৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, সোমবার মে ২০, ২০১৩ ৯:৩৫ পিএম BDST banglanew24
16 Mar 2013   11:53:18 AM   Saturday BdST
E-mail this

আইসিএলের ৩৬ শাখায় তালা: দিশেহারা ৫ লাখ বিনিয়োগকারী


আদিত্য আরাফাত, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আইসিএলের ৩৬ শাখায় তালা: দিশেহারা ৫ লাখ বিনিয়োগকারী

ঢাকা: কেউ জমি বিক্রি করে, কেউবা তিলে তিলে জমানো সব সঞ্চয় জমা দিয়েছেন। ব্যাংক থেকে চলতি ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙিয়েও জমা দিয়েছেন আইডিয়াল কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডে (আইসিএল)। অতিরিক্ত মুনাফার লোভ দেখিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে তিন হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে আইসিএল। টাকা হাতিয়ে পালিয়ে গেছেন এর মূল প্রতিষ্ঠান আইসিএল গ্রুপের কর্মকর্তারা।

বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে যারা টাকা জমা দিয়েছেন তাদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের। টাকা পাওয়ারও কোনো আশ্বাস নেই। প্রধান কার্যালয়সহ ৩৬টি শাখায় তালা লাগিয়ে লাপাত্তা হয়ে আছেন এর কর্মকর্তারা। এমন অবস্থায় সর্বস্ব হারিয়ে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এতে বিনিয়োগকারীরা।
 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আইসিএল গ্রুপের নাম সর্বস্ব ১৩টি প্রতিষ্ঠান ফেলে রেখেই উধাও হয়ে যান গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও মূল উদ্যোক্তা শফিকুর রহমানসহ পরিচালকরা। এক সপ্তাহ ধরে তালা ঝুলছে রাজধানীর পুরানা পল্টনে প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৬টি শাখা কার্যালয়ে। প্রায় পাঁচ লাখ গ্রাহক তাদের সর্বস্ব খুইয়ে এখন দিশেহারা।
 
গ্রাহকরা জানান, আইডিয়াল কো-অপারেটিভ সোসাইটি ২০০১ সাল থেকে দ্বিগুণ মুনাফার লোভ দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে হজ আমানত, ডিপিএস, মাসিক মুনাফা, দ্বিগুণ বৃদ্ধি আমানত, শিক্ষা আমানত, আবাসন আমানত, ব্যবসায়িক আমানত, দেনমোহর আমানত, কোটিপতি ডিপোজিট স্কিম, লাখপতি ডিপোজিট স্কিম প্রকল্পের নামে অর্থ সংগ্রহ করে।

গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে পাঁচ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানতের পরিমাণ তিন হাজার কোটি টাকার বেশি।
 
অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এমডি শফিকুর রহমানের অন্যতম সহযোগী ছিলেন তাঁর স্ত্রী ও আইসিএল গ্রুপের পরিচালক কাজী সামসুন নাহার মিনা, শ্যালক ও পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলাম, ভাগ্নে ও পরিচালক শেখ আহামেদ এবং ঘনিষ্ট বন্ধু পরিচালক এসএম মোর্শেদ জুয়েল।
 
ভবন মালিকের গচ্চা পাঁচ কোটি টাকা
রাজধানীর পুরানা পল্টনের ৬০/ই/১ দেওয়ান কমপ্লেক্সেই ছিল আইসিএল গ্রুপের প্রধান কার্যালয়। ভবনটির তিনটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে পাঁচ বছর ধরে আইসিএল গ্রুপের আইডিয়েল কো-অপরারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডসহ ১৩টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল। সাধারণ গ্রাহকদের পাশাপাশি প্রতারণার শিকার হয়েছেন দেওয়ান কমপ্লেক্সের মালিক নূর উদ্দিন দেওয়ানও। এমডি শফিকুরের ফাঁদে পা দিয়ে নূরউদ্দিন দেওয়ান আইডিয়েল কো-অপরারেটিভ সোসাইটিতে ডিপোজিট হিসাবে রেখেছিলেন চার কোটি টাকা। সেই ডিপোজিটের টাকা এবং প্রধান কার্যালয়ের বকেয়া ভাড়া প্রায় কোটি টাকা না দিয়ে হঠাৎ গত ২২ ফেব্রুয়ারি উধাও হয়ে যান শফিকুরসহ আইসিলের পরিচালকরা। আইসিলের ব্যবহৃত আসবাবপত্র ওই ভবনেই তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। ভবনের বাইরে টানানো একটি নোটিশে উল্লেখ আছে, মধ্যবাড্ডার আইসিএল গার্ডেন সিটিতে পৃথক বুথ খুলে কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। কিন্তু গত কয়েকদিন মধ্যবাড্ডার আইসিএল গার্ডেন সিটিতে গিয়ে কোনো কর্মকর্তাকেই পাওয়া যায়নি। এমনকি আইসিএল গ্রুপের এমডি শফিকুর রহমান এবং গ্রুপের একাধিক পরিচালকের মোবাইল ফোনে কল করেও সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়।
 
দেওয়ান কমপ্লেক্সের তত্ত্বাবধায়ক বজলুর রশিদ বাংলানিউজকে বলেন, “আইসিএল গ্রুপ আমাদের মালিকের (নুরউদ্দিন দেওয়ান) চার কোটি টাকার ডিপোজিট এবং বকেয়া ভাড়া বাবদ আরো এক কোটি টাকা না দিয়েই হঠাৎ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে উধাও হয়ে গেছে। কোথাও তাদের খুজেঁও পাওয়া যাচ্ছে না।”
 
টাকা হাতিয়ে কর্তারা উধাও
সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে উধাও হয়ে গেছেন এর কর্মকর্তারা। আইসিএল গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মনজুরে মওলা মোবাইল ফোনে বলেন, “আইসিএল কর্তৃপক্ষ কাউকে কিছু না বলেই আইসিএল গ্রুপের প্রধান কার্যালয় বন্ধ করে দিয়েছে। এমডি শফিকুর রহমানসহ কাউকেই খুজেঁ পাওয়া যাচ্ছে না। এমডিসহ সব পরিচালকের মোবাইল ফোন বন্ধ পাচ্ছি। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা এখন আমাকে নানাভাবে হয়রানি করছেন। কর্তৃপক্ষ এমনভাবে উধাও হয়ে যাবে এটা আমি কল্পনা করতে পারিনি।”
 
লালবাগের নবাবগঞ্জ শাখায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা আমানত রেখেছিলেন মো. রিপন মিয়া। তিনি বলেন, “ভাই, ব্যবসার পুরো টাকা জমা রাখছিলাম আইসিএলে, কিন্তু এখন কাউরেই পাইতাছি না। মাথা ঠিক নাই, কি করমু।’’ মো. হাসান বলেন, “আমার চাচা, ছোট ভাই তিনজন মিলে ৩২ লাখ টাকা আমানত রেখেছিলাম ওয়ারি শাখায়, কিন্তু হঠাৎ দেখি ওদের সব অফিস বন্ধ। ওরা সবাই এখন আত্মগোপনে চলে গেছে। টাকা না পেলে অনেক সমস্যায় পড়ে যাব।”
 
কুমিল্লার লক্ষাধিক গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত
প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের একটি বড় অংশ কুমিল্লার। আইসিএল গ্রুপের এমডি শফিকুর রহমানের গ্রামের বাড়িও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। জানা গেছে, কুমিল্লায় ৬টি শাখার লক্ষাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এর সত্যতা স্বীকার করে বাংলানিউজকে বলেন, “হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে ধোকা দিয়ে আইসিএল গ্রুপের এমডি শফিকুর রহমান উধাও। ভুয়া প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়েছে। আমার নির্বাচনী এলাকার প্রতারিত অনেক গ্রাহক আমার কাছে অভিযোগ করছেন।”
 
তিনি বলেন, “আইসিএল গ্রুপের সঙ্গে জড়িত না হতে বিভিন্ন সভা সেমিনারেও বলেছিলাম যে, শফিক জামায়াতের ক্যাডার এবং প্রতারক। তার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আপনারা লেনদেন করবেন না, কিন্তু তবুও মানুষ সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত হয়েছে।”

আইসিএলের এমডি যেন দেশ ত্যাগ করতে না পারে সেই জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে বলা হয়েছে বলে মন্ত্রী জানান। গ্রাহকদের অভিযোগ, আইডিয়েল কো-অপারেটিভ থেকে উচ্চহারে লভ্যাংশ দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন ধরনের আমানত হিসাবে টাকা সংগ্রহ করে এবং নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান চালু করার কথা বলা হতো। রেডিও-টেলিভিশনেও এই গ্রুপের চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলা হয়। রিয়েল এস্টেট এবং হাউজিং প্রকল্পের বেশির ভাগ জমি এবং নির্মাণাধীন ভবন বিক্রি করে টাকা নিয়ে ওরা পালিয়েছে।

নামসর্বস্ব অনেক প্রতিষ্ঠান
আইসিএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে আইডিয়েল কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, আইসিএল রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, আইসিএল এগ্রো ফুড অ্যান্ড মিল্ক প্রডাক্টট লিমিটেড, আইসিএল সিএনজি ফিলিং স্টেশন লিমিটেড, হাবিব এভিয়েশন সার্ভিস লিমিটেড, আইসিএল সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, রিয়াদ ইন্টারন্যাশনাল (প্রা.) লিমিটেড, আইসিএল এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, আইসিএল হেলথ সার্ভিস সেন্টার, দি ইউএস-বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড, আইডিয়েল ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড কমার্স লিমিটেড, রেসেনা ম্যাগাজিন ও আইসিএল সুপার শপ। এগুলোর মধ্যে আইসিএল সল্ট, রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট এবং এডুকেশন ডেভেলপমেন্টের নামে একটি মাদ্রাসা, হেলথ সার্ভিসের নামে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অস্তিত্ব থাকলেও বাকি নয়টি প্রতিষ্ঠানেরই অস্তিত্ব নেই। ওইসব প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে টাকা।
 
অনুসন্ধান করবে দুদক
জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতারণার কারণে আইসিএল গ্রুপের বিরুদ্ধে শিগগিরই অনুসন্ধান করবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসে এ বিষয়ে অনুসন্ধান কমিটি গঠন হতে পারে।
 
বাংলাদেশ সময়: ১১২০ ঘণ্টা, মার্চ ১৫, ২০১৩
এডিএ/আরআর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

অর্থনীতি

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান