 |
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (ঢাকা) থেকে: বহুল আলোচিত তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের অন্তবর্তীকালীন চুক্তিতে ভারত রাজি হয়নি; তাই বাংলাদেশও ট্রানজিটের সম্মতিপত্রে সই করতে রাজি হলো না।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শেখ হাসিনা ও মনমোহন সিংয়ের শীর্ষ বৈঠকে পানি ও ট্রানজিট নিয়ে নিষ্ফল এ আলোচনার কথা বৈঠক সূত্র বাংলানিউজকে নিশ্চিত করে।
বৈঠক সূত্র জানায়, বাংলাদেশের ৪৬টি পণ্যকে ভারত শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিতে সম্মত হয়েছে। এ পণ্যগুলোর বেশিরভাগই গার্মেন্টস বা তৈরি পোশাক সম্পর্কিত। বাংলাদেশের তৈরি ৪৭টি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার চাইলেও ভারত একটি পণ্য বাদ দেয়।
একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। এটি হলো ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট অন কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট’। এটি উন্নয়নের জন্য সহযোগিতামূলক কাঠামোগত চুক্তি।
বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সম্মত হওয়া ইস্যুগুলোতে চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও প্রটোকলগুলো স্বাক্ষরিত হয়। সবমিলিয়ে ১০টি।
এগুলো হলো: বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে ট্রানজিট সুবিধা চালু করতে সমঝোতা, সুন্দরবন সুরক্ষা, রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুরক্ষা, মৎস্য ক্ষেত্রে সহায়তা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহায়তা, বিটিভি ও দূরদর্শনের মধ্যে সহায়তা এবং বিজিএমইএ’র ফ্যাশন ইনস্টিটিউট ও ভারতের ফ্যাশন ইনস্টিটিউটের মধ্যে সহায়তা।
বৈঠক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ড. মনমোহন উভয়েই তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরে (সমান সমান হিস্যা) সম্মত ছিলেন। মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সচিব পর্যায়েও তাই ছিল। কিন্তু মমতা ব্যানার্জীর কারণেই তা হল না। এজন্য ড. মনমোহন কিছু মর্মাহত ও দুঃখিত বলে জানা যায়।
বৈঠকের আগেই দু’পক্ষ অবশ্য ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে জানতেন। কারণ তাদের সম্মতি নিয়েই তো ভারতীয় হাইকমিশনার ও পররাষ্ট্রসচিব মিজারুল কায়েস বৈঠক করেন।
দিনভর কূটনৈতিক নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যদিয়ে বৈঠকের সময় ঘনিয়ে আসে। তিস্তা চুক্তি না হওয়ার কথা গণমাধ্যমে প্রকাশের পরই ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে বাংলাদেশ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে এসে পররাষ্ট্রসচিব মোহাম্মদ মিজারুল কায়েসকে তিনি সাফ জানিয়ে দেন তিস্তার অন্তবর্তীকালীন চুক্তি তো হচ্ছেই না, বরং এটি আলোচনাতেও উঠবে না। বাংলাদেশও জানিয়ে দেয়, ‘তাহলে ট্রানজিটও দেবো না।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘চামেলী’ কক্ষে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে দুই প্রধানমন্ত্রী দু’পক্ষের নেতৃত্ব দেন। শেখ হাসিনা ১৭ সদস্যের এবং মনমোহন সিং ১৯ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন।
দুই প্রধানমন্ত্রীর এ বৈঠকে বাংলাদেশ পক্ষে ছিলেন অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান, পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন, ভূমি মন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা, প্রধানমন্ত্রীর তিন উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, ড. গওহর রিজভী ও ড. তৌফিক ই ইলাহী চৌধুরী, অ্যাম্বাসাডর এট লার্জ জিয়াউদ্দিন, ভারতে হাইকমিশনার আহমদ তারিক করিম, পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস প্রমুখ।
অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন- পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসএম কৃষ্ণা, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিব শংকর মেনন, মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রীগণ, পররাষ্ট্র সচিব রঞ্জন মাথাই, বাংলাদেশে হাইকমিশনার রজিত মিত্র প্রমুখ।
বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আসেন। তারা দু’জনে পৃথক দু’টি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
এর আগে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক সন্ধ্যা ছয়টার দিকে শুরু হয়। এর আগে প্রায় কুড়ি মিনিট দুই প্রধানমন্ত্রী একান্তে কিছু সময় কথা বলেন।
এরপর চারমুখ্যমন্ত্রীসহ মনমোহন সিং এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের কয়েকজন মন্ত্রী নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলেন।
শীর্ষ এ বৈঠকের খবর সংগ্রহ করতে আসা সাংবাদিকরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র (আইসিসি)’তে অবস্থান করেন। এখানেই বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য রাখেন।
শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে আমরা উপনীত। দু’দেশের রয়েছে অভিন্ন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর ইতিহাস।
তিনি বলেন, ‘চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশাও অভিন্ন। ২০০৯ সালে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভিন্ন মাত্রায় উপনীত করার উদ্যোগ নেই।’
হাসিনা বলেন, ‘২০১০ সালে আমরা নয়াদিল্লি সফরের পর সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ রচনার জন্য একযোগে কাজ করছি।’
‘ড. মনমোহন সিং এর সঙ্গে আলোচনায় সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অগ্রগতি হয়েছে’, বলেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা ইস্যু আমরা সমাধান করছি। আন্তরিক ও বোঝাপড়ার কারণে এটা সম্ভব হচ্ছে।’
হাসিনা বলেন, ‘কেবল আজকের নয়, আগামীকালের জন্য আমরা কাঠামোগত উন্নয়ন সহযোগিতা চুক্তি করেছি।’
তিনি বলেন, ‘দহগ্রাম আঙ্গরপোতায় ২৪ ঘন্টায় নির্বিঘেœ প্রবেশাধিকার হচ্ছে। ৪৬টি টেক্সটাইল পণ্য ভারতের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।’
মনমোহন সিং তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘দু’দেশের সম্পর্ক এখন আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে ভাল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ভারতে ঐকমত্য রয়েছে।’
‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনায় অংশদারিত্বে নতুন ধারা সৃষ্টিতে একমত হয়েছি। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের জন্য ওটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ’ বলেন মনমোহন।
তিনি বলেন, ‘সবগুলো ক্ষেত্রের সমান উন্নয়ন ঘটাতে আমরা দু’দেশের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতায় কাঠামোগত চুক্তি সই করেছি। এটা ভবিষ্যতের উন্নয়নের পথ নির্দেশক।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সীমান্ত চুক্তিসহ বেশ কয়েকটি চুক্তি ও প্রটোকল সই হয়েছে। দু’দেশের অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে মতানৈক্যের প্রয়োজন নেই কিন্তু উভয় দেশের সমৃদ্ধির অগ্রদূত হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘তিস্তা ও ফেনী নদীর পানি বন্টন গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সম্পন্ন করতে আমরা আলোচনা চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
মনমোহন বলেন, ‘দু’দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আমরা আন্তরিক। বিদ্যুৎখাতে যৌথ কেন্দ্র হবে।
‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সন্ত্রাসসহ প্রতিটি ইস্যুতে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছি’ বলেন মনমোহন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী দুই দিনের দ্বিপক্ষীয় সফরে মঙ্গলবার বেলা ১টা ৪০ মিনিটে ঢাকা আসেন। তার সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন ১৩৫ জন।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ঢাকা আসার কথা থাকলে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে হিস্যা পছন্দ না হওয়ায় তিনি সফর বর্জন করেন। এছাড়া ভারতের পানি সম্পদমন্ত্রী পবন কুমার বানসালও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আসেননি।
বাংলাদেশ সময়: ১৯৩০ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১১