 |
| ছবি: নাজমুল হাসান/বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
শাহবাগ গণজাগরণ থেকে: শাহবাগের গণজাগরণের সঙ্গে যুক্ত অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের সর্বোচ্চ চেষ্টা অহিংস আন্দোলন। তবে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী সহিংসতার পথে গেলে তারাও রাজপথে থাকবেন। জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে রাজপথ এবং সাইবার দুনিয়ায় একযোগে আন্দোলন চলবে।
রোববার রাতে শাহবাগে বাংলানিউজের সঙ্গে আন্দোলনে যুক্ত ব্লগারদের ‘অনলাইন লাইভ আড্ডা’য় ব্লগাররা এমন মন্তব্য করেন।
আড্ডায় অংশ নিয়েছেন ব্লগার সাদমান সাদেক, আমিনুল হক পলাশ ও শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ লাকি আক্তার প্রমুখ।
স্লোগান-কন্যা লাকি আক্তার বলেন, ‘‘স্বাধীন বাংলাদেশের ৪২ বছরের ইতিহাসে এ গণজাগরণ একটি বিরল দৃষ্টান্ত। এ আন্দোলন গণমানুষের। আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকবে অহিংস আন্দোলন করা। শান্তিপূর্ণভাবে আমরা কাদের মোল্লাসহ সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবি করে যাবো। একইসঙ্গে জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক অপতৎপরতার বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম চলবে। শান্তিপূর্ণভাবে গণমানুষের আন্দোলন আমরা চালিয়ে যাবো। তারা বাঁধা দিতে চাইলে আমরাও মোকাবেলা করবো।”
পলাশ বলেন, ‘‘ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায় আশা জাগিয়েছে। একইভাবে পাঁচ তারিখের রায়ের জন্যও আশাবাদী ছিলাম। ঠিক করেছি মিস্টি বিতরণ করবো, আনন্দ মিছিল করবো কিন্তু কাদের মোল্লার রায় ঘোষণার পরই আমরা অবাক হই। এ রায়তো আমাদের প্রত্যাশিত নয়! তরুণ প্রজন্ম ও বাঙালি জাতি কারো কাছেই এ রায় গ্রহণযোগ্য নয়। রায়ের আগে আমরা মিস্টি বিতরণ ও আনন্দ মিছিলের জন্য প্রস্তুত ছিলাম। আনন্দ মিছিলের বদলে আমাদের ক্ষোভের মিছিল হয়েছে। সাইবার জগতে ঝড় ওঠেছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘রায়ের পরপরই ফেসবুকে ও ব্লগে ঝড় ওঠে। কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিকেলে একে একে জড়ো হতে থাকে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে। যখন আমরা প্রথম জড়ো হই তখন ভাবিনি যে ১৩ দিন পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। দেশের মানুষ স্বপ্রনোদিতভাবে এ আন্দোলনে যুক্ত হয়। দাবি ওঠে কাদের মোল্লাসহ সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি। গণমানুষের আন্দোলন হয় শাহবাগের এ আন্দোলন। শাহবাগ থেকে সারাদেশ এবং প্রবাসীদের মাঝেও এ আন্দোলন নাড়া দেয়।’’
‘‘মুক্তিযুদ্ধের অমিমাংসিত বিষয় সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকবো’’ বলেন ব্লগার পলাশ।
এ আন্দোলনের কৃতিত্ব গণমানুষের
ফেসবুকে ব্লগে আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে অনেক কথাই আসছে। প্রকৃত অর্থে এ আন্দোলনের কৃতিত্ব কার? বাংলানিউজের এ প্রশ্নের উত্তরে ব্লগার সাদমান সাদিক বলেন, ‘‘এ আন্দোলনের কৃতিত্ব কোনো ব্যক্তি বিশেষকে দেওয়া ঠিক হবে না। এটা এককভাবে কেউ নিতে পারবেন না। উচিতও হবে না। এ আন্দোলনের সকল কৃতিত্ব গণমানুষের। গণমানুষের অংশগ্রহণেই এ আন্দোলন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।’’
লাকি বলেন, ‘‘অন্তর্জালের দুনিয়ায় মুহূর্তে মানুষ সব কিছু জানতে পারছে। মত প্রকাশ করতে পারছে। প্রতিবাদ করতে পারছে। অনলাইনের কারণে চেতনার বিস্ফোরণ ঘটেছে। সে চেতনার বিস্ফোরণের ফল এ আন্দোলন।’’
ব্লগাররা জানান, অনলাইনের মাধ্যমে এ আন্দোলনের সূচনা। এখন রাজপথ ও অনলাইনে আন্দোলন চলছে এবং চলবে কিছু বিষয়ের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত।
দেশের সর্বত্র শাহবাগ গড়ে তুলতে হবে
লাকি বলেন, ‘‘শাহবাগের আন্দোলন এখন আর শাহবাগে সীমাবদ্ধ নেই। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া হয়ে দেশের সীমানা ছাড়িয়েছে। ’’
