 |
ঢাকা: রাজধানীর ইডেন কলেজের ছাত্রীর ওপর এসিড নিক্ষেপকারী মনিরকে গ্রেফতারে দুই দিনের অভিযানের বর্ণনা দিয়েছেন ডিবি কর্মকর্তারা। তাদের ভাষায় চালাক মনিরকে ধরতে পাহাড়ের এ অভিযান ছিল শ্বাসরুদ্ধকর। বৃহস্পতিবার খাগড়াছড়ির দুর্গম এলাকা থেকে তাকে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
শুক্রবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে মনিরকে হাজির করে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গ্রেফতারের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের বর্ণনা দেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দক্ষিণের উপ-কমিশনার মনিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোখলেছুর রহমান এবং সহকারী পুলিশ কমিশনার হাসান আরাফাত।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ২১ জানুয়ারি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গোয়েন্দা পুলিশ জানতে পারে, এ ঘটনার মূল আসামি মনির উদ্দিন(২৭) খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা ও বরকল উপজেলার মধ্যবর্তী কোন এক দূর্গম এলাকায় জনৈক আমলকি বিক্রেতার বাড়িতে লুকিয়ে আছে। এই খবর পাওয়ার পরপরই গোয়েন্দা পুলিশ তাকে আটকের ব্যাপারে তৎপরতা শুরু করে।
কর্মকর্তারা বলেন, গোয়েন্দা-দক্ষিণ বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমানের নেতৃত্বে গোয়েন্দা পুলিশের দুইটি দল বিশেষ অভিযানে অংশ নেয়, যার একটির টিম লিডার ছিলেন সহকারী পুলিশ কমিশনার হাসান আরাফাত ও অন্যটির টিম লিডার ছিলেন ইন্সপেক্টর আব্দুন নুর।
কৌশলগত কারণে এসি হাসান আরাফাতের নেতৃতাধীন টিমটি চট্রগ্রামে এবং ইন্সপেক্টর আব্দুন নূরের নেতৃত্বাধীন টিমটি খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা এলাকায় যায়। ২২ জানুয়ারি আমলকি ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়ে চট্রগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারের আমলকি ব্যবসায়ী আফতাবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, বরকল এলাকার কুরকুটিছড়ি গ্রাম থেকে রংগু চৌধুরী বিক্রির জন্য আমলকি পাঠায়, কিন্তু সে তার বাড়ি চেনেনা। তার বাড়ি চিনতে পারে রাঙামাটির রিজার্ভ বাজার ঘাটের জনৈক বক্কর সরদার। বক্কর সরদারের নিকট সহযোগিতা চাইলে সে জানায় তার বাড়ির সঠিক ঠিকানা জানতে পারবে রনি ও আতিক নামের দুই ব্যক্তি।
রনির কাছে সহযোগিতা চাইলে সে বলে আমি তার বাড়ি চিনি এবং আপনাদের সহযোগিতা করব। টিমটি স্পিডবোট নিয়ে কুরকুটিছড়ির দিকে রওনা হয়। আর খাগড়াছড়ির টিমটি একই উদ্দেশে ট্রলার নিয়ে লংগদু থেকে রওনা দেয়। বেলা আনুমানিক সাড়ে ৪ টার দিকে কুরকুটিছড়ি গ্রামে গোয়েন্দা পুলিশের দুইটি টিম ও বরকল থানার পুলিশের একটি টিম একত্রিত হয়। বিকেল পৌনে ৫টার দিকে রংগু চৌধুরীর বাড়িতে উপস্থিত হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনির টিলার পিছনের পাহাড়ে ঢুকে পড়ে। পুলিশ তার পিছু নেয়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সে পাহাড়ি গভীর বনের ভিতরে ঢুকে পড়ে।
গোয়েন্দা পুলিশ ও স্থানীয় থানা পুলিশ গভীর রাত পর্যন্ত পাহাড়ী বনের ভিতরে আসামিকে খুঁজতে থাকে। সারারাত খোঁজার পর পরের দিন ২৩ জানুয়ারি সকালে স্থানীয় জনগণের সহায়তা নিয়ে পাহাড়ী জঙ্গলে মনিরকে গ্রেফতারের জন্য দিনভর অভিযান চালানো হয়।
রাতের বেলায়ও গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল ও স্থানীয় থানা পুলিশ আসামি যাতে পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য রাতভর লেকের চারপাশে ট্রলার নিয়ে টহল অব্যাহত রাখে। এছাড়াও শুভলং ক্যাম্প, রাঙ্গামাটি সদর, লংগদু ও মাইনীমুখে স্থানীয় থানা পুলিশের সহায়তায় চেক পোস্ট বসানো হয়। রাতেই গোয়েন্দা পুলিশের দলটি নিশ্চিত হয় যে, আসামি পাহাড়ের ভিতরে লুকিয়ে আছে।
