, নিউজরুম এডিটর/ সাব্বিন হাসান, আইসিটি এডিটর