৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩
খবরের কাগজে হেডলাইন দেখলাম, কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ, রায়ের পর তার উদ্ধত ‘V’ চিহ্ন দেখানো এবং আরো দেখলাম বেশ কিছু মানুষ এই রায়ের প্রতিবাদ করেছে শাহবাগের রাস্তায়।
সেদিন সন্ধ্যায় আমি, আমার হাজব্যান্ড ও আরো কয়েকজন গিয়েছিলাম শিল্পকলা একাডেমীতে, একটা এক্সপেরিমেন্টাল জার্মান থিয়েটার শো ছিল...মেইন গেটের সামনে পৌঁছুতেই বড়সর ধাক্কা!!!...পুরো এলাকা প্রায় একেবারেই ফাঁকা! থিয়েটার হলেও আমরা গুটিকয়েক দর্শক ও একটা দু’টা টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা ছাড়া পুরো হলই ফাঁকা! ফেরার পথে আমরা নিজেরা বলাবলি করলাম, এতো ভালো একটা নাটক, অথচ কোন দর্শকই হল না! কাছেই শাহবাগ তখন যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসীর দাবিতে ফুঁসছে। আমরা কোন তাড়নাই অনুভব করলাম না সেখানে একবারও উঁকি দেবার।
৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩
খবরের কাগজে ও টিভি চ্যানেলগুলোর নিউজে দেখলাম শাহবাগের খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করছে। জয় বাংলা স্লোগান শুনে মনে মনে ভাবলাম, তাহলে এই প্রতিবাদটার উদ্যোগটাও এরই মধ্যে দলীয়করণ হয়ে গেল! আফসোস হল, দীর্ঘশ্বাস ফেললাম! ফের ব্যস্ত হয়ে পড়লাম আমার বর্তমান দৈনিক রুটিনকাজ নিয়েঃ আমার ৫ মাস বয়সী একমাত্র কন্যা প্রকৃতির পরিচর্যা, ঘর গোছানো, রান্নাবান্না, নিউজপেপারে বিনোদনপাতায় চোখ বোলানো – এক্কেবারে পুরোদস্তুর ‘হোমমেকার’ বলতে যা বোঝায় আর কি!
৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩
বিকেলে কিছু টিভি চ্যানেলে শাহবাগের গণজমায়েতের লাইভ টেলিকাস্ট দেখাচ্ছিল। শাহবাগে উপস্থিত জনতার লাখো কণ্ঠের ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিগুলো কেন যেন আর কোন বিশেষ দলীয় স্লোগান মনে হচ্ছিল না....মনের ভিতরে কেমন যেন একটা অস্থিরতার সৃষ্টি হল..
আমার আশৈশব অণুপ্রেরণা ডঃ মুঃ জাফর ইকবাল স্যারের করজোড়ে নতুন প্রজন্মের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে দেয়া সেই বক্তব্য আমার ভেতর কোথায় যেন একটা বড়সড় নাড়া দিল। আমার কেবলই মনে হতে লাগলো স্যারের এই ক্ষমা প্রার্থনা তো আমারও কাছে...আমি কি এই গণপ্রতিবাদে কিছুই করতে পারব না? শুধু দেখেই যাব নিষ্ক্রিয়ভাবে? কিছু একটা করতে হবে...এখনই সময়!
ভাবতে লাগলাম কোথা থেকে শুরু করবো... যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি আমিও চাই...কিন্তু সেটা তো হতে হবে আইনসিদ্ধ... বিদ্যমান আইন ব্যবস্থার দূর্বলতার সুযোগে কাদের মোল্লার মত ঘৃণ্য একজন যুদ্ধাপরাধী পার পেয়ে যাবে, তা মেনে নেয়া যায় না, এ হতে দেয়া যায় না, তাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল আইনের পরিবর্তনের দাবীটাকেই প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে স্থির করলাম। আমার এই প্রতীকী প্রতিবাদ হবে অনেকটা এরকমঃ অন্ধ বিচার-ব্যবস্থার রুপক হিসেবে কালো কাপড়ে চোখ বাঁধা আমি, দু’হাত কালো কাপড়ে বাঁধা, বদ্ধহাতে কোন মতে ধরে রাখা সংবিধানের বই, আমার (বিচার-ব্যবস্থার) এককাঁধে চেপে বসা বিশালকায় কাদের মোল্লার প্রতিকৃতির হাতে ঝুলছে ন্যায়বিচারের প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’...তার ঠোঁটে বিদ্রুপের ও জয়ের সূক্ষ্ণ হাসি...
আমার একটা ছোট্ট শুভাকাঙ্খী বাহিনী আছে, যারা বয়সে তরুণ-তরুণী, আমরা আমাদের দলের নাম দিয়েছি ‘হিজিবিজি’। এদের সাথে আমার পরিচয়গুলোও বিক্ষিপ্তভাবে। এরা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত প্রান্ত থেকে বিভিন্ন সময়ে ঢাকায় এসেছে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার জন্য, এ দলে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান সবাই আছে। আছে বাঙ্গালী ও পাহাড়ী, আছে শহুরে চাকচিক্যবর্জিত সুদূর মফস্বল কিংবা এখনো বিদ্যুত না পৌঁছুনো এলাকার প্রতিনিধি। আমার উপর তাদের অগাধ বিশ্বাস.....তাদের প্রতি আমারও তাই।
আমার জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপুর্ণ ও প্রকৃত প্রয়োজনের সময়ে এরা কেউ না কেউ অদ্ভুতভাবে কোথা থেকে যেন মূহূর্তেই হাজির হয়ে যায় একেবারে ম্যাজিকের মতো, এবারও তাই হল। আমরা বসলাম, আইডিয়াটাকে ঘসেমেজে ঠিকঠাক করলাম, ঠিক হল আমাদের প্রতিবাদের ভাষাটা হবে পোস্টার ও লিফলেট আকারে, হাতে হাতে রাস্তার সাধারণ মানুষের মাঝে তা বিলি করা হবে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকার দেয়ালে তা লাগানো হবে, ৫ মাসের বাচ্চাকে সামলিয়ে এর চেয়ে বেশী আর কি-ই বা করতে পারি আমি! কিন্তু, হিজিবিজি বাহিনী’র শান্ত দাস, তানিয়া ইসলাম, বাঁধন, জুলিয়ান লনচৌ - রনি বম ও তাদের আদিবাসী বন্ধুরা, আকরাম, হৃদয়, আমার হাসব্যান্ড এহসান রহমান জিয়া, এদের সবার আন্তরিক অণুপ্রেরণায় কখন যেন মনের কোণে কেউ একজন বলে উঠছিল যে একবার অন্ততঃ চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি?
৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩
ভোরবেলায় আমার বাসার ছাদে মোবাইলের ক্যামেরায় ফটোশ্যুট, খুব একটা ভালো আউটপুট পেলাম না, অতএব, আবার চেষ্টা, তারপর আবার...
১০ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩
প্ল্যানমাফিক কিছু এলাকায় পোস্টারিং করা হল। হাতে হাতে বিলিও করা হল। ভাবলাম, এর পর কি?! ...ফেসবুকে আপলোড অবশ্যই!!! কিন্তু, ক্ষুধাটা কোথায় যেন মিটছিলো না।
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩
বাসার সব কাজের মাঝে থেকেও কেবলই মনে হচ্ছিল, আমার দায়িত্ব কি তবে শেষ? ভাবতে ভাবতে একটা বেশ উচ্চাকাঙ্খী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। এই প্রতীকী প্রতিবাদকে শাহবাগ পর্যন্ত নিয়ে যাব, যেতেই হবে, সবার মাঝে পৌঁছানো দরকার এই জরুরি বার্তা...
আমি সবসময়েই ইন্ট্রোভার্ট... কথা যা বলতে চাই, তা প্রায়ই গুছিয়ে বলতে পারি না...ঝামেলায়ও পড়ি এজন্য অনেক সময়েই।...আমি অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম, .আমার প্রতিবাদের ভাষা হবে মৌন...যা বলার, তা প্রতীকী মূক পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়েই বলব...
ব্যানারের জন্য লেখা তৈরী করা হল, প্রায় সারারাত জেগে ব্যানার লেখা, কস্টিউম ও অন্যান্য সব প্রিপারেশন শেষ করা হল...অফুরন্ত প্রাণশক্তি আমার বাহিনীর...প্রত্যেকের চোখেমুখে নতুন আলোর ঝলকানী দেখতে পাচ্ছি স্পষ্টতঃই...
১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩
আজ আমার বাবার জন্মদিন...ছোটবেলা থেকেই এই মানুষটার কাছ থেকে নানান সময়ে, নানান রুপে দেশপ্রেমের সংজ্ঞা শিখেছি। আজ সকাল থেকেই ভেতরে ভেতরে কেমন একটা উত্তেজনা বোধ হচ্ছিল...আমাদের সবারই কম-বেশি...আমার দলের কিশোর-কিশোরীদের সবার জন্যও এটা এক নতুন অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে...
দুপুরে বাসা থেকে বের হবার ঠিক আগ মূহুর্তে টিভিতে বেকিং নিউজে দেখি, জামাত-শিবিরের কর্মীরা ধানমন্ডি, পান্থপথ, কারওয়ান বাজার এলাকায় ব্যপক তাণ্ডব চালিয়েছে..এবং পুলিশের প্রতিরোধের মুখে আশেপাশের অলিগলিতে ঢুকে পড়েছে....ড্যাম ইট!...আমি ও আমার হাসব্যান্ড একটা বড় সংশয়ের মধ্যে পড়ে গেলাম, কারণ আমরা দু’জন নাহয় সাহসটা দেখাতে পারবো...কিন্তু, হিজিবিজি’র অন্য সদস্যদের আমরা ছাড়া ঢাকা শহরে তো সেই অর্থে কোন অভিভাবকও নেই... যদি যাবার পথে কোন বড় বিপদ ঘটে যায়! চরম একটা সিদ্ধান্তহীনতায় পড়লাম...কারণ, আমার বাসা থেকে শাহবাগ যেতে হলে পান্থপথ, কারওয়ান বাজার কিংবা ধানমন্ডি হয়েই যেতে হবে...ব্যানার, ফেস্টুন, প্রপস, মানুষ সব মিলিয়ে আমাদের আয়োজন একেবারে কম নয়...এখন তবে কি করব! ..আমরা কি তবে এতদূর প্রিপারেশন নিয়েও শেষ পর্যন্ত কিছুই করতে পারবনা! যেতে পারবা না শাহবাগে!!!
আমার বাচ্চার জন্মের আগে আমি শেষ শ্যুটিং করি এপ্রিল ২০১২ পর্যন্ত। সেই সময় আমার পেশাগত জীবনটা শুধু স্ক্রিপ্ট পড়ে মেকাপ-কস্টিউমে ক্যামেরায় শট দেয়া, আর ডিরেক্টরের কাট বলার পর আবার জাগতিকতার মাঝে ফিরে আসা...এর মাঝেই ঘুরপাক খাচ্ছিল...বাচ্চার জন্মের পর হল সম্পূর্ণ নতুন এক উপলব্ধি...তুলতুলে হাতপায়ের এই ছোট্টমানুষটার মাঝে নতুন করে প্রকৃত ভালবাসার ডেফিনিশন খুঁজে পেলাম...ভালই তো চলছিল জীবন...জীবনের নিয়মে...কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে সমগ্র বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশীরা যেন নতুন করে জন্ম নিল...আমার ভেতরেও যে দেশপ্রেম নামক একটি সুপ্ত স্ফুলিঙ্গ ঘুমিয়ে ছিল এতকাল...তা তো আগে কখনও বুঝিইনি! এই শাহবাগ গণজাগরণের মধ্য দিয়ে আমার আত্মবিশ্বাসও আজ প্রবলভাবে জাগ্রত। বড়রা অনেকেই এতদিন বাঁকা হাসিতে টিটকারি দিয়ে বলতেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে কোন গভীরতা নাই, এদের জীবন শুধু ফেসবুক, কেএফসি আর মোবাইলে রাতভর কথা বলা, চ্যাটিঙ্গেই সীমাবদ্ধ। বলতেন, এদের কাব্য প্রতিভার দৌড় শুধু ফেসবুক স্ট্যাটাস পর্যন্তই। তাদের আজ আমি আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে বলতে চাই, the new generation is awake...প্রকৃতিই যেন আমাদের নতুন প্রজন্মকে একেবারে হাতে ধরে একটা স্বর্ণোজ্জ্বল ক্ষেত্র তৈরী করে দিল এই অভূতপূর্ব mass awakening of consciousness-এর...
এতদিন ভাবতাম, একজন শিল্পী হিসেবে আমার সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গাটা শুধুমাত্র সততার সাথে নিজ কাজটা করে যাওয়ার মাঝেই। কিন্তু, এই গণজাগরণের মধ্য দিয়ে আমি এখন উপলব্ধি করতে পারি, মাতৃভূমি ও দেশপ্রেম আরো অনেক বড় একটা ধারণা, অনেক গভীর একটা চেতনা, যা আগে কখনও এত প্রবলভাবে অনুভব করিনি, করতে শিখিনি। দেশপ্রেম যেন রবি ঠাকুরের সেই অমর বাণী, “আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে...”-এর মতই ধ্রুবসত্য।
ফিরে আসি ১২ ফেব্রুয়ারী ও আমাদের চরম উৎকন্ঠার সেই মূহূর্তে। আমার নবজাতকের দিকে একমূহূর্ত চাইলাম, মনে মনে বললাম, আজ যদি আমি না যাই, তবে নিজের কাছে, ওর কাছে আমি মা হিসেবে কি জবাব দেব! এরকম একটা সঙ্কটমূহূর্তে শান্ত, তানিয়া একটু ভেবে কনফিডেন্টলি বললো, আমরা যাব...ওদের সেই বলার মাঝে আমি সম্পূর্ণ নতুন এক চেতনার বহিঃপ্রকাশই দেখতে পেলাম... সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা শাহবাগ যাব, বিপদ যাই হয়, দেখা যাবে। রওয়ানা হলাম। বেশ অনেকটা পথ ঘুরে অবশেষে পৌঁছুলাম টিএসসির মোড়ে। অজস্র মানুষের ভীড়...এতোদিন টিভি পর্দায় দেখা শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর আমাদের সামনে আজ বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়ে...এরপর শুধুই সামনে এগিয়ে যাওয়া...যেতেই হবে...পেছনে ফেরার আর কোন মানেই হয় না...
দুপুর বারোটা থেকে সন্ধ্যা প্রায় সাতটা, আমরা শাহবাগের আনাচে কানাচে...আমি কালো কাপড়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় আক্ষরিক অর্থেই একেবারে অন্ধের মতো থেকেছি, হেঁটেছি এই পুরোটা সময়... আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না, শুধু শুনতে পাচ্ছিলাম লাখো মানুষের বজ্রকন্ঠের শ্লোগান...বিকেলে মূল মঞ্চের কাছে সবাই যখন ৩ মিনিট প্রতীকী নীরবতা পালন করলাম...পুরো শাহবাগ ছিল, যাকে বলে পিনড্রপ সাইলেন্সে...আমাদের দেশকে অনেক সময়েই জেনেছি সর্বাধিক শব্দদূষণকারী দেশ হিসেবে...সেই দেশে, শাহবাগের মতো চিরব্যস্ত একটা স্থানে দাঁড়িয়ে... অখন্ড এই নীরবতার মাঝেই টের পেলাম...জনতা জেগেছে...এবার কিছু একটা হবেই হবে...
১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৩: ১লা বসন্ত
আমি বরাবরই প্রকৃতিপ্রেমী (নিজের প্রথম ও একমাত্র সন্তানের নামও দিয়েছি প্রকৃতি)। প্রকৃতি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে নানাভাবে – কখনও ভরা জ্যোৎস্নারুপে, আবার কখনও বা প্রবলবর্ষণে ছাদে জমে থাকা জলকণার রুপে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে পাশ করে বের হবার পর থেকেই নানান কারণে ১লা বসন্তে আর শাহবাগ-ভার্সিটি-টিএসসি এলাকায় যাওয়া হয়ে ওঠে না – কখনো পারিবারিক ...কখনো বা পেশাগত...নানান কারণেই...
কিন্তু এবারের ১লা বসন্ত একটা জীর্ণ অনুভূতি দিল আমাকে...সেই অনুভূতিটাকেই নিয়ে এলাম আমার প্রতিবাদী ভাষার প্রকাশে...শাহবাগে...তিনজনের একটি ছোট্ট দল, আমি সমেত... আইডিয়াটা ছিল এরকমঃ
তিনটি জীবন্ত বৃক্ষ, হেঁটে চলেছে শাহবাগের রাস্তা ধরে, কখনও বা দাঁড়িয়ে পড়ছে ক্লান্তিতে নূহ্য হয়ে...তিনটি বৃক্ষই শুষ্ক, রুক্ষ...যারা বসন্তের আগমণের প্রতীক্ষায়...এ বসন্ত শুধু আক্ষরিক বসন্ত নয়...এ বসন্ত দেশপ্রেমী সবার... ৪২ বছরের আরাধ্য, রাজাকারমুক্ত, যুদ্ধাপরাধীমুক্ত দেশের মাটির বসন্ত...আমাদের শরীর জুড়ে গাছের বাকল ...কোনটাতে লেখা “এসেছে বসন্ত, ডাকেনি কোকিল”, কোনটাতে “নতুন পাতার অপেক্ষায়”, আবার কোনটাতে “আজও বাতাসে রাজাকারের গন্ধ, তাই আমার ফুল ফোটেনি আজও”। আমাদের সম্মিলিত ভাবে ধরে রাখা বিশাল ব্যানারে লেখা ছিলঃ “new leaf, new life, new bangladesh (waiting for...)” এবং, “আজ বসন্ত, কিন্তু তবুও আমরা বসন্তের অপেক্ষায়”…আমাদের প্রত্যাশা ছাপিয়ে শাহবাগের উপস্থিত জনসমূদ্র আমাদের আপন করে নিল, নিয়ে গেল একেবারে মূল মঞ্চে। এ একেবারেই অন্য এক অনুভূতি, ভাষায় ব্যক্ত করার মত না…ভেতরে ভেতরে শিহরণ তুলে দেয়া এক স্মৃতি আমার জন্য, আমাদের জন্য…
১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৩: ভ্যালেন্টাইন’স ডে
আমি কখনই ভ্যালেন্টাইন’স ডে কনসেপ্টটায় নীতিগতভাবে বিশ্বাস করিনি। ভালবাসা প্রকাশের জন্য আবার বিশেষ কোন দিন লাগে নাকি! কিন্তু, এবারের প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণ আমাকে নতুন করে শিখিয়েছে ভালবাসতে, দেশকে…দেশের জন্য এই ভালবাসা এত প্রবল, উদ্দামরুপে কখনো ধরা দেয়নি আমার কাছে, আমাদের কাছে, এর আগে।
আবারও অন্ধ বিচার-ব্যবস্থার প্রতীক হয়ে শাহবাগে নামলাম সহযোদ্ধাদের নিয়ে। সেদিন সন্ধ্যায় ছিল দেশব্যাপী মোমবাতি প্রজ্জ্বলন কর্মসূচি। আমি কখন, কোথায় হাঁটছি, দাঁড়াচ্ছি, কিছুই দেখতে না পেলেও আমার চারপাশের লাখো মোমের উত্তাপ ঠিকই অনুভব করছিলাম। এই উত্তাপ শুধু মোমের আলোসৃষ্ট নয়, বরং বিগত ৪২ বছরেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করতে পারায় এই মাতৃভূমির পরতে পরতে যে গ্লানির হিমের পাহাড় ক্রমশঃ গড়ে উঠেছিল, এবং আজ এই প্রজন্ম চত্ত্বরের গণজাগরণের মধ্য দিয়ে সেই প্লানির হিম একটু একটু করে গলে পড়তে শুরু করেছে, এ যেন তারই উত্তাপ। একটা পর্যায়ে উত্তেজনায় রীতিমত কাঁপুণি হচ্ছিল সর্বাঙ্গে। হিজিবিজি’র উপস্থিত সবাইও বিস্ময়াবিভূত, আবেগাপ্লূত, ঠিক বুঝতে পারছিলাম। 
২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৩: আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
ইতিহাসের বইয়ের পাতায় পড়া নির্ভীক ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, আব্দুল মতিন, ভাষা শহীদ রফিক, জব্বার…আত্মপ্রত্যয়ী, মূল শহীদ মিনারের অন্যতম নকশাকারী ভাস্কর নভেরা, ৭১-এর রনাংগণের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা, কিংবা শহীদ জননী জাহানারা ইমাম…এঁদের প্রত্যেকেরই স্ব স্ব সময়কাল, আদর্শ, অন্দোলনক্ষেত্র - সব অমিল ছাপিয়ে একটি বোধ সবার মাঝে ছিল অভিন্ন ও প্রবল…আর তা ছিল অগাধ, নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম…দেশের প্রতি নিখাঁদ এই ভালবাসার এক অদৃশ্য সূতোয় সকলের অন্তরাত্মা ছিল একই সরলরেখায় বাঁধা। এই ধারণা থেকেই আমার এবারের ২১ ফেব্রুয়ারীর পরিকল্পনার মূল স্লোগান ছিলঃ একই সূঁতোয় বাঁধা
সকল প্রাণ…
এই মৌণ মিছিলে প্রতীকী রুপে ছিলেন ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, আব্দুল মতিন, ভাষা শহীদ রফিক, ভাস্কর নভেরা, ৭১-এর মুক্তিযোদ্ধা, জাহানারা ইমামের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ২০১৩-এর প্রজন্ম, সবাই। সবাই একে অপরের সাথে রক্তিম লাল সূঁতো দিয়ে বাঁধা ছিলাম সারাটা দিন…মূল ব্যানারে লেখা ছিলঃ “আমরা আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রি, এখানে থামবো না”
শেষ কথা,... নাকি নতুন শুরুর!
আমার হাজব্যান্ড এহসান রহমান জিয়া নিরীক্ষাধর্মী মিউজিক নিয়ে কাজ করে। ওর সাথে আমার একটা theatrical rock project আছে সেই ২০০৫ থেকে...The scarlet sky...এর নাম। ২০০৯ এর ফেব্রুয়ারীর ২৫ তারিখে বিডিআর বিদ্রোহের সেই কালরাতে ওর লেখা ও সুর করা একটা সঙ্গীতের লিরিকটা ছিল এরকমঃ
ত্রিমাত্রিক জীবন যখন স্ফটিক বলয়ে আবদ্ধ
উত্তাপে বাষ্পীভূত আমার আবেগ
ঈষৎ আলোর আন্দোলন দূর আলো আঁধারির অস্পষ্টতায়... আমি দেখি না, দেখেও দেখি না
অবচেতন সুরলোকের অগ্নিচ্ছ্বটায়
উদ্দীপ্ত আমার আকাশে যখন বর্ষার ঘনঘটা
ক্ষরাক্লীষ্ট ধরাধামে শত সহস্র বিমূর্ত আর্তনাদ... আমি শুনি না, শুনেও শুনি না
সেদিন, এতবড় রক্তক্ষয়ী ও মানবতাবিরোধী এই ঘটনা যে মূহূর্তে ঘটছিল পিলখানার ভেতর... এই দেশের সাধারন একজন মানুষ হিসেবে কোন প্রতিকার বা প্রতিরোধের উপায় খুঁজে না পাবার গ্লানি ও ব্যর্থতা থেকেই এই গানটি আমরা করেছিলাম।
আজ ৪ বছর পর, ২০১৩-এ শাহবাগের এই পবিত্র প্রজন্ম চত্বরের মাটি ছুঁয়ে আমার দৃপ্তকন্ঠে বলতে ইচ্ছা করছে, আমাদের নতুন প্রজন্ম জেগেছে...আমরা অন্যায় দেখে শুনে নীরব না থেকে তার বিরুদ্ধে বলতেও শিখেছি।
এ ক’দিন শাহবাগ যেয়ে আমি আবারো বুঝতে পেরেছি, তুমি যদি মন থেকে বিশ্বাস করে ভালো কিছু কর, হাজারো মানুষ তোমার পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। এ এক অবাক সংযম – নিজের বিবেকের সাথে, অন্তরাত্মার সাথে...বাংলাদেশের নানান প্রতিকূলতার মাঝে নতুন এই প্রতিকূলতায় থেকেও নতুন প্রজন্মের এই সংযম ছড়িয়ে পড়েছে উদ্বুদ্ধ প্রতিটি ঘরে ঘরে। আমাদের ‘হিজিবিজি’র এখন এক সরলরেখায়।
জয় বাংলা, জয় মানুষ।
লেখক: অভিনয়শিল্পী
বাংলাদেশ সময়: ১৮১০ ঘণ্টা, মার্চ ০৫, ২০১৩
এমকে/ একেএ