৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, শনিবার মে ১৮, ২০১৩ ২:২৫ পিএম BDST banglanew24
02 Jan 2013   04:35:26 PM   Wednesday BdST
E-mail this

ধারাবাহিক উপন্যাস- ৩য় পর্ব

অদ্ভুত আঁধার এক


শাখাওয়াৎ নয়ন
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
অদ্ভুত আঁধার এক ধারাবাহিক উপন্যাস- ৩য় পর্ব

পূর্ব প্রকাশিতের পর...

নুয়ে পড়া মন


ইতোমধ্যে দমকা বাতাসের সাথে একটু একটু বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। বাতাসের তোড়ে পূর্ব পাশের বেড়ার সাথে গোল করে দাঁড় করানো খেজুরপাতার পাটিটি পড়ে গেল। একটু পরে আয়নাটিও পড়ে ভেঙ্গে খান খান। ভাঙা আয়নায় হারিকেনের অল্প আলোয় সালেহা নিজেকে খণ্ড খণ্ড রূপে দেখে। এক খণ্ডে মুখ দেখা যাচ্ছে তো আরেক খণ্ডে কপাল। কেমন জানি ছিন্নভিন্ন দেখাচ্ছে! মুখভর্তি দুঃখরেখা, কপালে কষ্টের ভাঁজ পড়েছে। চোখের নিচে অশ্রুর দাগ। বেঁচে থাকার আহ্লাদটুকু বড় অবহেলায় যেন বেঁচে আছে।
 
দমকা বাতাসে শিকেয় ঝোলানো হাঁড়িতে কয়েকটি রুটি ও একটু পাটশাকের ভাজি পেণ্ডুলামের মতো দুলছে। পিঁপড়ার জ্বালায় মাটিতে কিছু রাখতে পারে না। তাই শিকেয় রেখেছে। তাড়াহুড়ো করে বাচ্চা দুটির হাত-পা ধুইয়ে মুখে কিছু দানাপানি দেয়। ঝড়-বাদলার দিন। ঝড় আসার আগেই খাওয়াদাওয়া শেষ করতে হবে। কখন কী হয় ঠিক আছে? সালেহা বাচ্চা দুটিকে দ্রুত খাওয়া শেষ করার তাড়া দেয়। তারা ঠিকমতো খেতেও পারে না। মেয়েটা আরেকটু খেতে চাচ্ছিল। সালেহাই মানা করে-
এহন থাউক, বেয়ানে খাইচ।

হেনা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। যা দেয়া হয়েছে সে তার ভাইয়ের সাথে চুপচাপ খেয়েছে। সে-ও ঝড়-বাদলাকে বেশ ভয় পায়। খাওয়া শেষ করার পরপরই সালেহার মনটা খারাপ হয়ে যায়। খুব খারাপ হয়ে যায়। একবার এক রাতে রিপন একটু পেট ভরে খেতে চেয়েছিল। ঘরে সেদিন খাবারও ছিল। কিন্তু কোনো এক কারণে সালেহা বলেছিল-
বেয়ানে খাইচ।

পরদিন সকালে তারা কেউই খেতে পায়নি। সেইবার তো রুটিসহ পাতিল, কলমি শাক ভাজিসহ কড়াই, তিন সের আটাসহ হাঁড়িটিও চোরে নিয়ে গিয়েছিল। সেদিন ঘুম থেকে উঠে এসব দেখে যখন বাচ্চা দুটিকে জড়িয়ে ধরে সে কাঁদছিল, তখন পাড়া-প্রতিবেশীরা চোরের কাণ্ড শুনে হাসাহাসি করেছে। কেউ একমুঠো ভাত কিংবা একটা রুটিও দেয়নি।
 
সেদিন সকাল আটটা-নয়টার দিকে হাকিমের মা এসে ঢেঁকি পাড়ানো কাজের কথা বলেছিল। ক্ষুধার শরীরে একটুও শক্তি ছিল না। তার পরও যেতে তো হবেই। এক বাটি পানি খেয়ে রওনা দিয়েছিল। সারা দিন ঢেঁকি পাড়ালে সন্ধ্যায় কমপক্ষে এক সের চাল, আধা সের খুদ পাওয়া যাবেই। দুপুরে যা খেতে দেয় তা বাচ্চা দুটিকে নিয়ে খাওয়া যাবে। সেই কথা মনে করে সালেহার চোখ ছলছল করে ওঠে। কেন যে আজ আবার মেয়েটাকে ‘না’ বলল। রাত পোহালে অবশিষ্ট খাবার খেতে পাওয়ার নিশ্চয়তা কি আছে? আজকাল কত কিছুর খবর পাওয়া যায়! বজ্রপাতে নিহত মানুষের হাড়গোড়ও নাকি চুরি হচ্ছে। হায় রে অভাব! এ দেশের অভাব কোথায় গিয়ে ঠেকবে, কে জানে?

