 |
মনোহরগঞ্জ, কুমিল্লা থেকে: সাত বছরের আল আমিনকে কিছু খেতে দিলে জিজ্ঞাসা করতো, ‘দাদারে দিছনি?’ যদি উত্তর ‘হ্যা’ হতো তবে আল আমিন খেতো। দাদাকে ছাড়া যেমন কোন কিছু খেত না, তেমনি দাদা স্কুলের ভ্যানে তুলে না দিলে স্কুলেও যেত না। আল আমিনের সবচেয়ে বড় বন্ধু ছিল দাদা বগু মিয়া।
দাদা’র সঙ্গে ৩ বেলা খেতো, নামাজ পড়তো ৭ বছরের নাতি। দাদা-নাতি ঘুমাতো এক খাটে। বেড়ার পাশে ঘুমাতো আল আমিন, তার ডান দিকে দাদা।
আজ সেই নাতি নেই। ঘাতক ট্রাক নিভিয়ে দিয়েছে স্কুল ভ্যানে থাকা নাতি আল আমিনের জীবনপ্রদীপ। রোববার বগু মিয়ারে চোখে পানি ছলছল করছিল। বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারছেন না। শুভ্র দাড়ি বেয়ে পড়ছে চোখের পানি।
তিনি বলছিলেন, ‘আঁই (আমি) অন (এখন) কারে লই খাইয়াম (খাবো)? নাতি আঁর কোন দেশো? আইজগা (আজকে) আর হেতারে (আল আমিনকে) স্কুলো দি আইয়ন লাগে ন। হেতারে ছাড়া খাইতে বালা লাগদো ন আঁর।’
সত্তোরধ্ব বৃদ্ধ যেন আরেক শিশু হয়ে উঠেছে। নাতি হারানোর দুঃখ মানতে পারছেন না বগু মিয়া। বৃদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আজ নেই, নাতির শোক তাকে আরো দুর্বল করে দিয়েছে।
পাশাপাশি তিনটি ঘর বগু মিয়ার তিন সন্তানের। মাঝখানে উঠান। সেদিকে তাকান তিনি। বড় ছেলের ঘরের বড় নাতিন আর নিজের বড় বন্ধুর খোঁজ করেন বগু মিয়া।
আল আমিনের বাবা আবদুল মালেক ‘ভূইয়া বাড়ি জামে মসজিদ’ এর ইমাম। তিনি জানান, আল আমিনের সবচেয়ে প্রিয় ছিল তার দাদা। দাদার সঙ্গে প্রতি ওয়াক্তের নামাজ পড়তে যাওয়া ছিল তার প্রিয়।
দুপুরে একটি বাড়িতে মিলাদ পড়াতে যান মালেক। কিন্তু মিলাদ শুরুর আগেই একজন এসে খবর দেন, স্কুলের ভ্যান এক্সিডেন্ট হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যাই আমি। দেখি তিন শিশুর লাশ পড়ে আছে। কিন্তু আমার আল আমিন নেই।
স্কুলের স্যারেরা আল আমিনকে কুমিল্লায় শান্তা মেডিকেলে নিয়ে যান। সেখানে যেয়ে দেখতে পান সন্তানকে। শান্তা মেডিকেল থেকে নিয়ে যাওয়া হয় টাওয়ার মেডিকেলে। সেখান থেকে আবার সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই মৃত্যু হয় আল আমিনের।
আল আমিনের বাবা বলেন, ‘আঁর আল আমিন মরে ন, আঁরে কয়, আব্বা হানি খাইয়াম। খাবাইতাম হারি ন।’
সন্তান হারানো বাবার কান্নার আওয়াজ চাপা পড়ে ঘরের ভেতর থেকে মা’ এর বুক ফাটা কান্নায়। বাবার চোখের পানির দিকে তাকিয়ে থাকে আল আমিনের ছোট ভাই আরাফাত। ৪ বছর বয়সী আরাফাতের মনও ছিল ভীষণ খারাপ।
উল্লেখ্য, শনিবার দুপুরে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার নাথেরপেটুয়া এলাকায় ট্রাক চাপায় নিহত হয় স্কুলভ্যানের আরোহী আট শিশুশিক্ষার্থী। আহত হয় ভ্যানচালকসহ আরও দুই শিক্ষার্থী। হতাহত শিক্ষার্থীরা সবাই নাথেরপেটুয়া মডার্ন একাডেমির শিক্ষার্থী।
আল আমিন ছাড়া নিহত শিক্ষার্থীরা হলো- প্লে শ্রেণির ছাত্র হাসিবুল হাসান নিহাদ (৭), একই শ্রেণির রাকিব হোসেন শুভ (৭), মোক্তাকিম হাসান হূদয় (৭), নার্সারি শ্রেণির জান্নাতুল মাওয়া শোভা (৭), তৃতীয় শ্রেণির নাসির উদ্দিন (১০) ও ফাহাদুল ইসলাম মিথুন (১০) এবং চতুর্থ শ্রেণির সুলতান আহমেদ ওরফে স্বাধীন (১০)। তাদের বাড়ি উপজেলার হাতিমারা গ্রামে। একসঙ্গে এত শিশুর প্রাণহানির ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আহত হয় ভ্যানচালক ছাড়া আরও ২ শিক্ষাথী।
বাংলাদেশ সময়: ১৫৩৫ ঘণ্টা; মার্চ ১৭, ২০১৩
এমএন/সম্পাদনা: নূরনবী সিদ্দিক সুইন, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর