 |
(কবিতাসংশ্লিষ্ট সাতটি নির্ধারিত প্রশ্ন নিয়ে ‘সপ্তজিজ্ঞাস’ নামের এ আয়োজন। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমের পক্ষ থেকে তানিম কবিরের করা প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়েছেন কবি শোয়াইব জিবরান)
কবিতা কেন লিখেন— একজন কবি এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে বাধ্য কি না? যদি বাধ্য নন— তো কেন? আর হোন যদি— আপনার প্রতিও একই প্রশ্ন; কেন লিখেন কবিতা?
একখণ্ড পুরিষকে বা একটি গোলাপকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় গন্ধ কেন ছড়াও? সে কী বলবে? কেননা, সেটি সে ইচ্ছে করে ছড়ায় না। ওটি তার সত্তার অংশ। কবিতাও আমার সত্তার অংশ। না লিখে পারি না। ছেড়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি। ভেবেছি কী হয় এসব লিখে। আরও সম্মানজনক অনেক কিছু আছে করার। লাভ হয়নি। সিফিলিস রোগের মতো ফিরে ফিরে আসে। গোপন প্রেমিকার মতো কবিতা ফিরে ফিরে আসে। সাড়া না দিয়ে পারি না গো!
‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’— এই ‘কেউ কেউ’ বা ‘কারও কারও’ কবি হয়ে ওঠায় ঐশীপ্রাপ্তির কোনও ঘটনা থাকে কি? নাকি পুরো ব্যাপারটাই রেওয়াজ নির্ভর? আপনার কী মনে হয়?
কবিতা অনেক রকম। বাবু ভালো কবিতা লিখেছেন বলে এমনটি বলে গেছেন। সকলেই কবি। এখন অমুক কবি আর ওমুক কবি নয়— এমনটি বলার কোনো ভিত্তি নেই। কেননা, কবিতার কোনো জংধরা লোহার বাটখারা নেই যে মেপে বলবো ওটি এককেজি ওজনের কবিতা হয়নি। বিষয়টি হয়েছে আমার কবিতা আমার মতো ওর কবিতা ওর মতো। আর কবিতা আমি একা লিখতে পারি না। আমি আর আল্লাহ দু’জনে মিলে লিখি। সে হিসেবে আমার কবিতাকে ঐশীপ্রাপ্তই বলতে পারেন।
এখনকার কবিদের ছন্দবিমুখতার কারণ কী বলে মনে হয় আপনার? কবিতার জন্য ছন্দের প্রয়োজনীয়তা কতোটুকু? কবিতার স্বতঃস্ফূর্ত বিস্তারে ছন্দ আপনার কাছে সহায়ক নাকি প্রতিবন্ধক?
ছন্দ ছাড়া আবার কিছু হয় নাকি? সবকিছুতে ছন্দ আছে। নীরেন্দ্রনাথ ছন্দের ক্লাশে যেমনটি বলেছিলেন— মেয়েটি লাফ দিয়ে রাস্তা পার হলো এর মধ্যেও ছন্দ আছে। এখন ব্যাপার হচ্ছে ছন্দ বলতে আমি কী বুঝি। ছন্দ বলতে যদি অন্ত্যমিল বুঝি তাহলে বলার কিছু নাই। গদ্যের মধ্যেও ছন্দ আছে। ছন্দ আমার কবিতার সহায়ক, অন্ত্যমিল প্রতিবন্ধক।
দশকওয়ারী কবিতা মূল্যায়নের প্রবণতাটিকে কিভাবে দেখেন? আপনার দশকের অন্যান্য কবিদের কবিতা থেকে নিজের কবিতাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার উপাদানসমূহ কী বলে মনে হয় আপনার?
দশকওয়ারি বিচার পশ্চিমা সাহিত্যে প্রচল রয়েছে। বুদ্ধদেব বসু ওটি বাংলা সাহিত্যে আমদানি করেছেন। মাইক্রো লেবেলে বিচারের ক্ষেত্রে এটি বেশ কাজের। এখন যে কবি লিখছেন তাকে যদি দেড়হাজার বছরের ইতিহাসের প্রেক্ষিতে দেখা হয় তাহলে তাঁকে বালছাল মনে হতে পারে। কিন্তু দশকবছরের ফ্রেমে দেখলে একটা জায়গা তাঁকে দেয়া যাবে। হ্যাঁ একটা সময়ে তাঁকে দেড়হাজার বছরের সাথেই লড়াই করে দাঁড়াতে হবে। সে সময়টা তাঁকে দিতে হবে। আমার কবিতা কিভাবে আলাদা সেটা তো পাঠক বলবেন। আর আমি একা এটির উত্তর দিতে পাররো না। আমার আল্লাহকে জিজ্ঞাসা করতে হবে। বলেছি তো আমরা দু’জনে মিলে লিখি।
তিরিশের দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত— প্রত্যেকটি দশক থেকে যদি তিনজনের নাম করতে বলা হয় আপনাকে— কারা আসবেন? উল্লিখিত কালখণ্ডে কোন দশকটিকে আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়?
বলেছি তো সবাই কবি। তাই সবাই আসবেন। বৃহৎবাংলার কবিতার জন্য ত্রিশের দশক আর বাংলাদেশের কবিতার জন্য ষাট ও আশির দশক। ষাট দশকে ভালো কবিতা লেখা হয়েছিলো আর আশির দশকে বাংলাদেশের কবিতা তারল্য থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলো।
দেশভাগোত্তর দুই বাংলার কবিতায় মৌলিক কোনও পার্থক্য রচিত হয়েছে কি? এ-বাংলায় ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন। ওপার বাংলায়ও নকশালবাড়ি আন্দোলনসহ উল্লেখযোগ্য কিছু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন— এসমস্ত কিছুর আলাদা আলাদা প্রভাব কবিতায় কতোটা পড়েছে বলে মনে করেন?
উত্তরটি জন্য একাডেমিক গবেষণার প্রয়োজন। আমি একাডেমিক কাজ করেছি ন্যারেটোলজি নিয়ে। এটির ভালো উত্তর ড. মাসুদুজ্জামান বা ড. অনু হোসেন দিতে পারবেন। প্রার্থক্য যে আছে সেটা তো দেখলেই মনে লয়। পশ্চিম বাংলার ভাষা বুড়ো থুথ্থুড়ির মতো। মেনোপেজ হয়ে গেছে। মজা নাই। আর আমাদেরটা এখনও রক্তমাখা, ছুঁতে হলে স্যানিটারি প্যাডের দরকার হয়। এই আর কি!
কবিতার বিরুদ্ধে জনবিচ্ছিন্নতা ও দুর্বোধ্যতার অভিযোগ বিষয়ে কিছু বলুন। কবির কি পাঠকের রুচির সাথে আপোষ করে কবিতা লেখা উচিৎ? বর্তমানে বাংলা কবিতার পাঠক কারা?
চারুশিল্প আম পাবলিকের জিনিস না। এটার জন্য শিল্পবোধ জন্মাতে হয়। এক একটি লেখা এক একটি লেবেলের পাঠকের জন্য। যিনি নজরুলের কবিতার ভক্ত তার কাছে জীবনানন্দ দাশের বিড়াল কবিতাটিকে দুর্বোধ্য মনে হওয়াই স্বাভাবিক। যিনি শরৎচন্দ্র বা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে অভ্যস্ত তার কাছে কমলকুমার দুরূহ হওয়াটাই স্বাভাবিক। এখন এ দায় আমরা লেখকের উপর চাপাতে পারি না। পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য নাজেল হওয়া ধর্মগ্রন্থগুলোকে আমার অনেক হেয়ালিপূর্ণ মনে হয়। কই এ জন্য আমি তো ঈশ্বেরকে দোষারোপ করতে যাইনি। ওটা বুঝতে হলে আলেম হতে হবে।
কবিতার পাঠক কারা? আমরা আর মামুরা। মানে আমরা আমরা! নিজেরা লিখি নিজেরাই পড়ি। ভাইরে, গুপ্তশাস্ত্র চর্চা করিতেছি...
।।
শোয়াইব জিবরান
জন্ম: ৮ এপ্রিল ১৯৭১
জন্মস্থান: সিলেট (বর্তমানে মৌলবীবাজার) জেলার সিদ্ধেশ্বরপুর গ্রামের আযমত শাহ্ কুটিরে।
পেশা: শুরু জাতীয় সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা দিয়ে। বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
প্রকাশিত গ্রন্থ: কবিতা; কাঠ চেরাইয়ের শব্দ (বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬), দুঃখ ছেপে দিচ্ছে প্রেস (মঙ্গলসন্ধ্যা, ২০০৩), ডিঠানগুচ্ছ উঠান জুড়ে (শুদ্ধশ্বর, ২০১০)। গ্রবেষণাগদ্য ও সংকলনগ্রন্থ; কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাসের করণকৌশল(বাংলা একাডেমী, ২০০৯), বিষয়: কবিতা কথা ও শিক্ষা(ধ্রুবপদ, ২০১১)। শিক্ষাবিষয়গ্রন্থ; শত বছরের শিক্ষা: রামমোহন থেকে নজরুল (শিক্ষাচিন্তা, ২০০৯), রবীন্দ্র শিক্ষাভাবনা সমগ্র(সংবেদ, ২০১২), কর্ম সহায়ক গবেষণা (শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ২০০৯), বাংলাশিক্ষণ (শিক্ষামন্ত্রণালয়, ২০০৯), মাধ্যমিক শিক্ষা ও শিশুর ক্রমবিকাশ (শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ২০০৯), শিক্ষায় যোগাযোগ ও প্রযুক্তি(বাউবি, ২০০১), উচ্চশিক্ষাব্যবস্থাপনা(বাউবি, ২০০১), বাঙালির শিক্ষাচিন্তা (বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, নয় খণ্ড)
সম্পাদনা : নব্বই দশকের সূচনায় সাহিত্য বিষয়ক কাগজ ‘শব্দপাঠ’ সম্পাদনা । এখন সম্পাদনা শিক্ষা বিষয়ক কাগজ ‘শিক্ষাচিন্তা’। এছাড়াও বাংলাদেশ শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যপুস্তকসমূহ।
আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি : মুক্তধারা একুশে সাহিত্য পুরস্কার লাভ।
।।
বাংলাদেশ সময় : ১৬৪২ ঘণ্টা, ০৭ জানুয়ারি ২০১৩