১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, শনিবার মে ২৫, ২০১৩ ১:৩০ এএম BDST banglanew24
06 Jan 2013   05:20:50 AM   Sunday BdST
E-mail this

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বনাম খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল


মাহবুবুর রহমান মুন্না, জেলা প্রতিনিধি
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বনাম খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল

খুলনা : বর্তমান সরকারের শাসনামলে বন্ধকৃত এশিয়ার বৃহত্তম কাগজ কল খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল চালুর সম্ভাবনা শেষ হয়ে আসছে। অথচ নিউজপ্রিন্ট মিল চালুর প্রতিশ্রুতি ছিল মহাজোট সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার।

এমনকি প্রধানমন্ত্রী ২০১১ সালের ৫ মার্চ খুলনার প্রভাতি স্কুল মাঠের জনসভায় এ মিল চালু করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তখন বন্ধ মিলের শ্রমিকরা স্বপ্ন দেখেছিলেন হয়তো বা অচিরেই মিলের চিমনি হতে আবারও ধোঁয়া উড়বে, সাইরেনের শব্দে ঘুম ভাঙ্গবে। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতির ২২মাস অতিক্রম হলেও চালু হয়নি মিলটি।

বাংলানিউজের বিশেষ অনুসন্ধানীতে জানা যায়, দেশের কাগজের চাহিদা মোটানোর উদ্দেশ্যে খুলনার খালিশপুরে ভৈরব নদের তীরে ১১৫ একর জমির ওপর ক্যানাডিয়ান স্যান্ড ওয়েল কো¤পানি কর্তৃক ১৯৫৪ সালে এ মিলের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৫৯ সালে মিলের ১ ও ২ নং ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে মিলের তৃতীয় ইউনিটটি চালু করা হয়। মিলটি স্থাপনে সর্বমোট ৪৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়। মিলের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪৮ হাজার মেট্রিক টন।

দীর্ঘ ৪৮ বছর পর ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর লোকসানের অজুহাতে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত এ কাগজ কলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। নিউজপ্রিন্ট মিল বন্ধ ঘোষণার পর শিল্পশহর খালিশপুরে স্থবিরতা নেমে আসে।

সেখানে কর্মরত প্রায় সাড়ে তিন হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েন। তাদের মাথায় ভেঙ্গে পড়ে আকাশ। যার কারণে অনেকে পেশা বদলিয়েছেন। কেউ চলে গেছেন গ্রামে কিংবা হয়েছেন স্থানান্তর। আবার কেউ কেউ খেয়ে না খেয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।

মিল চালুর অপেক্ষায় থাকা শ্রমিক আব্দুল্লাহ বাংলানিউজকে জানান, সরকার প্রধান আশ্বাস দিয়েছিলেন মিল চালু হবে।  চিমনি দিয়ে ধোঁয়া উড়বে, সাইরেন বাজবে। শ্রমিকদের কোলাহলে মুখরিত হবে শিল্পাঞ্চল। কিšুÍ কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। সবকিছুই কোথায় যেন আটকে আছে।

নিউজপ্রিন্ট মিলসের হিসাব বিভাগের একটি সূত্র বাংলানিউজকে জানায়, বর্তমানে মিলটিতে চুক্তিভিত্তিক ৫০ জন নিরাপত্তা প্রহরী, ৬ জন কর্মী ও ১২ জন কর্মকর্তা নাম মাত্র বেতন পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

সূত্র আরও জানায়, ২০০৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মিলটি প্রাইভেটাইজেশন বোর্ডের বিরাষ্ট্রীয়করণ তালিকাভুক্ত হয়। এরপর ওই বছরের ২ মার্চ মিলটি বিক্রির জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়। টেন্ডারে হাজার কোটি টাকার মিলটির মাত্র ১৩৩ কোটি টাকা দর ওঠে। পরে একই বছরের ১৩ মে মিলটি বিক্রির জন্য দ্বিতীয় বার টেন্ডার আহ্বান করা হলেও কেউ সাড়া দেয়নি। ওই বছরের ২৮ জুলাই মিলটি প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়।

এর প্রেক্ষিতে সেখানে শিল্প পার্ক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। চারদলীয় জোট সরকার র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠনের পর তাদের ৬ নং দফতরটি এ মিলে স্থাপন করা হয়। যা এখনও তাদের দখলে।

