 |
ঢাকা: সফররত ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিরোধী দলীয় নেতা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাতের কর্মসূচি বাতিল করার ঘটনা খুবই শিষ্টাচার বহির্ভুত, দুর্ভাগ্যজনক ও অপ্রত্যাশিত বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তিনি বলেন, সময় নির্ধারণ করেও খালেদা জিয়ার প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা করতে না যাওয়া ঠিক হয়নি।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ও ভারতের সাংবাদিকদের নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রণব মুখার্জির সফর ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে রাজধানীর রুপসী বাংলা হোটেলে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুই দেশের সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব দেন।
প্রণব মুখার্জির সফরের ২য় দিনে তার সঙ্গে দেখা করার কর্মসূচি ছিল বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়ার। জামায়াতের ডাকা হরতালে নিরাপত্তার অভাবের কারণ দেখিয়ে খালেদা শেষ মুহূর্তে এ সাক্ষাত কর্মসূচি বাতিল করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘বিরোধী দলীয় নেতা যখন ভারত সফর করেন, সে সময় তিনি নিজেই প্রণব মুখার্জিকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছিলেন। তাই তার দেখা না করা ঠিক হয়নি।’’
তিনি বলেন, ‘‘কোনো বিদেশি শীর্ষ নেতা যখন বাংলাদেশ সফরে আসেন, তখন রাষ্ট্রনেতা, সরকার প্রধান ও বিরোধী দলীয় নেতার দেখা করা রাজনৈতিক-গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের অংশ। এটা আগে থেকেই চলে আসছে।’’
এটা গণতন্ত্রের জন্যও শুভ নয়- মন্তব্য দীপু মনির।
এ ঘটনা গণতন্ত্রের জন্য ব্যাঘাত ঘটবে কিনা- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘সব দলই তো আর গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার পালন করে না।’’
তবে এতে দুই দেশের সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে উল্লেখ করে দীপু মনি বলেন, ‘‘কারণ, দুই দেশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক খুবই সুদৃঢ়।’’
ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন ও সীমান্ত প্রটোকল চুক্তি বাস্তবায়িত হবেই বলেও দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তিনি বলেন, ‘‘এ দুই চুক্তি নিয়ে ভারত সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশ সেটা বিশ্বাস করে। সীমান্ত প্রটোকল চুক্তির বিষয়টি তাদের সংসদেও অনুমোদন পেয়েছে।’’
বাংলাদেশ সম্পর্কে আল জাজিরা সাম্প্রতিককালে যেসব নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করে আসছে, তা তারা প্রত্যাহার করবে বলেই মনে করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি এটি তদন্ত করে দেখবেন বলেও জানান।
দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর সঙ্গে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশে যা যা ঘটেছিল, সেগুলোর হুবহু মিল রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
দীপু মনি বলেন, ‘‘এই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ওই সময়ের অপকর্মের পুনরাবৃত্তি করে দেশের ভাবমূর্তি বিদেশের কাছে বিনষ্ট করছে। খুন-খারাবি থেকে শুরু করে উপাসনালয় ভাঙচুর, বাড়িঘরে আগুন, সম্পদ বিনষ্টসহ সব ধরনের অপকর্ম তারা আরেকবার করার স্পর্ধাও দেখাচ্ছে।’’
‘‘শুধু তাই নয়, তারা পুলিশ খুন করতেও করতে পিছপা হয়নি।’’
এক প্রশ্নের জবাবে দীপু মনি বলেন, ‘‘পুলিশ কেবল নিজেদের আত্মরক্ষার জন্যই গুলি চালিয়েছে।’’
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের গত চার বছরের কার্যক্রমের বিস্তারিত তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এরপর প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি বলেন, ‘‘ভারতের রাষ্ট্রপতি একজন বাঙালি। এই অঞ্চলের একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। আশা করা হয়েছিল, বিরোধী দলের নেতা তার সঙ্গে দেখা করবেন। দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। কিন্তু তার দেখা না করা ‘খুবই দুর্ভাগ্যজনক’। এটা ঠিক হয়নি।’’
প্রণবের সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের সময়সূচি কিভাবে নির্ধারিত হয়েছিল এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘এটা সরকার ঠিক করেনি। বিএনপি ও ভারতীয় হাইকমিশনের যোগাযোগের মাধ্যমেই ঠিক হয়েছিল।’’
‘‘বিদেশের যে কোনো শীর্ষ ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশ সফরে এলে দেশের সরকার ও বিরোধী দলের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা তার সঙ্গে দেখা করেন। এটাই কূটনৈতিক রেওয়াজ। দীর্ঘদিন ধরে এটা হয়ে আসছে। তাছাড়া বাঙালিরা সাধারণত অতিথিপরায়ন। যে কোনো অতিথিকে স্বাগত জানিয়ে কিংবা আপ্যায়ন করিয়ে আমরা গৌরবান্বিত হই। এ ঘটনায় (প্রণব-খালেদার বৈঠক না হওয়া) এর ব্যতিক্রম হয়েছে।’’
ভারতের রাষ্ট্রপতির সফর থেকে কি মেসেজ পেল বাংলাদেশ? এমন প্রশ্নের জবাবে দীপু মনি বলেন, ‘‘তিনি জনসম্মুখে বক্তৃতা করেছেন। বলেছেন, তিস্তা চুক্তি এবং ল্যাণ্ড বাউণ্ডারির রেটিফিকেশনের বিষয়ে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হবে। ভারতের শীর্ষ পর্যায় থেকে পাওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে, এমন বিশ্বাস বাংলাদেশের রয়েছে।’’
ল্যাণ্ড বাউণ্ডারির রেটিফিকেশন ও সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে বিজেপি সায় না দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছে তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দীপু মনি বলেন, ‘‘এটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ ব্যাপারে তারাই সিদ্ধান্ত নেবে। বাংলাদেশ আশা করে, ভারত তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবে।’’
সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে আসন্ন নির্বাচন আয়োজনের যে তাগিদ প্রণব মুখার্জি দিয়েছেন তা বাস্তবায়নে সরকারের অবস্থান জানতে চান একজন ভারতীয় সাংবাদিক। জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘সব দলের অংশগ্রহণ’ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান। বলেন, ‘‘তার (প্রণব মুখার্জি) বক্তব্য আমি পত্রিকান্তরে দেখেছি। ইতোমধ্যে আমাদের সরকারের অধীনে প্রায় পাঁচ হাজার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। আগামী নির্বাচনও এমন হবে। আশা করি, সব দল অংশ নেবে।’’
শাহবাগের আন্দোলন প্রসঙ্গে দীপু মনি বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগ মনে করে শাহবাগের এই প্রতিবাদ শুধু রাজনৈতিক দলকেই নয়, গোটা বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছে, কিভাবে শান্তিপূর্ণভাবে দাবি তোলা যায়।’’ সরকার এই আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে ইন্ধন দিয়েছে কি না ভারতীয় এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘এখানে একটা দাবি নিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হচ্ছে। শুরু থেকেই সরকার এ আন্দোলনকে স্বাগত জানিয়েছে। সংহতি প্রকাশ করেছে। উৎসাহ যোগাচ্ছে। এ আন্দোলনে জনমানুষের সম্পৃক্ততা রয়েছে।’’
দীপু মনির মতে, শাহবাগে রাজনীতি আছে। কিন্তু দলীয় রাজনীতি নেই।’’
জামায়াতের চলমান কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘‘জামায়াতের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে একাত্তরের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এটা কোনো রাজনীতি নয়। এটা সন্ত্রাস, এটা সহিংসতা। তা বন্ধ করতে হবে।’’
জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘বিষয়টি খতিয়ে দেখবো। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের একটা ভূমিকা রয়েছে।’’
জামায়াতকে মোকাবেলায় পুলিশের সহিংস আক্রমণের ব্যাপারে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘পুলিশের আচরণে কোথাও কোনো বাড়াবাড়ি হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।’’
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, কেবল সাধারণ মানুষকেই রক্ষা করা নয়, পুলিশ নিজেদেরকেও রক্ষা করছে। পুলিশের ওপর আক্রমণ হওয়ার পরই তারা পাল্টা আক্রমণে যাচ্ছে বলেও দাবি করেন দীপু মনি।
বাংলাদেশ সময়: ১২৪৯ ঘণ্টা, মার্চ ০৫, ২০১৩
এসএস/ কেজেড/ সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর- eic@banglanews24.com