বছর খানেক আগে সালেহার বাড়িতে এক ছড়া শবরি কলা ধরেছিল। কলাগুলো ভালোই বড় হচ্ছিল। যে দেখে তারই নজরে পড়ে। আস্তে আস্তে সেগুলো বড় হচ্ছে আর গাছটা হেলে পড়ছে। গাছটা যাতে ভেঙে না পড়ে, তার জন্য দুটি বাঁশ দিয়ে আড়াআড়িভাবে বেঁধে দিয়েছিল। প্রায় প্রতিদিনই সালেহা ভাবে- যাক, কলাগুলো বিক্রি করলে কমছে কম ৪০-৪৫ টাকা পাওয়া যাবেই।

সামনে ঈদ আসছে। বাচ্চা দুটির জন্য কিছু জামাকাপড় কেনা যাবে। রোজার শুরুতে বিক্রি করতে পারলে ভালো হতো কিন্তু কলাগুলো বড় হচ্ছিল। তাই অপেক্ষা না করে উপায় ছিল না। প্রায় প্রতিদিনই রাস্তা দিয়ে কেউ না কেউ ঈদের বাজার করে বাড়ি ফেরে। সালেহা একবার বাচ্চা দুটির মুখের দিকে তাকায় একবার কলাগুলোর দিকে তাকায়। তার আগে কয়েকটা ঈদে কোনো কিছুই দিতে পারেনি। পনেরো রোজার আর মাত্র একটি রাত বাকি। সালেহার ঘুম আসছিল না। তার মনটা বেশ ফুরফুরে। পরের দিন কলাগুলো বিক্রি করা হবে। বাচ্চাদের কিছু কিনে দিতে পারবে, ভেবেই ভালো লাগছিল। বাচ্চা দুটিকে জিজ্ঞেস করছিল- তোগো কার কোন রঙ পছন্দ?
হেনা বেশ আনন্দের সাথে উত্তর দেয়- ক্যা, মা? জামা কিন্না দিবা?
- হ।
- নীলা রঙ মোর পছন্দ।

রিপন কোনো কথা বলে না, তাই সালেহা রিপনকে জিজ্ঞেস করে- তোর?
- কুনু পছন্দ নাইকা। অইলেই অইল।

রিপন একটু চুপ করে থেকে কী যেন চিন্তা করে জিজ্ঞেস করে- মা, তুমার কুন রঙ?
- হেইডা দিয়া তুই কী হারবি?

রিপন কোনো উত্তর দেয় না। চুপ করে থাকে। রাত পোহালে বাচ্চাদের জন্য ঈদের জামাকাপড় কেনা হবে। নিকট অতীতে এর চেয়ে বেশি আনন্দের ভাবনা একই সাথে তারা তিনজন কখনোই ভাবেনি। শিশু দুটি এবং তাদের মা একটি সুন্দরতম সকালের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে ঘুম ভাঙলে সালেহা ঘর থেকে বের হয়েই দেখে, কলার ছড়াটি নেই। কয়েক মাসে ধীরে ধীরে তাদের মনে সামান্য এক ছড়া কলাকে কেন্দ্র করে অনেক সুখস্বপ্ন বড় হয়েছিল, স্বপ্নের ভারে কলাগাছটির মতোই তাদের মনটাও নুয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন চুরি হয়ে গেছে।

ঝড়ের রাত

রাত যতই বাড়ছে, বাতাসের বেগও তত বাড়ছে। তাহলে কি ঝড়টা মধ্যরাতেই আঘাত হানবে? মধ্যরাতের ঝড় তো খুব ভয়ংকর হয়। ঝড়ের ভয়ে নির্ঘুম তিনজন মানুষ। সালেহা বাচ্চা দুটিকে আগলে ধরে বসে আছে। ঝড়টা সেই সন্ধ্যা থেকে ভালো করে আসছেও না আবার যাচ্ছেও না। ঝড়টা একবার এসে গেলে বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যেত। উলটো থেকে থেকে দমকা বাতাস দিচ্ছে। কার্তিক মাসটা শুরু হতে না হতেই দফায় দফায় সাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এই সময়ে প্রতি বছরই নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। এবার একটু বেশিই মনে হচ্ছে। গহীনাকূল গ্রাম থেকে সাগর খুব দূরে নয়। রিপন জিজ্ঞেস করে- বেয়ান অইব কহন, মা?
- জানি না।

রাত কত হলো সালেহা বুঝতে পারছে না। তাদের কোনো ঘড়ি নেই। রাতের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পশু-পাখির ডাক কিংবা চাঁদ-তারা দেখেও সালেহা সময় বুঝতে পারে। কিন্তু রাতের বেলা সে কখনো বাইরে যায় না। বিপদাপদের কথা বলা যায়? রাতের বেলা শিয়াল ডাকে। কিন্তু আজ তো শিয়াল কিংবা পাখিরাও সেভাবে ডাকবে না। পাখিদের মধ্যে সময়জ্ঞান এবং বিভিন্ন বিষয়ে আগাম খবর দেয়ার ভালোই পারদর্শিতা আছে। কিন্তু এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পাখিগুলো শুধু কিচিরমিচির করছে। কান্নাকাটি করছে। ঝড়ের ভয় পাখিদেরও আছে।

ঝড়-বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পাখিরা। তারপর গরিব মানুষ। ঝড়ের পরে কতগুলো ঘরবাড়ি বিধস্ত হলো তা গণনা করা হয়, কিন্তু কতটি পাখির বাসা ভাঙল, কতটি পাখির বাচ্চা মারা গেল কিংবা ডিম নষ্ট হলো, তার হিসাব কেউ রাখে না। ছোটবেলায় সালেহা কতবার ভেবেছে! সে যদি পাখি হতো, তাহলে যেখানে খুশি সেখানে উড়ে যেত। মেঘের সাথে উড়ে বেড়াত। এই পৃথিবীর কোনো দুঃখ-কষ্টই তাকে ছুঁতে পারত না। কিন্তু জীবনের এই অবস্থায় এসে তার মনে হচ্ছে, পাখিরও দুঃখ আছে। সেই দুঃখ মানুষের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।