মহাজোট সরকার নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী মিলটি চালুর উদ্যোগ নেয়। ২০১০ সালের মার্চ মাসে শিল্প, বাণিজ্য ও পাটমন্ত্রী এবং শ্রম প্রতিমন্ত্রী মিলটি পরিদর্শন করেন। মিলের অবস্থা দেখে তারা খুলনাবাসীকে আশ্বস্ত করেন, শিগগিরই মিলটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ওই বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করে।

তাদের রিপোর্টে বলা হয়, মিলটিকে লাভজনক পর্যায়ে নিতে হলে ৩৯১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিকায়ন (বিএমআর) করতে হবে। তাহলে মিলটি থেকে সাদা উন্নতমানের কাগজ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। বছরে কমপক্ষে ৪২ হাজার মেট্রিক টন কাগজ উৎপাদন করা সম্ভব। আর এ কাজে কয়েক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

নিউজপ্রিন্ট মিল এমপ্লয়ীজ ইউনিয়নের সভাপতি নিজাম-উর-রহমান লালু বাংলানিউজকে জানান, মিলটি চালুর জন্য আমরা অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল মিলটি চালু করার। কিন্তু সরকারের ৪ বছরের বেশি সময় শেষ হলেও মিলটি চালু করা হয়নি। ফলে আমরা হতাশায় ভুগছি।   

মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. রুহুল আমীন বাংলানিউজকে জানান, মিলটি চালুর জন্য গঠিত হয়েছে সমিক্ষা কমিটি। অচিরেই ওই কমিটি রিপোর্ট দিবে। আর তখনই সিদ্ধান্ত হবে মিলটি কবে নাগাদ কোন প্রক্রিয়ায় চালু হবে।  

একটি বিশেষ সূত্র বাংলানিউজকে জানিয়েছে, বন্ধ থেকেও মিলটির রেহাই নেই। লুটেরা সুযোগ পেলেই লুটে নিচ্ছে মূল্যবান সব যন্ত্রাংশ। এশিয়ার বিখ্যাত কাগজ কল বন্ধ থাকা নিউজপ্রিন্ট মিলের বর্তমান চিত্র এটি। এভাবে লুটেপুটে নিচ্ছে পরিত্যক্ত মিলের কোটি কোটি টাকা মূল্যের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। কিন্তু টনক নড়ছেনা কর্তৃপক্ষের। তাই রক্ষারও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছেনা। বন্ধ থাকায় মিলের যন্ত্রাংশ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
অরক্ষিত অবস্থায় থাকার কারণে মিলের মেশিনারীজসহ গুরুত্বপূর্ণ মালামাল প্রতিনিয়ত চুরি হচ্ছে। মাঝে-মধ্যে হাতে-নাতে চোর ধরা পড়ার পর পুলিশে দেওয়া হলেও পরে আবার জামিনে মুক্তি পেয়ে তারা ফের মিলের যন্ত্রপাতি চুরি করছে। এমনকি চোরদের সঙ্গে কোনো কোনো সিকিউরিটি গার্ডের সখ্যতা রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে মহাজোট সরকারের ৪ বছর হলেও এ মিলটি চালু না হওয়ায় খুলনার শ্রমিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা বিভিন্নভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু বাংলানিউজকে বলেন, “খুলনাবাসীর প্রত্যাশা ছিল মহাজোট সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী নিউজপ্রিন্ট মিলটি চালু করবে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ২০১১ সালে খুলনার জনসভায় প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর এখনকার শ্রমিকরা আশায় বুক বেঁধে ছিলেন। কিন্তু সরকারের ৪ বছর মেয়াদ শেষ হলেও মিলটি চালু করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।”

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান বাংলানিউজকে বলেন, “এমনিতেই খুলনাঞ্চল চরমভাবে বৈষম্যের শিকার। তারপরও বর্তমান সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিউজপ্রিন্ট মিলটি বাঁচিয়ে রাখতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে খুলনার মানুষ আশা করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত এ মিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।”

খুলনা নাগরিক ফোরামের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট ফিরোজ আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, “নিউজপ্রিন্ট মিল চালুর বিষয় নিয়ে কালক্ষেপণ করা ভাল লক্ষণ নয়। তার মতে, সরকারের উচিত মিলটি চালু করে জণগণের প্রত্যাশা পূরণ করা এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা। ”

বাংলাদেশ সময় : ০৫০১ ঘন্টা, জানুয়ারি ০৬, ২০১৩
সম্পাদনা : মাহাবুর আলম সোহাগ, নিউজরুম এডিটর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

জাতীয়

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান