 |
ঢাকা: আইনগতভাবেই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ ও নির্বাচন কমিশন আইনের ১২ নম্বর ধারা এ প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দলটি ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিলো।
এছাড়া নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন নিয়ে জটিলতাও রয়েছে জামায়াতের। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন আছে একটি রিট আবেদনও। এদিকে গতমাসজুড়ে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে জামায়াতকে নিষিদ্ধের দাবিও উঠেছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, কোন উপায়ে নিষিদ্ধ বা বাতিল করা যেতে পারে জামায়াতকে?
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেল ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন সমন্বয়ক এম কে রহমানের কাছে।
তিনি বলেন, ‘‘যা করার সরকারকেই করতে হবে। এক্ষেত্রে সন্ত্রাস বিরোধী আইনের আওতায় জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা যেতে পারে।’’
সন্ত্রাস বিরোধী আইন, (২০০৯ সনের ১৬ নং আইন) ১৮ ধারায় বলা হয়েছে, “সংগঠন নিষিদ্ধের কারণ— এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, সরকার কোনও সংগঠনকে সন্ত্রাসী কার্যের সহিত জড়িত রহিয়াছে মর্মে যুক্তিসঙ্গত কারণের ভিত্তিতে, আদেশ দ্বারা, তফসিলে তালিকাভুক্ত করিয়া, নিষিদ্ধ করিতে পারিবে।”
এম কে রহমান বলেন, “জামায়াতের নিবন্ধন নিয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট রয়েছে। বেঞ্চ গঠন করে এ আবেদনটি শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করা হয়েছে। প্রধানবিচারপতি বেঞ্চ গঠন করে দিলে আদালতেও বিষয়টির নিষ্পত্তি হতে পারে।”
মওলানা সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীসহ কয়েকজন আলেম জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল চেয়ে ২০০৯ সালে এ রিটটি করেন। ওই বছরের ২৭ জানুয়ারি বিচারপতি খায়রুল হক (পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি) ও বিচারপতি আব্দুল হাই এর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করেন। রুলে বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়।
এম কে রহমান আরো বলেন, “সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২০ ধারা অনুসারে সরকার নির্বাহী আদেশ দিয়েই জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে। এ জন্য আদালতের রায়ের জন্য অপেক্ষার প্রয়োজন নেই। এমনকি কোনো আইন সংশোধনেরও প্রয়োজন নেই। ওইসব ধারা অনুসারে ২০০৫ সালে বিগত চারদলীয় জোট সরকার জামা`আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশকে (জেএমবি) এবং বর্তমান সরকার হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ করে।”
একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের শীর্ষ সাত নেতাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ এবং ২০১২ সালের ২২ মার্চ এদের বিচারের জন্য দু’টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এ ট্রাইব্যুনাল থেকে এরইমধ্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২৮ ফেব্রুয়ারি নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
প্রথম দু’টি রায়ে আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন করে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছে। জামায়াতে ইসলামী, তার ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ, নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগ, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি, কাউন্সিল মুসলিম লীগ দালালি করে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করে।
কিন্তু কোনো সংগঠনের বিচার করার ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালের ছিল না।
এ অবস্থায় সংগঠনকে বিচারের মুখোমুখি করতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে সরকার। নতুন আইনটি ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে। সংশোধিত আইনে ব্যক্তির পাশাপাশি অপরাধী সংগঠনের বিচার করার ক্ষমতা দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে।
এ বিষয়ে এম কে রহমান বলেন, “ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছে, দলগতভাবে এরা (জামায়াত) গণহত্যায় অংশ গ্রহণ করেছে। তখন সংগঠনের বিচারের ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালের ছিলো না। এখন আইন সংশোধন হয়েছে। আমরা খতিয়ে দেখছি সংগঠনের বিরুদ্ধে কিভাবে অভিযোগ আনা যায়। আর অভিযোগ দিলেও ট্রাইব্যুনাল জামায়াতের বিরুদ্ধে হয়তো কিছু ফাইন্ডিংস দিবে। কিন্তু যা করার সরকারকেই করতে হবে।”
সরকার এ বিষয়ে সময় উপযোগী একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আর নির্বাচন কমিশন আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী, কোন ব্যক্তি মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারাবেন। এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হলে যে কোন সংগঠনের ক্ষেত্রেও এ ধারা প্রযোজ্য হবে।
তাই সরকার উদ্যোগী হলে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা সময়ের ব্যাপার বলেই মনে করছেন আইনজ্ঞরা।
বাংলাদেশ সময়:১৭১৯ ঘণ্টা, মার্চ ০৪, ২০১৩
এমইএস/জেপি