পরে বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয় জনগণকে মনিরকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করলে ব্যাপকভাবে স্থানীয় জনগণ অভিযানে অংশগ্রহণ করে। তাদের একটি দল ১০/১৫ টি ডিঙ্গি নৌকা দিয়ে লেকের ভিতরে আসামিকে খোঁজ করতে থাকে।
এরইমধ্যে মনিরের আশ্রয়দাতা রঙ্গু চৌধুরী ও তার স্ত্রীকে এরকম একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে সহযোগিতা চাইলে তারা সহযোগিতা করতে রাজি হয়।
আসামির আশ্রয়দাতার বাড়ির নিকটে আনসার ক্যাম্পের সদস্যদের কাছে আসামি গ্রেফতারে সহযোগিতা চাইলে তারাও গোয়েন্দা পুলিশের নেতৃত্বে আসামি গ্রেফতারের জন্য অভিযানে সহযোগিতা করে। গোয়েন্দা পুলিশের দলটি স্থানীয় জনগণের সহায়তা নিয়ে আবারো পাহাড়ী অঞ্চলে তাকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত রাখে। অভিযান পরিচালনাকালে আসামি পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেয়ে পালানোর উদ্দেশ্যে রঙ্গু চৌধুরীর বাড়ির দিকে চলে আসে। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রঙ্গু চৌধুরীর স্ত্রী মনিরকে টিলার দিকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে গিয়ে পাশের আনসার ক্যাম্পে খবর দেয়।
সংবাদ পেয়ে আনসার সদস্যরা আসামিকে গ্রেফতারের জন্য এগিয়ে আসে।এরইমধ্যে গোয়েন্দা পুলিশের দলটিও উপস্থিত হয় এবং আসামিকে গ্রেফতার করে আনসার ক্যাম্পে অবস্থান করে। অভিযানে অংশগ্রহণকারী অন্য সকলকে আসামি গ্রেফতারের সংবাদ দিলে তারা ক্যাম্পে ফিরে আসলে গোয়েন্দা পুলিশের টিম উক্ত অভিযানে সহায়তার জন্য স্থানীয় থানা পুলিশ, আনসার সদস্য ও স্থানীয় জনগণ ধন্যবাদ জানিয়ে আসামিকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হয়।
মনিরকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে কর্মকর্তারা জানান, মনির তার অপরাধের কথা স্বীকার করে। আঁখির সঙ্গে তার ২/৩ বছরের পরিচয় ও বিয়ে হয় এবং গত ৬/৭ মাস আগে তাদের ডিভোর্স হয়। পরবর্তীতে ১৫ জানুয়ারি মনির জরুরি কথা আছে বলে ডেকে কাজি অফিসে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করার জন্য আখির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
বিয়েতে রাজি না হওয়ায় পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজধানীর চাঁনখারপুলের কাজি অফিসে সে ইডেন কলেজের ছাত্রী আখীকে এসিডদগ্ধ ও ছুরিকাহত করে রাঙ্গামাটিতে পালিয়ে গিয়ে জনৈক রঙ্গু চৌধুরীর বাড়িতে আশ্রয় নেয়।
আঁখির ওপর এসিড নিক্ষেপের ঘটনা সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। থানা পুলিশের পাশাপাশি উপ-পুলিশ কমিশনার মোঃ মনিরুল ইসলাম, গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগ (দক্ষিণ) এর নির্দেশনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ ঘটনার ছায়াতদন্ত শুরু করে।
এদিকে অভিযানে নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তা হাসান আরাফাত বাংলানিউজকে বলেন, পাহাড়ের মধ্যে মনিরকে গ্রেফতারের অভিযান ছিল শ্বাসরুদ্ধকর। প্রায় তিন দিন সেখানে অবস্থান করে লোকজনের কাছ থেকে সহায়তা চেয়ে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তিনি বলেন, মনির খুব চালাক। এ কারণে তাকে গ্রেফতারে বেগ পেতে হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গ্রেফতারের জন্য ১০ হাজার টাকা পুরস্কারের ঘোষণা করা হলেও যেহেতু আমাদের পুলিশ তাকে আটক করেছে এ কারণে কাউকে এই পুরস্কার দেওয়া হয় নি। তবে এই অভিযানে যারা সহায়তা করেছেন তাদের খাওয়ানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, ইডেনের এসিড সন্ত্রাসের শিকার ছাত্রীটি বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রধান অভিযুক্ত মনিরকে গ্রেফতারে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্টদের সময় বেধে দেন। ১ম দফায় পুলিশ গ্রেফতারে ব্যর্থ হলেও ২য় দফায় সক্ষম হলো পুলিশ।
বাংলাদেশ সময়: ১৭২৫ঘণ্টা, জানুয়ারি ২৫, ২০১৩
আইএ/সম্পাদনা: নূরনবী সিদ্দিক সুইন, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর