 |
চট্টগ্রাম:‘ফুন্নিলাম তেঁই ভালা মানুষ। এতল্লাই ভোট দিলাম। অ-বাজি এহন ইন কি উনিরদ্যে। তেঁই বলে কর্পোরেশনর ট্যাঁ মারি খাই দিইয়ে! কারে যে বিশ্বাস গইরজ্যুম! (শুনেছিলাম তিনি ভালো মানুষ। সেজন্য ভোট দিয়েছিলাম। এখন এসব কি শুনছি? উনি নাকি কর্পোরেশনের টাকা মেরে দিয়েছেন! কাকে যে বিশ্বাস করব!)’
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এম মনজুর আলমের দুর্নীতি ও লুটপাট তদন্তে দুদকের ফাইল তলবের বিষয়ে চট্টগ্রাম আদালতের ভ্রাম্যমাণ পান দোকানি হাবিবুল এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
একই বিষয়ে চট্টগ্রামের একটি উন্নয়ন সংগঠনের কর্ণধার ফেরদৌস আহম্মদ বাংলানিউজকে বলেন, ``মেয়র মনজু সাহেবকে সৎ মানুষ, ভালো মানুষ হিসেবেই চট্টগ্রামবাসী জানেন। দুদকের ফাইল তলবের ঘটনায় চট্টগ্রামবাসীর কাছে উনার যে ভাবমূর্তি সেটা ম্লান হয়ে গেছে। মনজু সাহেবের সততার মুখোশ খুলে গেছে। এখন এ অভিযোগ তিনি কীভাবে খণ্ডাবেন সেটা তার বিষয়।``
এর আগে গতকাল (সোমবার) চসিকের ২০১০-১১ অর্থবছরের উন্নয়ন কাজের এক হাজার ৩৮০টি ফাইল তলব করে দুদকের বিভাগীয় উপ-পরিচালক আব্দুল আজিজ ভুঁইয়া স্বাক্ষরিত একটি চিঠি সিটি কর্পোরেশনে পৌঁছে।
ওই অর্থবছরে উন্নয়নের নামে মেয়রসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রায় ৮৫ কোটি টাকা লুটপাটের একটি অভিযোগ পাবার পর দুদক এ তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার নগরীর বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে তাদের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়।
প্রতিক্রিয়ায় অনেকেই মত দিয়েছেন, মেয়র এম মনজুর আলম কিংবা সিটি কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে দুদককে দ্রুত তদন্ত করে জাতির সামনে বিষয়টি পরিষ্কার করা উচিৎ।
আবার অনেকে বলেছেন, দুদকের কাছে মেয়রের বিরুদ্ধে ৮৫ কোটি টাকা লুটপাটের যে অভিযোগ জমা পড়েছে সে বিষয়ে মেয়রের উচিৎ জাতির সামনে তার অবস্থান পরিষ্কার করা।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বাকলিয়া এলাকার সাবেক একজন কাউন্সিলরের কাছে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, ``মনজু সাহেবের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান অতীতে বিদ্যুৎ চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিল। এজন্য তারা জরিমানাও দিতে বাধ্য হয়ছিল। কয়েক লাখ টাকা চুরির অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে ওঠে তারা ক্ষমতা পেলে কোটি টাকার লোভ কিভাবে সামলাবেন ?``
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক ওই কাউন্সিলর আরও বলেন, ``মহিউদ্দিন সাহেব তার নানা কর্মকাণ্ডের কারণে এত বিতর্কিত হয়ে পড়েছিলেন যে, বিকল্প হিসেবে মানুষ বিএনপি-জামায়াতের মনজু সাহেবের সততার প্রচারণা লুফে নিয়েছিলেন। এখন মানুষ নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, সেই প্রচারণার মধ্যে কতটা অসততা ছিল?``
নগরীর কে সি দে রোডের বাসিন্দা ও ইলেকট্রিশিয়ান আশীষ মহাজন বাংলানিউজকে বলেন, ``বেইন্যা পত্রিকা পড়ি ত আঁর বিশ্বাস ন অর। মনজু সাব ব্যবসাপাতি গরে উন্নিলাম। তেঁইরতে এট্টা ট্যাঁর দরহার কি? আসলে দুন্যাইত ভালা মানুষ নাই। (সকালে পত্রিকা পড়ে তো আমার বিশ্বাস হয়নি। মনজু সাহেব ব্যবসা বাণিজ্য করেন শুনেছিলাম। তার এত টাকার দরকার কি? আসলে দুনিয়ায় ভালো মানুষ নেই।``
নগরীর উত্তর পতেঙ্গা এলাকার বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মচারী বখতেয়ার বাংলানিউজকে বলেন, ``মেয়র সাহেব দুর্নীতি করেছেন কিনা সেটা এখনও প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু বিমানবন্দর সড়কসহ নগরের সড়কগুলোর অবস্থা দেখলে বোঝা যায় লুটপাট কি পরিমাণ হয়েছে। এখন দুদক তদন্ত করবে বের করবে এ লুটপাট কারা করেছেন।``
উল্লেখ্য ২০১১ সালের মার্চে চট্টগ্রামে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের দু’টি ম্যাচ এবং একটি প্রস্তুতি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে সরকারিভাবে সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরীতে প্রায় ১৭৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়িত হয়।
অভিযোগ আছে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে সিটি কর্পোরেশনে যখন এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিল তখন মেয়র এম মনজুর আলমের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতায় তালিকাভুক্ত ঠিকাদারের পাশাপাশি আরও নতুন ৫০০ ব্যক্তি ঠিকাদার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই বিএনপি দলীয় নেতাকর্মী।
নগরীর চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা ও সিএন্ডএফ কর্মচারী শরিফ উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, ``আসলে মেয়র সাহেব বিএনপির উপদেষ্টা হওয়ায় তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তিনি কোনো দুর্নীতি করতে পারেন এটা আমার বিশ্বাস হয় না।``
উল্লেখ্য, সম্প্রতি এম মনজুর আলম বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। রোববার মেয়র ঢাকায় গিয়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মাজারে পুস্পস্তবক অর্পণ করেন এবং বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
মেয়রের বিরুদ্ধে উঠা দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে কথা বলার জন্য তার মোবাইলে বারবার চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ সময়: ১৭১৭ ঘণ্টা, জুলাই ১০, ২০১২
আরডিজি/সম্পাদনা: রানা রায়হান, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com