শালিক কত দিন বাঁচে কে জানে? সালেহা এ বাড়িতে তিন-চার বছর ধরে দুটি শালিক দেখছে। পাখি দুটি কেমন করে জানি তার পরিবারের সদস্য হয়ে গেছে। রান্না হলেই খেতে আসে। বাড়ির মুরগিগুলো আবার তাদের সাথে হিংসা করে। ঠোকর মারে। তাড়া করে। সালেহা শালিক দুটিকে খুব পছন্দ করে। খেতে দেয়। পাখি দুটির কী সুন্দর চোখ! হলুদ চিকন পা, ঠোঁট! একটা শালিকের এক পায়ে কোনো আঙুল নেই। কে জানে জন্ম থেকেই পঙ্গু কি না? ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। এক পায়ে হাঁটে। মাঝেমধ্যে যখন কাত হয়ে পড়ে যায়, তখন পাখনা মেলে ভারসাম্য রক্ষা করে।

সালেহা হঠাৎ বাদুড়ের ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ পায়, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারে না। ঝড়ের মধ্যে বাদুড়ের ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ পাওয়ার কথা নয়। একটু পরে হুতুমপেঁচার ডাকও শুনতে পায়। গা ছমছম করে ওঠে। এই ঝড়ের রাতে শুধু হুতুমপেঁচা কেন, কোনো পাখিরই তো এভাবে ডাকার কথা নয়। তাই সে ভালো করে কান পাতে। হ্যাঁ। হুতুমপেঁচাই ডাকছে। মেঘের গর্জনের ফাঁকে ফাঁকে ডাকছে। এই পাখিটা সাধারণত মাঝরাতে অথবা শেষরাতের আগে আগে ডাকে। ভয়ংকরভাবে ডাকে। থেকে থেকে কমপক্ষে তিনবার কোপ! কোপ! কোপ! শব্দ করে। মনে হয়, মৃত্যুপুরীর ওপার থেকে ডাকে। এদের ডাক খুবই কুলক্ষুণে। সালেহা দোয়া ইউনুস পাঠ করে বাচ্চা দুটির গায়ে-মাথায় ফুঁ দেয়। হেনাটা একদম কিছু বোঝে না। একটু পরপরই জিজ্ঞেস করছে- তুহান আইব কুন সমায়?
- ক্যামনে কমু? মুই কি জানি? জানি না, মা।

সালেহা কথাটি বলতে না বলতেই কার জানি গলার আওয়াজ পায়। রাস্তা দিয়ে কেউ একজন টিনের চোঙা দিয়ে বেশ জোরে জোরে কিছু একটা বলছে। কথাগুলো তাড়াহুড়ো করে বলছে আর দৌড়াচ্ছে, তাই ঠিকমতো শোনা যাচ্ছে না। সালেহা হেনাকে চুপ করতে বলে ভালো করে কান পাতে। সব কথার মধ্যে ‘ঘূর্ণিঝড় আসছে’ এমন একটি কথা সে পরিষ্কার শুনতে পেয়েছে। ঘূর্ণিঝড় এলে সালেহা কী করবে কিছুই ভেবে পায় না। কিছুক্ষণ পরই মনে হলো রাস্তায় লোকজনের চলাচল বাড়ছে। ঝড়ের মধ্যে এত তাড়াহুড়ো করে লোকজন কোথায় যাচ্ছে? মানুষের কথার গুঞ্জনের মধ্যেও কেমন জানি একটা দুর্যোগের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সালেহা বের হয়ে জিজ্ঞেস করবে কি না বুঝতে পারছে না। ঠিক তক্ষুনি সাত্তার খাঁ’র ডাক শুনতে পায়- রিপনের মা, রিপন! এ রিপন! আরে বাইর অ।
সালেহা ঘরে বসেই উত্তর দেয়- কী অইছে, ভাইজান?
- কী অইছে, জানো না? আইজ সব শ্যাষ অইয়া যাইব। কেয়ামাত অইয়া যাইব। ঘুন্নিঝড় আইতাছে।
- কী করমু এহন? আপনেরা কই যান?
- স্কুলঘরে যাইতাছি। হগলে যাইতাছে। সাত লাম্বর বিপাদ সংকেত দিছে। সাগরে নিরমোচাপ সৃষ্টি অইছে। বাইর অও। বাইর অও। সমায় নাই।

সালেহা কী করবে বুঝতে পারে না। স্কুলঘরে যদি তাকে ঢুকতে না দেয়! তাকে ঢুকতে না দিলেও বাচ্চা দুটিকে তো দেবে। সমাজের সবাই তাকে একঘরে করেছে, কিন্তু তার বাচ্চাদের তো একঘরে করেনি। তার বিচার না হওয়া পর্যন্ত সে কোথাও যেতে পারবে না। কিন্তু জীবনটাই যদি না বাঁচে, তাহলে সমাজের নিষেধ শুনে কী হবে? জীবন তো নিষেধের মাথা নাড়ে না। পরনের শাড়িটাকে একটু এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করে। ফুটাফাটা ছেঁড়া শাড়ি যত খেয়াল করেই পরুক না কেন ছেঁড়া অংশটা ক্যামনে জানি জায়গামতোই পড়ে। সালেহা মুহূর্তের মধ্যে রিপন ও হেনাকে নিয়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি নেয়। তারপর একটু ভেবে রিপনের হাতে হারিকেনটি দেয়। বাচ্চা দুটি আর ট্রাংকটি নিয়ে ঘরের বাইরে পা বাড়ায়। পা বাড়িয়েই পেছন ফিরে তাকায়। অন্ধকারে তার ঘরটিকে ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। ঘূর্ণিঝড়ে ঘরটি হয়তো ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। সালেহার খুব মায়া হয়। আবার ভাবে, ঝড়ের কারণেই সালেহা একঘরে জীবনের বন্দীত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে। গত দুই-তিনটা মাস এই ছোট্ট ঘরটাই তার জন্য কারাগার হয়ে গিয়েছিল। তাই তার মনে হচ্ছে, ঝড়েরও উপকারিতা আছে। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস না হলে আরো কত দিন তার একঘরে হয়ে থাকতে হতো, কে জানে!

সালেহা স্কুলে পৌঁছে দেখে মানুষে গিজগিজ করছে। স্কুলঘরে ঢুকতে কেউ তাকে বাধা দেয়নি। ঘরের মধ্যে এখানে-সেখানে দুই-চারটি হারিকেনে নিবু নিবু আলো জ্বলছে। গ্রামের সবাই এসেছে। নারী-পুরুষ-শিশু কেউ বাকি নেই। এমনকি আরোজ আলী, সুবেদ আলী চোরা, বেশরী, কায়েস, জয়গুনী, আইজ্জা পাগলাও এসেছে। আসবে না কী করবে? মৃত্যুভয় সবারই আছে। কেউ কেউ আবার হাঁস-মুরগি, হাড্ডিসার গরু-ছাগল, বাসন-কোসন, চিড়া-মুড়ি, চাল-ডাল, এমনকি সেকান্দার ঢালী ভাগ্য গণনাকারী টিয়া পাখিটাও নিয়ে এসেছে।

যারা আগে এসেছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ চটের বস্তা কিংবা খেজুরপাতার পাটি বিছিয়ে আরাম করে বসে ছিল। কিন্তু মানুষ যতই বাড়ছে, তাদের আরামে ততই ব্যাঘাত ঘটছে। আরোজ আলীর ছেলে আনেছ বসার জায়গা পায়নি। জায়গা নিয়ে একটু পরপরই বসে থাকা আর দাঁড়ানো মানুষের মধ্যে ঝগড়াবিবাদ শুরু হচ্ছে। ঝড়ের ভয় ও হাঁপানির শ্বাসকষ্ট নিয়ে আনেছ বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সে গরু-ছাগলের মালিকদের উদ্দেশে খেদোক্তি করে- মানুষ বহার জায়গা নাই, গরু-ছাগল লইয়া আইছে! এগুলা লইয়া আইছাও ক্যা?
- মোগো আর আছে কী? কই থুইয়ামু?
- আনছাও ভালা করছাও। খুব ভালা করছাও। তোমরা গরু-ছাগল ব্যাবাক লইয়া বাঁইচ্যা থাহো। মোরা মইরা যাই।

সালেহা বাচ্চা দুটিকে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সাথে কেউই কোনো কথা বলছে না। কিছুক্ষণ পর সে একটা ব্যাপার লক্ষ করে। হঠাৎ হঠাৎ একেকটা শক্তিশালী দমকা বাতাস আঘাত হানলে লোকজন কেমন জানি সুনসান নীরব হয়ে যায়। ঝগড়াবিবাদ থামিয়ে কেউ কেউ বাচ্চা-কাচ্চাদের জড়িয়ে ধরে। কেউ কেউ আবার জোরে জোরে আল্লাহর নাম নিচ্ছে। জিকির করছে। ঝড়ের প্রকোপ আরো বাড়লে কেমন করে যেন জায়গার সমস্যা সমাধান হয়ে যায়। আইজ্জা পাগলা ছাড়া সবাই বসতে পেরেছে। সালেহার সাথে দু-একজন টুকটাক কথাও বলছে।

গ্রামের চিরদিনের শত্রু-মিত্ররাও গায়ে গা লাগিয়ে বসেছে। কাউকে দেখেই বোঝার উপায় নেই যে, এদের অনেকেরই একে অপরের সাথে মুখ-দেখাদেখি পর্যন্ত ছিল না। এই মানুষগুলোই জমিজমা নিয়ে, কেউ ছেলেমেয়ের প্রেম-ভালোবাসার কারণে, কেউ সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে বছরের পর বছর ঝগড়াবিবাদ, মারামারি, মামলা-মোকদ্দমাও করেছে।

গত দুই-তিন মাসে সালেহা অনেককেই দেখেনি, কিন্তু এই দুর্যোগের রাতে হারিকেনের আবছা আলোয় অনেককেই দেখছে। সে কখনো আড়চোখে কখনো সোজাসুজিভাবে সেই সব মানুষকে দেখছে, যারা তাকে একঘরে করেছে। তাদের গলার আওয়াজ কানে এলেই সালেহার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠছে। আবার এটা ভেবেও তার ভালো লাগছে যে, প্রকৃতি গ্রামের সবাইকে আজ একঘরে করেছে। সালেহার সাথে একই ঘরে বন্দী করেছে। সেই ঘরে কেবল সালেহাই মুক্তির স্বাদ পাচ্ছে।

