 |
| ছবি: মোশাররফ / বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
তূর্ণা এক্সপেস থেকে: ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গড়াতে থাকে সময়, বাড়তে থাকে রাত। সিটের সঙ্গে হেলান দিয়ে আর দাঁড়ানো যাচ্ছে না। ঘুমে চোখ ঢুলু ঢুলু।
আচ্ছা, ইংরেজিতে সিট শব্দের মানে বসা হলে, স্ট্যান্ডিং সিটের অর্থ কী হয়? এ প্রশ্ন এ জন্য যে, চট্টগ্রামগামী তূর্ণা এক্সপ্রেসের যাত্রীরা এ দু’টো উপায়ে যাত্রা করেন।
রাত একটা। স্ট্যান্ডিং সিটের লোকগুলোর উপর বিরক্ত সিটে বসা মানুষগুলো। কেউ কপাল কুঁচকাচ্ছেন, কেউ মুখে অস্ফূট শব্দে বিরক্তি প্রকাশ করছেন। অনেকেই এমনভাব করছেন, যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে।
তবে কেউই বাধা দিচ্ছেন না। বাঁ হাত দিয়ে স্ট্যান্ডিং সিটের যাত্রীকে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছেন না। কারণ স্ট্যান্ডিং সিটের যাত্রী সংখ্যা সিটে বসা যাত্রীদের তুলনায় কম নয়।
রাত দু’টার দিকে ট্রেন ভৈরব ছাড়ে। এর আগেও বেশ কয়েক দফায় বিভিন্ন স্টেশনে থেমেছে তূর্ণা এক্সপ্রেস। শুধু স্টেশন নয়, মিনিট ২০ বা ৩০ পরপর এমনিতেই কিছুক্ষণ করে থামে। সবজান্তার মতো স্ট্যান্ডিং সিটের চেক-শার্ট পরিহিত জনৈক যুবক বরাবরই বলে ওঠেন, ‘ট্রেন সিগন্যালে আছে।’ তবে কিসের সিগন্যাল জিজ্ঞাসা করলে আর উত্তর দিতে পারেন না।
ভৈরব পার হওয়ার সময় ট্রেনে অনেকটা যুদ্ধ করে স্থান করে নেওয়া যোদ্ধা যাত্রীরা ভৈরব পার হওয়ার পর দাঁড়িয়েই প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে, ব্যাগের সাইড পকেট থেকে পুরনো খবরের কাগজ বের করা শুরু করেন। পড়তে থাকেন মনোযোগ দিয়ে।
চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকুরি করেন রাহুল। বাংলানিউজকে তিনি বলেন, “ভৈরবের পর আর তেমন কোন স্টেশনে মানুষ ওঠে না। তাই স্ট্যান্ডিং সিটের যাত্রীরা পত্রিকা মেলে বসে পড়ে।”
দুই পাশের সিটের মাঝখানে ১৮ ইঞ্চি ফাঁকাতেই বসে যায় যাত্রীরা।
রাহুলের কথা পুরোপুরি সত্য নয়। কিছুক্ষণ পর পর থামে তূর্ণা এক্সপ্রেস। লোক ওঠে নামে। বসে থাকা যাত্রীদের গায়ে লাগে বগি পার হতে যাওয়া যাত্রীদের হাত-পা। বিরক্ত হয় এবার নিজের বেডরুম মনে করে স্ট্যান্ডিং সিটের যে যাত্রীরা পত্রিকা বিছিয়ে পা গুটিয়ে বসেছে। হেঁটে যাওয়া কোন যাত্রীর পা গায়ে লাগতেই ব্যথায় কঁকিয়ে উঠছেন কয়েকজন।
আবার অনেকেই ঘুমে অচেতন। সিটের ফাঁকের মেঝেতে বসেও ঘুমোচ্ছেন অনেকে। মেঝেতে যারা রয়েছেন তারা টিকেট পাননি। স্ট্যান্ডিং সিটের টিকেট কেটেছেন। ট্রেনের বাইরে অনেক শ্রেণী বৈষম্য দেখা গেলেও এখানে কেবল দু’টি শ্রেণী। সিট আর স্ট্যান্ডিং সিট। এছাড়া মেঝেতে বসাতে নারী-পুরুষ বৈষম্যও নেই।
ফেনীর বাসিন্দা লোকমান জানালেন, মেঘনা গোমতী ব্রীজ বন্ধ থাকায় ট্রেনে চাপ পড়েছে বেশি। সিট না পেলেও ভাড়া সিটের সমানই দিতে হয়েছে তাকে। ২৫০ টাকা দিয়ে বাসে অনেক সুন্দরভাবেই যাওয়া যায় বলে জানান তিনি।
সিট আর স্ট্যান্ডিং সিটে ভাড়ার পার্থক্য নেই। যিনি চট্টগ্রাম পর্যন্ত যাবেন, তাকে ভাড়া দিতে হবে ৩৫০ টাকা করে, সেটা যেকোনো সিটে।
ঠিক তিনটায় আখাউড়ার কাছাকাছি এক জায়গায় এসে থামে ট্রেন। প্রায় ১০ মিনিট থেমে থাকে। এই রুটে গত ১০ বছর ধরে চলাচল করছেন হারুন উর রশিদ। তিনি জানান, চোরাচালানির জন্যে এখানে ট্রেন থামানো হয়। ট্রেনে চিনি, কাপড় ও মাদকদ্রব্য ওঠে।
আবার ট্রেন চলতে শুরু করে।
সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে স্ট্যান্ডিং সিটের আরেক সহযাত্রী এই প্রতিবেদককে বলেন, “ভালো করে লিখেন, ফটোগ্রাফারকে বলেন, ভালো করে ছবি তুলে মিডিয়ায় প্রকাশ করুন।”
“নির্ধারিতের তুলনায় অনেক বেশি যাত্রী আর ভাড়া নিয়েও ট্রেন লাভের মুখ দেখে না কেন?” জানতে চান তিনি।
সকাল নয়টা নাগাদ ট্রেন পৌঁছবে চট্টগ্রাম। লাকসাম পৌঁছাতে লাগবে পাঁচটা। এরই মধ্যে ঢলঢলে চোখে অনেকে উঁকি মারেন, কতপথ আসা হলো...আর কতো দূর...!
বাংলাদেশ সময় : ০৫৫৬ ঘণ্টা, মার্চ ১৭, ২০১৩
এমএন/সম্পাদনা: হুসাইন আজাদ, নিউজরুম এডিটর