তিনি বলেন, ‘‘শুধুমাত্র শাহবাগ কেন্দ্রিক হলে এ সত্যিকারের আন্দোলন হবে না। সারাদেশে জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে। দেশের আনাচে কানাচে আলাদাভাবে শাহবাগ গড়ে তুলতে হবে। আশা করি মিডিয়ার মাধ্যমে সারা দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে এ আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে যাবে। ’’
এ আন্দোলনের পরে রাজনীতিতে একটি পরিবর্তন আসবে
শাহবাগ আন্দোলনের পরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এ আন্দোলন থেকে অনেক বিষয় শেখার আছে মনে করেন লাকি, সাদমান ও পলাশ।
লাকি বলেন, ‘‘এখানে জামায়াতসহ অন্য যেসব রাজনৈতিক সংগঠন ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করছে তাদের বিষয়ে ওঠে আসছে। জামায়াতের মিডিয়াগুলো বর্জনের কথাও আসছে।’’
পলাশ বলেন, ‘‘এ আন্দোলনের ফল হিসেবে দেশের কোনো কোনো জায়গায় দিগন্ত টিভি বন্ধ করেছেন ক্যাবল অপারেটররা। জানতে পেরেছি ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সার্কুলেশনও কমেছে। জামায়াতি মিডিয়ার বিরুদ্ধে একধরণের গণজাগরণ তৈরি হয়েছে।’’
সাদমান বলেন, ‘‘ইসলামী ব্যাংকের বিষয়েও এখন অনেকে সচেতন হয়েছেন। এ আন্দোলন অনেক কিছু শিক্ষা দিয়েছে।’’
‘জামায়াত-শিবিরের পেইড ব্লগার রয়েছে’
জামায়াত-শিবিরের পেইড ব্লগার রয়েছে বলে মন্তব্য করেন আন্দোলনকারী ব্লগাররা। সে সমস্ত ব্লগারদের দলটির পক্ষ থেকে টাকা দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন লাইভ আড্ডায় অংশ নেওয়া ব্লগাররা।
শাহবাগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্লগার সাদমান সাদেক বলেন, ‘‘জামায়াত-শিবিরের পেইড ব্লগাররা আন্দোলনের ভুল ম্যাসেজ দিতে চাচ্ছে। ফেসবুকে ব্লগে তারা আগে থেকেই বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। রাজপথে তাণ্ডবের পর এখন অনলাইনে বিভিন্ন অপপ্রচার চালাচ্ছে। তবে এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির কাছে তারা রাজপথ ও অনলাইনে কোনঠাসা। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট আছি তারা রাজপথ এবং অনলাইন দু`জায়গাতেই তৎপর আছি।’’
লাকি ও পলাশ জানান, সাইবার যুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনই বেশি। অন্তর্জালের দুনিয়ায়ও তারা পরাজিত হচ্ছে। হবে।
রাজীব হত্যার পর আন্দোলন তীব্রতর
ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যার পর আন্দোলন আরও তীব্রতর হয়। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষ এ আন্দোলনে যুক্ত হয়। রাত দিন মানুষ আন্দোলনে রয়েছেন।
লাকি বলেন, ‘‘রাজীবের মৃত্যুর শোক আমাদের শক্তিতে পরিণত হয়েছে। জামায়াত-শিবিরের প্রতি মানুষের ঘৃণা আরও তীব্রতর হয়েছে।’’
সাদমান বলেন,‘‘রাজীব রাজপথ ও অনলাইনে সক্রিয় ছিলেন। মৃত্যুর আগেও ফেসবুকে এ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।’’
লাইভ আড্ডায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেট, দুবাই, লন্ডন, সিডনীসহ বিশ্বের বিভিন্ন নগরী ও দেশের বিভিন্নস্থান থেকে বাংলানিউজের পাঠকরা শাহবাগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্লগারদের প্রশ্ন করেন। আড্ডায় অংশ নেওয়া ব্লগাররা সেসব প্রশ্নের উত্তর দেন।
লাইভ আড্ডা সঞ্চালনা করেন বাংলানিউজের হেড অব নিউজ মাহমুদ মেনন খান। আড্ডায় অংশ নেন সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট আদিত্য আরাফাত, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট আশরাফুল ইসলাম,ইলিয়াস সরকার ও উর্মি মাহবুব এবং বাংলানিউজের স্বপ্নযাত্রার বিভাগীয় সম্পাদক শেরিফ আল সায়ার। একাধিক ব্লগারও এ আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ সময়: ০৩৪৫ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৩
এডিএ/সম্পাদনা: মীর সানজিদা আলম, নিউজরুম এডিটর