স্কুলঘরটি পুরোনো, নড়বড়ে। অত শক্ত-পোক্ত নয়, টিনের চাল। ঝড়ে থরথর করে কাঁপছে। কিন্তু এর চেয়ে শক্ত, মজবুত বাড়িঘর গহীনাকূল গ্রামে আর নেই। তাই সবাই এখানে এসেছে। স্কুলঘরের দরজা-জানালা ভালোভাবে বন্ধ করা দরকার, কিন্তু স্কুলঘরের দরজা যে ভেতর থেকে আটকানো যায় না। বিষয়টি কারোরই জানা ছিল না। তাই হাইবেঞ্চ দিয়ে দরজা বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু জানালাগুলোর কোনো কোনোটায় খিল নেই। একটা জানালার একটা কপাটই নেই। বৃষ্টি-বাতাস ঢুকছে। সেই জায়গাটা একটু ফাঁকা। সেখানে কেউ দাঁড়ায়নি কিংবা বসেওনি। আইজ্জা পাগলা সেখানে দাঁড়িয়েছে। কেউ তাকে বসতে দেয়নি। যার কাছে গিয়েছে, সে-ই ধমক দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে। পারলে স্কুলঘর থেকে তাকে বের করে দেয়, এমন অবস্থা। ঝড়ের কারণে তা পারেনি। তার মানে কী? সমাজে সুবেদ আলী চোরারও জায়গা আছে, কিন্তু পাগলের জায়গা নেই। আইজ্জা পাগলা ভাঙা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে মহানন্দে ফোঁকলা দাঁত বের করে মুখে বৃষ্টির ছাট লাগাচ্ছে। একটু পরপর বিকট শব্দে সে চিৎকার করে করে বলছে- আদা আছে? আদা আছে?
বশির তালুকদার, রস্তুম কাজী ও ধলু তায়ানী একেকজন একেকবার তাকে কড়া ধমক দিয়ে বলছেন- এ্যাই, থামলি!

আইজ্জা পাগলা থামে না। বশির তালুকদার সালেহার মেজ ভাশুর। গ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী মাতবর। তাঁকে ভয় পায় না এমন মানুষ এই গ্রামে নেই। তা ছাড়া আইজ্জা পাগলার ওপর বশির তালুকদারের একটা ভয়ংকর রাগও আছে। কিন্তু এই ঝড়ের মধ্যে তো আর কিছু করা যায় না। তিনি মনে মনে ভাবছেন- সময়টা ভালো যাচ্ছে না। কয়েকটা দিন যাক, তারপর দেখা যাবে। কিন্তু বশির তালুকদার আইজ্জা পাগলার ওপর যতই রেগে থাকুন না কেন,পাগলের কি তা মনে আছে? পাগল বলে কথা। একটু পরপরই সে বিকট শব্দে বলছে- আদা আছে?

আদা আছে?

‘আদা আছে?’ কথাটি জিজ্ঞেস করাটা আইজ্জা পাগলার অনেক দিনের রোগ। সে আর কোনো কথা বলে না। গার্লস স্কুল, মহিলা কলেজ ছুটি হওয়ার সময় গেটের কাছে হঠাৎ লাফ দিয়ে পড়ে চিৎকার করে বলে- আদা আছে?

বেশির ভাগ মেয়েই পাগলকে ভয় পায়। ভয় তো পাবেই। পাগলের কোনো কাণ্ডজ্ঞান আছে? আইজ্জা পাগলার ভয়ে কারো কারো পিলে চমকে যাওয়ার দশা। মেয়েরা ভয়ে চিৎকার করে ওঠে। এই অপরাধের জন্য আইজ্জা পাগলা বেশ কয়েকবার মারও খেয়েছে। একবার তো গার্লস স্কুলের গেটের সামনে এক মেয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। আইজ্জা পাগলা আর যায় কোথায়? মেয়ের ভাইয়েরা এসে কঠিন মার দিল। সেই মারেই পাগলার একটা চোখ নিবু নিবু হয়ে গেছে। মুখের সামনের দিকে ওপরের পাটির দুটি ও নিচের পাটির একটি দাঁত পড়ে গেছে। ঘটনাটি বিবিসির খবরের মতো চারদিকে রাষ্ট্র হয়ে গেল। মার খাওয়ার পর অনেক দিন পর্যন্ত আইজ্জা পাগলাকে আর দেখা যায়নি। কিন্তু হঠাৎ করেই শহরের বখাটে ছেলেরা সবাই আইজ্জা পাগলা হয়ে গেল। কেউ কেউ মেয়েদের সামনে লাফ দিয়ে পড়ে বলে- আদা আছে? আবার কেউ কেউ রাতের বেলা যুবতী মেয়েদের বাড়ির কাছে গিয়ে চিৎকার করে বলে- আদা আছে?

কয়েক দিনের মধ্যেই রিকশাওয়ালা, বাসের হেলপার, ঠেলাগাড়ির চালকদের মধ্যে ‘আদা আছে?’ কথাটি খুব জনপ্রিয় হয়ে গেল। রাস্তায়, মার্কেটে ‘আদা আছে?’ কথাটি সংক্রামক ব্যাধির মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বিদ্যুৎ চলে গেলে কিংবা সিনেমা হলে নায়িকার বিশেষ দৃশ্য এলে পিনপতন নীরবতা ভেঙে বিকট শব্দে কেউ কেউ চিৎকার করে বলে- আদা আছে?

আদার যন্ত্রণায় মানুষ অস্থির হয়ে গেল। স্কুল-কলেজের মেয়েদের মধ্যে কাকে, কবে, কোথায়, কোন ছেলে ‘আদা আছে?’ বলেছে, তা গল্পের বিষয় হয়ে গেল। কিন্তু সমস্যা হয়েছে অন্য জায়গায়। যেসব ছেলে জীবনে কোনো দিন মেয়েদের টিজ করত না, ভদ্র ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিল, তারাও মেয়েদের দেখলে বলে- আদা আছে?

এই সমস্যাটিকে কেন্দ্র করে কয়েকটি এলাকায় মারামারি পর্যন্ত হয়ে গেল। হবে না কী করবে। মফস্বলে প্রভাবশালী পরিবারের মেয়ে-বউদের টিজ করলে মারামারি তো হবেই। অবস্থা বেগতিক দেখে স্কুল-কলেজের পক্ষ থেকে মেয়েদের উত্ত্যক্তকারীদের শায়েস্তা করতে পুলিশের সাহায্য চাওয়া হলো।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশি তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়া হলো। ইতোপূর্বে এসব উত্ত্যক্তকারীকে ‘রোমিও কেইস’-এর আসামি বলা হতো। কেমন করে জানি দ্রুতই ‘রোমিও কেইস’ নামটি বদলে ‘আদা কেইস’ কথাটি চালু হয়ে গেল। পুলিশের এসব একদম ভালো লাগে না। তাদের একটাই কথা-
খুন-খারাবি, চুরি-ডাকাতি, নারী নির্যাতন, ধর্ষণসহ নানা রকম সমস্যা সামাল দেয়াই কঠিন। তার ওপর কোত্থেকে এক আইজ্জা পাগলার ‘আদা কেইস’ নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এসব কার ভালো লাগে?

তাই যেটাকে ধরতে পারত, বিসমিল্লাহতেই আচ্ছামতো প্যাঁদানি দিত। তারপর জিজ্ঞেস করত- বল শালা, তোর বাপের নাম কী?

রোমিও কেইসে ধরা পড়লে বেশির ভাগ ছেলেই পুলিশের কাছে বাবার নাম ঠিকমতো বলত না। কারণ, রোমিওদের বাবাকে খবর দিয়ে থানায় আনত। তারপর মুচলেকা দিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে নিতে হতো। তাই রোমিওরা কম যেত না। পুলিশ বাবার নাম জিজ্ঞেস করলে দুলাভাই কিংবা মামার নাম বলে দিত। এতেও যে সমস্যা হয়নি তা নয়। অবিবাহিত মামার কাছেও খবর গেছে যে তার ছেলে রোমিও কেইসে ধরা পড়েছে।

স্কুল-কলেজের বাংলা শিক্ষকেরা ‘আদা-জল খেয়ে লাগা’, ‘আদার বেপারী’ টাইপের বাগধারা পড়াতে গিয়ে নিজেরাই হেসে ফেলেন। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে লোকজন দোকানে গিয়ে কিছু কিনুক বা না কিনুক প্রথমেই বলে- আদা আছে?

সময়ের স্বাভাবিক নিয়মে যখন সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে এল, সবাই যখন ভাবল যে আইজ্জা পাগলা আর বেঁচে নেই, ঠিক তখনই লোকচক্ষুর অন্তরালে সে একদিন রাতে গ্রামে ফিরে আসে। কিন্তু তার পুরোনো অভ্যাস একটুও বদলায়নি।

আইজ্জা পাগলা সালেহার স্বামী আলমের সহপাঠী, একসময়ের বন্ধু। একসাথে ‘গুনাই বিবি’ যাত্রাপালা করেছে। সালেহার বিয়েতে সে বরযাত্রী হয়ে গিয়েছিল। তার আসল নাম আজিজ ধুনকি। এই অঞ্চলে যারা লেপ-তোশক বানায়, তাদের বলে ‘ধুনকি’। ধুনকি বংশের একজন ভালো ছেলে হিসেবে গ্রামে সবাই তাকে চিনত। আজিজ এসএসসি পর্যন্ত লেখাপড়াও করেছে। টাকাপয়সা খরচ করে দালাল ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিল। সে যখন প্রথমবার দেশে আসে, আলম তখন বাড়িতে। আজিজ দেখা করতে এলে সালেহা জিজ্ঞেস করে- ওই দ্যাশে ক্যামনে গ্যালেন, ভাই?
- হেইয়া আর জিগাইয়েন না ভাবি। অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়া যে কী কষ্ট! হুইন্না করবেন কী?
- কী রহম?
- রাইতের আন্ধারে বন-জঙ্গল পার অইয়া যাইতে অয়। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ডারে থাহে শিকারি কুত্তা। মাইনষের চোখ ফাঁকি দেওন যায় কিন্তু কুত্তার চোখ কি ফাঁকি দেওন যায়?
- তাইলে গ্যালেন ক্যামনে?
- মোরা গেছি অন্য পতে।
- হেই পতে কুত্তা আছিল না?
- না। তয় আরো ভয়ংকর জিনিস আছিল।
- হেইডা আবার কী?
- কুমির।
- কন কী?
- হ। ঠিকই কই। জ্যান্ত কুমির। শতে শতে কুমির।
- এত কুমির পাইল কুতায়?
- হেই জাগায় একটা গাঙ আছে। গাঙের মইধ্যে কুমির ছাইড়া রাখছে।
- আপনে হেই গাঙ পার অইয়া গ্যাছেন?
- হ।
- ডর করে নাই?
- না। মোরা কি জানতাম নিহি যে গাঙ ভরা কুমির?
- জানতেন না ক্যা?
- জানমু ক্যামনে? দালালে লইয়া গ্যাছে রাইতে। তহন রাইত বাজে দুইডা-তিনডা।
- তারপর?
- তারপর আর কী? গাঙের পাড় যাইয়া ব্যাকটিরে কয়, হাতড়াইয়া পার অ।
- আপনেরা পার অইতে পারছিলেন?
- ব্যাকটি পারে নাই। দলে আছিলাম সতেরো জন। তিনজন দক্ষিণ আফ্রিকা যাইতে পারে নাই।
- কই গ্যাছে?
- কই যাইব আর? কুমিরের প্যাডে গ্যাছে।
- হ্যাগো মইধ্যে মোগো দ্যাশের কেউ আছিল?
- হ। একজন আছিল।
- আহা রে! আপনের কিছু অয় নাই?
- না। আল্লাহর রহমাত আছে।

কথাগুলো বলতে বলতে আজিজের চোখ ছলছল করে ওঠে। চেহারা অন্য রকম হয়ে যায়। পানি খেতে চায়। পানি খেয়ে একটু পরে আবার বলা শুরু করে- দক্ষিণ আফ্রিকা ঢোহার পর প্রতম বেশ কয় দিন না খাইয়া থাকতে অইছে। তারপর এট্টা কয়লাখনিতে কাম পাই। বেতন-কড়ি ভালোই। তয় অনেক কষ্টের কাম।

দীর্ঘশ্বাস মেশানো গলায় কথাগুলো বলতে বলতে আজিজ সেদিন চলে যায়। তার কিছুদিন পরই সে বিয়ে করেছিল। সে কথা এখনো সালেহার স্পষ্ট মনে আছে। নতুন বউ নিয়ে তাদের বাসায় দাওয়াত খেতে এসে আজিজ বলেছিল- ভাবিজান, আপনেই কন, মর্জিনা অনেক সোন্দর না?
সালেহা এ রকম একটা প্রশ্নের জন্য একদম প্রস্তুত ছিল না। হ। সোন্দর। খুব সোন্দর। -কথাটি বলেই সালেহা হেসে দিয়েছিল। খাওয়াদাওয়া শেষ করে আজিজ বলেছিল- নাইকোলের ইট্টু হলা দিতে পারবেন? না থাকলে থাউক।
- পারমু। কী হারবেন?
- দাঁত খোঁচাইমু।
- দিতাছি।
- দাঁত লইয়া আছি বড় জ্বালায়। কী যে করি? পানি খাইলেও দাঁতের মইধ্যে আটকায়।

সেদিন রাতে সালেহা আলমকে বলেছিল- দেখছ? আজিজ ভাই মর্জিনারে কত্ত ভালাবাসে!
- হ।
- হ আবার কী? সত্যিই ভালাবাসে।
- হ। বুঝছি তো, নতুন বিয়া করছে তো; যাউক না কয়ডা দিন।

তারপর শুধু কয়েক দিন নয় কয়েকটা বছর কেটেছে। মর্জিনার প্রতি তার ভালোবাসা একটুও কমেনি। বরং আজিজ মর্জিনাকে বিদেশে নিয়ে গেছে। খনি শ্রমিকের চাকরির কারণে মর্জিনাকে ঠিকমতো সময় দিতে পারত না বলে নিজেকে অপরাধী মনে করত। তার চাকরিটা ছিল একটু অন্য রকমের। কয়লাখনিতে কয়লা ওঠানোর কূপে কাজ করতে হতো। কূপগুলো একেকটা তিনশো থেকে দুই হাজার ফুট গভীর। সেই গভীর কূপের তলায় আজিজের কাজ। রুটিন অনুযায়ী কখনো দিনে কখনো রাতে মাটির নিচে ডিউটি করত। দিনের পর দিন মাসের পর মাস মাটির নিচে কাজ করে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ইতোপূর্বে কারো শারীরিক কারো মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। কিন্তু আজিজের কোনো সমস্যাই হয়নি। কারণ, কাজকে সে পবিত্র এবাদত মনে করত। সবাইকে মজা করে বলত- মানুষ মরলে তিন হাত মাডির নিচে যায়। মুই বাঁইচ্যা থাইক্যাই তিনশো হাত মাডির নিচে যাই। মাডির নিচের জীবন কী জিনিস তা বুঝবা, একদিন বুঝবা। হা হা...।

কেউ কেউ পালটা প্রশ্ন করত- এত নিচে যাও ক্যামনে আজিজ?
- কন কী? লিফট আছে না?

মাটির নিচ থেকে বারো ঘণ্টা ডিউটি করে যখন ওপরে উঠত, আজিজ তখন বড় বড় চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত। রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে চারদিকে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পৃথিবীটা দেখত। এত আলো! এত বিশাল আকাশ! এত মানুষ! এত বাতাস! এত্ত কিছু! সবই ভালো লাগত। যেসব জিনিস আগে তুচ্ছ মনে হতো, তা-ও ভারি সুন্দর লাগত। চিৎকার করে তার বলতে ইচ্ছে করত- পৃথিবীটা এত সোন্দর! জীবনটা এত সোন্দর! আগে তো বুঝি নাই!

