 |
টেবিলের উপর মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা
লোডশেডিংয়ের আঁধারের কাঁধে পা তুলে
সিগারেটটা আলো ছড়িয়ে ধোঁয়া ছড়াচ্ছে,
আলোর ভেতর পা ফেলে ফেলে ধোঁয়ার মধ্যে ঢুকে পড়ছে নারীমাংস।
নারীমাংসে ধোঁয়া বয়ে যেতে যেতে বলছে,
তোমাকে সবটুকু পেতে চায় বলেই তো নারীমাংসকেই পেতে চায়,
মাংসের অধিক কিছু তো নয়!
মাংসের অধিক কিছুর মধ্যে বসে থাকে কেউ একজন ফাঁকিবাজি,
সারা পাড়ার মানুষ ফাঁকিবাজির বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে ঘুম যায়,
হাজার বছর ঘুমিয়ে থেকে মানুষ কি যে সুখ পায়!
ঘুমিয়ে থাকা মানুষগুলো ধর্মীয়ভাবে সামাজিক ও দেশপ্রেমিক
যত না-হয়ে উঠছে, তারচেয়ে আত্মকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছে।
নারীমাংস যখন ডান-বাম থেকে ফাঁকিবাজির বদনখানি চোখ ভরে
তুলে আনতে চাইছে, তখন সারাপাড়া থৈ থৈ করছে জল,
জলের ভেতর ডুব দিয়ে ফাঁকিবাজির মধ্যে প্রেম কাঁটা দিয়ে উল বুনে
চলেছে।
নারীমাংসের অধিক কিছু যদি হয় মুখের হাসি, চোখের খুশি,
তবে হাসি-খুশির মধ্যে বসে পড়ে শীতল ছায়া, আর ছায়ার ভেতর সম্মতি।
আর নারীমাংস ‘উহ্ কি গরম!’ বলে কাপড়গুলো
খসিয়ে ফেলছে শরীর থেকে,
আর যে কবি পুরুষটি বন্ধুকে পাটিসাপটা পিঠার বিলটি পরিশোধের
বায়না করে যাচ্ছিলো নিরন্তর গোঙানি ছড়িয়ে, তখনই
বন্ধুর কাঁধ থেকে মুখ সরিয়ে তোমার শরীরের ঘাম চাটতে শুরু করলো
নারীমাংস!
নারীমাংস, তুমি তখন ভাবছো, পুরুষটি জিভ দিয়ে শরীর থেকে
ঘাম তুলে নিলেও লালা তো ছড়াচ্ছে বেশ!
আর লালার ভেতর দিয়ে প্রেমের ঝাপটানি হরদম চলছেই,
তোমার তখন চিৎকার দিতে ইচ্ছে করবে, তখন তোমার মনের ভেতর
গুনগুনের গুঙানি, আহা!
হয়তো প্রত্যেকেরই নারী ঘর ছেড়ে গেছে যে সব বন্ধুদের,
তারা ঘরে ঘরে মুখে বিষ নিয়ে সাপ হয়ে গুটিয়ে থাকে, আর
এক বুক পিপাসা নিয়ে মানুষের মতো কোমর সোজা করে বের হয়ে
আসতে দেখে খুব মামুলি মানুষের চোখ,
আবার চোখের আড়ালেই রয়ে যায় সারাক্ষণ, আর তারা শুড়িখানায় ঢুকে
বন্ধুকে আমন্ত্রণ পাঠায়, তারপর ঘাম পান করে মহাউল্লাসে,
উল্লাসের ভেতর নীলবিষ বসে বসে কাঁদে সারারাত।
সারারাতটি কখনো কখনো দুধের বালতির ভেতর বসে থাকতে থাকতে
ভাবে, পুরানো নারীতে মন বসে না আর,
নতুন নারীতে চোখের দু’কূল ভরে সুখ ঝুলে থাকে,
সংসার বাঁধনে খোয়াব ধরে না অনন্তরের ভেতর।
কিছু কিছু নারী থাকে তুফান গাঙের নাও,
বৈঠা বাইতে গেলেই নদীর তুঙ্গ জলে বিলীন,
বিজ্ঞমাঝি ডুব দিতে দিতে সৌখিন ডুবুরি,
গভীর জলে ওসামা বিন লাদেনের লাশ হাতে নিয়ে ওঠে ডাঙায়,
নারী সে তুফান ভারী, গভীর জল ভেদ করে কোথায় হারায় তবে!
উধাও নারী আপন পুরুষের বিছানায় বিষদাঁতের উদ্যত ছোবল
পাশে রেখে পাশ ফিরে শোয়, আর
দূরের প্রেমিক পুরুষের বুকে মাথা রেখে সুখের নীল বিষ মাখে
দেহে তার।
একটি অজগর গুড়িখানায় ঢুকে পড়ে রাত পোহাবার আগে,
অজগরের অবাক হাঁ করা মুখের ভেতর নীলের উপর বিষ ভাসে,
শুড়িখানার ভীতু মানুষগুলো দৌড়ে পালায়, তখন কবি পুরুষগণের
আচ্ছন্নতা ভাঙে, তারা তখন আজগরের মুখের ভেতর থেকে
বিষের উপর নীল ভাসিয়ে দেয়, অজগরের মুখ বন্ধ হয়ে আসে।
কবিগণ অজগরের মাথায় চড়ে বসে, অজগর পথে নেমে আসে,
আজগরের পিঠে রোদ চিকচিক করে, কবিগণ একসাথে ঘাম উগরে দেয়,
সারা পথ বমিতে ভেসে যেতে থাকে।
দুর্গন্ধ ভরা বমির ভেতর নেমে আসে মানুষ, গুম হওয়া তার প্রিয় মানুষকে
খুঁজে ফেরে, বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার মানুষের পচা মাংসের ভরা
বাতাস সরিয়ে দিতে চেষ্টা করে।
রবীন্দ্রভক্ত মন্ত্রিগণ রবীন্দ্রসংগীতের সুরে ভেসে যেতে যেতে
হত্যা-গুমের আদেশে স্বাক্ষর দিতে থাকে,
বিরোধী নেতার মদের বোতলের খুব কাছে বাজতে থাকে উর্দু গজল।
মুমূর্ষু কবিগণ অজগরের পেটের ভেতর ক্লান্ত শরীরকে ঢুকিয়ে
গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে,
নারীমাংস, তুমি একবার জিজ্ঞাসো তারে, হ্যালো জানু, কেমন আছো?
২.
নুন-ভাতের ভেতর জীবাণু ঢুকিয়ে দিলে মাছ-মাংসের স্বাদ চড়ে বসে,
জীবাণুর গায়ে একটি মাছি এসে বসে যখন, মাছিটাকে ধরতে গেলেই
ইতি-উতি করে উড়ে উড়ে ফিরে ফিরে আসে।
ধরাধরির কথা যখন আসছে, সেই তো অফিসের বড় বস, ছোটবস,
মন্ত্রী, নেতা, পাতিনেতা আর গো-অক্ষর কেরানির দোহাই লাগবে।
যাকগে বাবা, মহাশয়রা তো মাছ-মাংস-গাড়ি-বাড়ি-বিস্তর নারী এমনকি
আস্ত মানুষও পাকস্থলীতে চালান করে দিয়ে হজম করে ফেলতে পারে,
তুমি বরং নুন-ভাতের মাঝ দিয়ে পয়সা বাঁচিয়ে ললিপপ চুষতে পারো,
আর না পারলে হাতের বুড়ো আঙুল আছেই তো নাকি?
নুন-ভাত, তুমি কি পরনারীর বাঁকগুলো দু’চোখ ভরে তুলে নিতে পারো?
বাঁকগুলো চিনতে চিনতে খুবই উত্তেজিত হয়ে ওঠো?
তোমার আপন নারীর পাকস্থলীর ভেতর কি পর্ণোনারীর গোঙানি
শুনতে পেয়েছো কখনো?
মাছিটা আমাদের কথা বলাবলি শুনতে চলে আসে চায়ের কাপের
খুব কাছাকাছি, আমরা প্রসঙ্গ পাল্টাতে বাধ্য হতে থাকবো তখন,
আমাদের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ, আমরা কল্পনায় রাজা-উজির
মারি, আমরা নিজের ছায়াকে প্রতিপক্ষ দাঁড় করিয়ে তীব্র ভাষায়
আক্রমণ করে নিজের অক্ষমতাকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করি।
এই চেষ্টা করি কথার মধ্যে এক ঝাঁক ঘাম ঢুকে পড়ে হল্লা তোলে,
বোরো আবাদে এবার বাম্পার ফলন হয়েছে, আর ধানের বাজার মূল্যে
ধ্বস নেমেছে, আমাদের ঘামের মূল্যটা যাবে কোথায়? আর বাজার
ফেরতি মানুষ হল্লা করছে, চালের দাম এতো চড়া কেন হবে?
আমরা ধানের মূল্য আর চালের মূল্যের মাঝ বরাবর সরকারকে
বসিয়ে দিই। আমরা বলি, আমাদের রাষ্ট্রের চরিত্র অবশ্যই নিপীড়নমূলক।
আমাদের সমাজ বৈশিষ্ট্য আধা সামন্তবাদী আধা পুঁজিবাদী কি-না
এ ব্যাপারে সমাজবাদীরা একমত হতে পারছেন না দীর্ঘদিন।
আমাদের সরকারগুলো ধনীক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার জন্য সদা জাগ্রত,
সেখানে তারা ধর্মনিরপেক্ষতা ও সর্বশক্তিমানের উপর আস্থাশীল কিনা-
এ বিতর্কের কোন মানে নেই।
ধনী ও গরীবের সমঅধিকারের নিশ্চয়তা কে দেবে ভাই, কে দেবে?
মাছিটি আমাদের কানের পাশ দিয়ে নাকের ডগা ছুঁয়ে উর্ধ্বাকাশে দেয় পাড়ি,
আমরা মাছিটির ডানার কাঁপন চোখে ধরার চেষ্টা করে তাবৎ বিপ্লবীদের
কথা স্মরণ করে এক মিনিট মৌনব্রত পালন করতে থাকি।
আমাদের মৌনব্রতের ভেতর ঢুকে পড়ে একজন গানওলা, সে আবার
হিন্দুত্বে ফিরছে কিনা, সে এখন মার্কসবাদী, তৃণমূলী, না মাওবাদী-
এসব খাজুরে আলাপে ঝড় তুলতে চাই কেউ কেউ।
দোকানি চা-সিগারেটের বিল দেবার প্রশ্ন তুলে আমাদের দিকে চায়,
আমাদের বন্ধুদের কণ্ঠ নেমে আসা শুরু করে তখন,
নেমে আসা কণ্ঠস্বরের ভেতর চারুবাবু আর সিরাজ সিকদার একবার উঁকি
দিয়ে হারিয়ে যায় আঁধারের ভেতর, তখন অনেক রাত হয়ে এলো বুঝি!
গভীর রাতের অন্ধকারের ভেতর অনেক লাশ দেখি, অনেক রক্ত দেখি,
আর লাশের চোখ থেকে স্বপ্ন গড়িয়ে সবুজ রোদ্দুর শক্তিকে
এনজিও’র মহান টাকা-পয়সা বানাবার বিপ্লবের তলে মাথা নত করে
থাকতে দেখি।
আমরা ফিরছি কোথাও, যাচ্ছি কোথাও,
আঁধার ঝোঁপ থেকে বের হয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছি আমাদের হাঁ-হওয়া
মুখের ভেতর দিয়ে ঢুকে পাকস্থলীর দখল নিয়ে নিলো,
আমরা তখন সমস্বরে বলে উঠলাম,
লাল সালাম কমরেড শেখ মুজিব! বীর সিপাহী জিয়াউর রহমান
অমর হোক!
৩.
প্রতিরাতে শেষ সিগারেটটাতে সুখটান দিয়ে ঘুমাতে যাবার বেশ আগেই
সিগারেটের প্যাকেটটা খালি হয়ে পড়ে থাকে দু’চোয়াল শক্ত করে,
তাই বাকি রাতটা জানালা দিয়ে বিরস বদনের দিকে তাকিয়ে
মোড়ের মুদি দোকানটা খুলবার জন্য অপেক্ষা করে থাকি।
আমি কখনো সকালের জন্য অপেক্ষা করে থাকি- এমন কখনই নয়,
আমি কখনই কোন নারীর ধ্যানে রাত জেগে থাকি না।
প্রত্যেক নারীই পরস্ত্রী, সকল নারীই বড্ড অচেনা আমার কাছে,
প্রত্যেকটি নারীর বুকই দলিত-মথিত, প্রত্যেকটি নারীর চোখে
বালুর মাঠে শেয়ালের গর্তের অন্ধকার জেগে থাকে পুরুষের শয্যা
থেকে উঠে।
মুদি দোকানির কিশোরী মেয়েটির টান টান বুক দেখে
দিয়াশলাইটা জ্বলে ওঠে খুব দ্রুতই অস্থির হাতে, আর
আমার বুক ভরে ওঠে সিগারেটের সুখটানের ধোঁয়ায়।
আমার শরীরের সকল ডাঙা কার্বন ডাই অক্সাইডে ভরে উঠলে
শরীরের তন্তু ও তন্ত্রীগুলো অবসর যাপন করতে গিয়ে বাউল লালনের
গানের খুব কাছাকাছি বসে মাথা দোলায়,
আমার দেহের দখল নিয়ে নেয় উইয়ের ঢিবি, উইপোকা আমার দেহের
তন্ত্রীগুলো মেরামত করে দেয়, তখন ঘুমকে বলি, ‘এই চল তো
মৃতের বৈঠকখানাটা চিনে আসি!’
ঘুম ভয় পেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে কিছুতেই পা বাড়াতে সাহস করে না!
উইয়েরা ডানা তুলে উড়ে যেতে থাকলে ঢিবিগুলো ভেঙে পড়ে,
আকাশে মেঘ জমতে শুরু করলে ঘুম ভেঙে যায় আমার।
বাংলাদেশ সময় : ১১৪৭ ঘণ্টা, ০৫ জানুয়রি ২০১৩