‘কাঁসার গেলাসে পানি ঢেলে আম্মা ধরে আছেন/ মুখের ভাতটা শেষ হলে যদি আমি পানি চেয়ে বসি/ সেই পানি না খেয়েই যদি ফের ঢাকা চলে আসি আমি/রআম্মা গ্লাস হাতেই দাঁড়িয়ে থাকবেন দাঁড়িয়েই থাকবেন তিনি যেন বায়েজিদ বোস্তমি’।
আনিসুল হকের এই কবিতার মত সত্যি সত্যিই প্রতিটা সন্তানের জন্য মা একজন বায়েজিদ বোস্তামি। সন্তানের কাছে মায়ের চেয়ে প্রিয় দুনিয়াতে আর কিছুই নেই। মা প্রতিটি সন্তানের চলার পথের ঝড়-ঝাপটা আর ক্লান্তি-জড়তায় পরম নির্ভরতার নিবিড় শীতল আশ্রয়। আমাদের নাট্যজগতের বরেণ্য অভিনেত্রী লাকী ইনামও তার দুই গুণী মেয়ে হৃদি হক আর প্রৈতি হকের কাছে ঠিক সেরকম। মা সম্পর্কে দুজনেরই এককথা, আমাদের মা পৃথিবীর সেরা মা।
‘মা’ দিবসে বাংলানিউজের কাছে মা লাকী ইনাম সম্পর্কে দুই বোন হৃদি হক আর প্রৈতি হক বললেন নানা কথা। মা ও মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে লাকী ইনামও বাংলানিউজকে বলেছেন নিজের কথা।
লাকী ইনামের মেয়ে এটা ভাবলেই গর্ব লাগে : হৃদি হক
মা‘কে নিয়ে লাকী ইনামের বড় মেয়ে অভিনেত্রী ও নির্মাতা হৃদি হক উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, পৃথিবীর যত পজিটিভ শব্দ আছে তার সবগুলোই আমি আমার মায়ের জন্য ব্যবহার করতে চাই। জীবনের প্রতিটা মুহূর্তকে তিনি যেভাবে গুছিয়ে সমন্বয় করেছেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। প্রতিটা মানুষেরই কাছেই তার নিজের জীবনের জন্য অনুসরণীয় কিছু মানুষ থাকে, আমার মা হলেন আমার কাছে সেরকম একজন অনুসরণযোগ্য মানুষ। ছোট ছোট শাসনের মধ্য দিয়ে আমাদের দুবোনকে মানুষ করেছেন।
হৃদি হক আরো বলেন, আমাদের ওপর মাকে কখনো তার মতামত আরোপ করতে দেখিনি। কৈশোরের বয়সন্ধিকালের আবেগী সময়েপ মাকে দেখেছি কাছের বন্ধু হতে। যেন মা ঠিক আমার সমবয়সী একজন বন্ধু। যেন একই ভাবনায় তরঙ্গিত হচ্ছি দুজন। মা আমাদের দু বোনের মধ্যে বিশেষ একটা বোধ ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, যার কারণে আমাদেরকে কঠোর শাসনের প্রয়োজন পড়েনি। আমি সবসময় অনুভব করেছি, আমি এমন এক মায়ের সন্তান যাকে সবসময় সব কাজে ভাল করতেই হবে। মাকে তো সবাই ভালবাসে, কিন্তু সব মা সম্মানের জায়গাটা অর্জন করতে পারেনা। আমার মা তার কাজের মাধ্যমে এমন একটা সম্মানজনক অবস্থানে নিজেকে নিয়ে গেছেন আমি যে লাকী ইনামের মেয়ে এটা ভাবলেই গর্ব লাগে।
মাকে কি উপহার দেন মা দিবসে? এই প্রশ্নের জবাবে হৃদি বলেন, যে কোন দিবসই আনন্দের উপলক্ষ। আমরা একটা আড্ডাবাজ পরিবার। যে কোন উপলক্ষে আমি আড্ডাটা জমিয়ে তোলার চেষ্টা করি। যে কোন উপলক্ষে সবাই উপস্থিত থাকাটা শ্রেষ্ঠ উপহার বলে মনে করি। মা দিবসে মা আমাদের মাঝে থাকবেন না। নাগরিক নাট্যাঙ্গনের মঞ্চায়নে রবীন্দ্রনাথের নাটক ‘ মুক্তির উপায়’ এর প্রদর্শনীতে কলকাতায় যাচ্ছেন। প্রতিটা দিনই মায়েদের বলে আমি মনে করি। তারপরেও বলতে চাই -মা তোমাকে অনেক অনেক ভালবাসি। মুখ ফুটে ভালবাসার কথা হয়ত বলা হয়নি কিন্তু অনুভব করি সবসময়। মা তুমি ভাল থেকো।
মা আমার ভীষন ভাল বন্ধু : প্রৈতি হক
লাকি ইনামের ছোট মেয়ে প্রৈতি হক। পর্দার সামনে কাজ না করলেও পর্দার পেছনে তার সার্বক্ষণিক উপস্থিতি। তিনি নিজেদের গড়ে তোলা থিয়েটার নাগরিক নাট্যাঙ্গনের জন্য নাটক লিখেন, বিদেশী গল্প/নাটক অনুবাদ করেন। নাগরিক নাট্যাঙ্গনে এখন আর্থার মিলারের নাটকের অনুবাদ ‘পুষি বিড়াল ও একজন প্রকৃত মানুষ’ নাটকটি প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রৈতি নিজেও বড় বোন হৃদির সাথে একমত হলেন। তিনি বলেন, আমরা দুবোন একসাথে বড় হয়েছি। সবকিছুই আমরা মায়ের জন্য অর্জন করতে পেরেছি। তিনি আমাদেরকে মননশীল মানুষ করে গড়ে তুলেছেন।
প্রৈতি আরো বললেন, মা ভীষন ব্যস্ত মানুষ। তারপরও আমরা কখনো কোন কাজে মায়ের অভাব বোধ করিনি। শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি তার সময়ের সুষম বন্টন করেছেন। ইচ্ছে থাকলে সবই যে করা সম্ভব সেটা মাকে দেখে শিখেছি। মা এতটাই স্বাধীনতা দিয়েছেন সব কাজে যার কারণে কখনো স্বাধীনতার অবমাননা করার চিন্তা মনেও আসেনি। মা আমার ভীষন ভাল বন্ধু। মা দিবসে মা থিয়েটারের কাজে দেশের বাইরে থাকবেন। মাকে বলব, অনেক ভালবাসি মা তোমাকে। আজীবন আমাদেরকে মাঝে তুমি উপস্থিত থেকো, যেমন এখন আছো। সুস্থ থেকো মা।
মেয়েদের জন্য আমার ভালবাসা অফুরান : লাকী ইনাম
এবার মা লাকী ইনামের বলার পালা। দুই মেয়ের সঙ্গে সহজ সম্পর্কের কথা জানিয়ে তিনি বললেন, আমি আমার মেয়েদের সাথে সব বিষয় শেয়ার করি। যে কোনো বিষয় নিয়ে গুরুত্ব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করি। সম্পর্কের মধ্যে এমন অনেক কিছুই থাকে পরস্পর শেয়ার না করে পুষে রাখলে ফলাফল কষ্টদায়ক হয়। মা হিসেবে আমি সবসময় ওদের মনটা বোঝার চেষ্টা করেছি। কোন কিছু চাপিয়ে দেইনি। আমি শুধু ডিসিশান নেওয়ায় সাহায্য করেছি। প্রতিটা মায়ের উচিত নিজেদের পারিবারিক ঐতিহ্য আর চেতনা দিয়ে সন্তানদের বড় করে তোলা। পাশাপাশি দেশ ও জাতির ইতিহাসও সন্তানকে জানানো প্রয়োজন। ইতিহাস জানলে আবেগের স্ফুরণ ঘটবে। নৈতিকতাবোধ জাগবে দেশের প্রতি আর তার মায়ের প্রতি।
লাকী ইনাম আরো বললেন, আমি আমার সন্তানদের সাংস্কৃতিক পরিবেশে মানুষ করেছি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আবহ তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে আরো মজবুত করেছে। ওরা বরাবর রেজাল্ট ভাল করেছে। আমি ওদের লেখাপড়া নিয়ে কখনো বাড়াবাড়ি করিনি। ওরা জানে ওদের মা ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েটে বোর্ড স্ট্যান্ড করা ছাত্রী ছিল। আর এজন্যেই হয়ত ওদের ভেতর লেখাপড়ায় ভাল করার তাড়না কাজ করেছে। আমি কি পছন্দ করি সবসময় সেটা ওরা বুঝে চলার চেষ্টা করেছে। কোন মা-ই তার সন্তানের কাছ থেকে বেশি কিছু আশা করেন না। মায়েদের কাজই হল স্নেহ দান করা। স্নেহ দানের বিনিময় চাইলে অবশ্যই কষ্ট পেতে হবে। মাকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। একসময় ছেলেমেয়েই হয়ে উঠবে মায়ের পরম বন্ধু। কাছের মানুুষ। ভালবাসা হল বহতা নদীর মত। এটা কারো অংশীদারিত্বের কারণেই কমে না। আজ আমার মেয়েদের ভালবাসায় যোগ হয়েছে স্বামী সন্তান। কিন্তু মেয়েদের জন্য আমার ভালবাসা অফুরান ।
মা দিবস উপলক্ষে পাওয়া উপহার প্রসঙ্গে লাকী ইনাম বললেন, দুই মেয়ের কাছ থেকেই উপহার তো পাই-ই, সেই সাথে দুই ছেলে লিটু আর সাজুও এখন উপহার দেয়। এটা আসলে অনুচ্চারিত ভালবাসা, মুখে বলে না কেউই কিছু। দেখা গেল বালিশের নিচ থেকে বের হল থিয়েটারের আলোক সজ্জ্বার একটা বই। টেবিলে নোট বুকের নিচ থেকে বের হল থিয়েটার ক্রিটিকসের কোন একটা বই। খাবার টেবিলে বসতেই পেয়ে গেলাম পছন্দের কোন কিছু। বুঝে যাই সবই ভালবাসার দান।
বাংলাদেশ সময় ১৯৩৫, মে ১২, ২০১২ সম্পাদনা : বিপুল হাসান
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।