খনিকূপ থেকে আজিজ উঠে আসার পর মর্জিনাকে তার কাছে বেহেশতের হুরপরীদের চেয়েও বেশি সুন্দরী মনে হতো। আজিজ তাকে অপলক চোখে চেয়ে চেয়ে দেখত, কিন্তু মর্জিনাকে তা বোঝাতে পারত না। তাই বলত - তুমারে যুদি কূপের মইধ্যে একদিন লইয়া যাইতে পারতাম! তাইলেই বুঝতা।

আজিজ যখনই মর্জিনার দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকত, তখনই মর্জিনা বলত - আফনে এ রহম কইরা মোর দিকে চাইয়া কী দ্যাহেন? মুই কি অত সোন্দর?

আজিজ কোনো উত্তর দিতে পারত না। মুখে কথা আটকে যেত। শুধু মর্জিনার চোখের দিকে তাকালেই আজিজের এ রকম হয়। বুকের মধ্যে কেমন জানি করে। প্রায় সব কথার শুরুতে ও শেষেই ‘মর্জিনা’ নামটি উচ্চারণ করা তার প্রিয় অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। ছুটির দিনগুলোয় একগাদা বাজারসদাই করে এনে বলত- মর্জিনা, অনেক দিন ইট্টু ভালোমন্দ খাওয়া অয় না। ভালো কইরা রান্না করো তো। জিল্লুরদের আইতে কইছি।

ফরিদপুরের ছেলে জিল্লুর আজিজের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। গভীর রাতে একসাথে কুমির ভরা নদী পার হয়েছে। একসাথে কাজ করে। সবকিছুতেই জিল্লুরের প্রতি তার অনেক ভরসা। জিল্লুরও তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করে। মর্জিনা এসব দেখে প্রথম প্রথম বলত- আফনে জিল্লুর ভাই রে এত বিশ্বাস করেন ক্যা? পর মানুষ রে কি এত বিশ্বাস করা ঠিক?
- বিদ্যাশে পরকেই আপন কইরা লইতে অয়। নাইলে কি থাহন যায়?

মর্জিনা আজিজের যুক্তি মেনে নিত। আজিজ প্রায় সব ছুটির দিনই খাওয়াদাওয়া শেষে সঙ্গীদের নিয়ে তাসের আড্ডায় বসত। খেলা শেষ করার জন্য মর্জিনা তাড়া দিলে সে হা হা করে হেসে বলত- মর্জিনা, এ রহম করো ক্যা? আর এক সেট। এইটাই শ্যাষ মোনাজাত, মর্জিনা।
‘শ্যাষ মোনাজাত’ কথাটি বলেই মর্জিনাকে বলত- মর্জিনা, এক কাপ চা দিবা নাকি, মর্জিনা?

এভাবে কমছে কম তিন-চার কিস্তি চা না খেয়ে তাসের আড্ডা ভাঙত না। যতবার চা দেয়া হতো, ততবারই জিল্লুর হাসিমুখে বলত- ভাবি যে চায়ের মইধ্যে কী জিনিস দেয়, এত দিনেও বুঝতে পারলাম না। ভাবি, ঘরে কি আদা আছে? চায়ের মইধ্যে আমার একটু আদা খাওয়ার বদ অভ্যাস আছে।

মর্জিনা আদা দিয়েই জিল্লুরকে চা বানিয়ে দিত। বিয়ের মাত্র বছর দেড়েকের মাথায় এক রাতে আজিজ ডিউটিতে গেলে মর্জিনা জিল্লুরের সাথে পালিয়ে যায়। সেই থেকে আজিজের মাথায় গণ্ডগোল। তখন থেকেই গ্রামের লোকজন বলাবলি করত- আইজ্জা তিনশো হাত মাডির গভীরে যাইতে পারলেও মর্জিনার মনের গভীরে যাইতে পারে নাই।

চাকরি থেকে আজিজ কিছু টাকাপয়সা পেয়েছিল। তার বাবা ও ভাইয়েরা ঠিকমতো চিকিৎসা না করে ‘বউ পাগলা মানুষ কয় দিন গ্যালে এ্যামনেই ঠিক অইয়া যাইব’ টাইপের কারণ দেখিয়ে টাকাপয়সাগুলো খেয়ে ফেলে। একসময় আজিজের অসুস্থতা আরো বেড়ে গেলে বাড়ি থেকে তাকে বের করে দেয়। প্রায় চোখের সামনেই একজন আজিজ ধুনকি ‘আইজ্জা পাগলা’ হয়ে গেল। আজকাল মাঝেমধ্যেই সে সালেহার বাড়ির সামনে রাস্তায় ছাতিমগাছটির নিচে দিন-রাত শুয়ে-বসে থাকে। নীরবে কাঁদে। কিছুদিন হলো তার সাথে একটি রুগ্ন হাড্ডিসার কুকুর জুটেছে। গভীর রাতে আশেপাশে কোনো কিছুর উপস্থিতি টের পেলেই আইজ্জা পাগলা বিকট শব্দে ‘আদা আছে’ বলে চিৎকার করে।  কুকুরটি ঘেউ ঘেউ করে। ঘুমন্ত মানুষজন জেগে ওঠে। দিনের বেলা মেয়েদের দেখলেই আইজ্জা পাগলা বিকট শব্দে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে- আদা আছে?
কিন্তু সালেহাকে দেখলে সে কিছুই বলে না। তার নিবু নিবু চোখেই শুধু অপলক চেয়ে থাকে।

[চলবে]

বাংলাদেশ সময় : ১৬২৮ ঘণ্টা, ০২ জানুয়ারি ২০১২
সম্পাদনা : এম জে ফেরদৌস, pageeditor@banglanews24.com

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান