৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, বৃহস্পতিবার মে ২৩, ২০১৩ ৩:৪৪ এএম BDST banglanew24
15 Feb 2012   02:55:49 PM   Wednesday BdST
E-mail this

সুবর্ণার আহাজারি !


বিনোদন প্রতিবেদক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
সুবর্ণার আহাজারি !

একবুক অভিমান, নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্ব নিয়ে ধীমান অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। হুমায়ুন ফরীদির এই নীরব প্রস্থানের অন্যতম কারণ হিসেবে কাছের মানুষদের অনেকেই মনে করছেন সুবর্ণাহীন তার একাকীত্বকে। হুমায়ুন ফরীদির মৃত্যুর পর তার সাবেক স্ত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার মনোভাব জানার চেষ্টা চালায় বাংলানিউজ।

ফাল্গুনের প্রথম দিন যখন সবাই বসন্তকে স্বাগত জানাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই অভিনয় দিয়ে দীর্ঘদিন মানুষের মনরাঙানো প্রিয় অভিনেতা ফরীদি সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি সোমবার সকাল ১০টায় রাজধানীর ধানমন্ডির নিজের বাসায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। হুমায়ুন ফরীদির আকস্মিক মৃত্যুর খবর মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি সময় লাগে নি।

হুমায়ূন ফরীদির দীর্ঘদিনের সাথী সাবেক স্ত্রী সূবর্ণা মুস্তাফার কাছেও পৌঁছে যায় দুঃসংবাদ। সূবর্ণা মুস্তাফা তখন ‘গ্রন্থিকগণ কহে’ নামের একটি ধারাবাহিকের শুটিংয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। গন্তব্য পুবাইলের ভাদুন। সঙ্গে আছে যথারীতি তার তরুণ স্বামী বদরুল আনাম সৌদ। টঙ্গী ব্রিজ পেরিয়ে যাওয়ার পর দুঃসংবাদটি কানে যায় সুবর্ণা মুস্তাফার। দীর্ঘদিনে স্মৃতি তাকে আবেগ তাড়িত করে বলেই হয়তো তিনি গাড়ি ঘুরিয়ে ধানমন্ডির দিকে রওনা দেন।

ধানমন্ডির ৯/এ রোডের ৭২নং বাড়িটির যে এপার্টমেন্টে হুমায়ুন ফরীদি মারা গেছেন, সেটি ছিল সুবর্ণা মুস্তাফার আগে থেকেই চেনা। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, হুমায়ুন ফরীদি ২০০৬ সালে এই এপার্টমেন্টটি কিনে উপহার দিয়েছিলেন তার সেইসময়ের স্ত্রী সুবর্ণা মুস্তাফাকে। ২০০৮ সালের ৭ জুলাই তরুণ স্বামী বদরুল আনাম সৌদের বাহুলগ্না হওয়ার আগে সূবর্ণা মুস্তাফা এই এপার্টমেন্টটি হুমায়ুন ফরীদিকে ফিরিয়ে দেন। সেই এপার্টমেন্টেই নিরবে-নিভৃতে একাকী চিরবিদায় নেন হুমায়ুন ফরীদি।

অনেকেই ভেবেছিলেন, হুমায়ূন ফরীদির মৃত্যুর পর সুবর্ণা মুস্তাফা তাকে শেষবার দেখতেও হয়তো আসবেন না। কারণ সুবর্ণার সেই মুখ নেই। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ধানমন্ডির বাসায় অশ্রুসিক্ত নয়নে হাজির হলেন তিনি। সঙ্গে ছিল স্বামী বদরুল আনাম সৌদ। ততোক্ষণে অবশ্য দেরি হয়ে গেছে। দেখা পেলেন না তিনি ফরীদির। সুবর্ণা মুস্তাফা আসার ঠিক ১০ মিনিট আগেই হুমায়ুন ফরীদির প্রাণহীন দেহ এম্বুলেন্সযোগে নিয়ে যাওয়া হয় বিটিভির উদ্দেশ্যে। ধানমন্ডির সেই বাড়িতে পৌঁছে ফরীদিকে না পেয়ে ভেঁজাকণ্ঠে আক্ষেপ করেন সূবর্ণা, আরও কিছুক্ষণ কেনো রাখা হলো না। কেনো এমন তাড়াহুড়ো করে বিটিভিতে নিয়ে যাওয়া হলো। সুবর্ণার কান্না ভেঁজা আহাজারি অবশ্য উপস্থিত কাউকেই স্পর্শ করতে পারে নি। বরং প্রিয় অভিনেতা ফরীদির মৃত্যুর পরোক্ষ কারণ হিসেবে সুবর্ণাকে দায়ী মনে করায় অনেকেই তাকে দেখে ভেতরে ভেতরে ফুঁসছিলেন। নিজেদের মধ্যে অনেকেই বলাবলি করেছেন, বেঁচে থাকতে যার খবর রাখেন নি, আজ তার প্রাণহীন মুখ দেখার জন্য কেন এই মায়া কান্না!

১৪ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকালে বরেণ্য অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদির প্রতি সর্বস্তরের মানুষের সম্মান প্রদর্শণের জন্য তার মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হয়। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সুবর্ণা মুস্তাফা শহীদ মিনার আসার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। কিন্তু স্বামী বদরুল আনাম সৌদ তাকে সেখান যেতে নিষেধ করেন। মিডিয়ার অনেকেই সৌদকে জানিয়েছে, সুবর্ণার শহীদ মিনার যাওয়াটা ঠিক হবে না। কারণ ফরীদির হাজার হাজার ভক্তের ঢল নেমেছে শহীদ মিনারে। তাদের অনেকেই মনে করেন, সূবর্ণাহীন একাকীত্বই হুমায়ুন ফরীদিকে অসময়ে মৃত্যুর পথে নিয়ে গেছে। সুবর্ণা শহীদ মিনারে গেলে উপস্থিত জনতার রোষে মুখে পড়তে পারেন। পাবলিক সেন্টিমেন্ট বলে কথা। যুক্তির কাছে হার মেনে হুমায়ুন ফরীদিকে শেষবার দেখার ইচ্ছে ত্যাগ করতে হয় সুবর্ণা মুস্তাফাকে।

হুমায়ুন ফরীদির আকস্মিক মৃত্যুর পর সুবর্ণা মুস্তাফার মনোভাব জানার জন্য বাংলানিউজ যোগাযোগ করে তার সঙ্গে। শুরুতে সুবর্ণা মুস্তাফা জানান, কথা বলার মতো মানসিক অবস্থায় তিনি নেই। পরে আবার যোগাযোগ করার পর তিনি অল্পকথায় হুমায়ুন ফরীদি সম্পর্কে বলেন, দীর্ঘদিন আমরা পাশাপাশি ছিলাম স্বামী-স্ত্রী হিসেবে। তবে আমাদের সম্পর্কটা ছিল পুরোপুরি বন্ধুর মতো। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছাড়াও আমরা একে অন্যের ভালো বন্ধু ছিলাম। ফরীদির মৃত্যু মঞ্চ, টিভি আর চলচ্চিত্রে একটা বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। এটা অপূরণীয় ক্ষতি। এমন শক্তিমান অভিনেতা যুগে যুগে খুব কমই আসে।

বাংলানিউজকে সূবর্ণা মুস্তাফা জানান, ঢাকা থিয়েটারে আফজাল হোসেন, হুমায়ুন ফরীদি আর তাকে ডাকা ‘ত্রি-রতœ‘ নামে। খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল তাদের মাঝে। তিনি আরো জানান, চার বছর আগে অর্থাৎ ২০০৮ সালে শেষবার ফরীদির সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। সুবর্ণা মুস্তাফার মা মারা যাবার পর ফরীদি তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। তখনই শেষ কথা। দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে আর কথা হয় নি।

হুমায়ন ফরীদির সঙ্গে সুবর্ণা মুস্তাফা প্রেম-ভালোবাসা, বিয়ে এবং বিচ্ছেদ সবই ছিল মিডিয়া আলোচিত বিষয়। এবার একটু পেছন ফিরে এই জুটির সম্পর্ক গড়ে ওঠা ও ভেঙ্গে যাওয়ার বিভিন্ন ঘটনায় চোখ রাখা যাক।

আশির দশকের শুরুতে টিভিনাটকের তুমুল জনপ্রিয় জুটি ছিলেন আফজাল হোসেন আর সুবর্ণা মুস্তাফা চুটিয়ে অভিনয় করে যাচ্ছেন। আফজাল-সূবর্ণার রোমান্টিক সম্পর্ক নিয়ে পত্র-পত্রিকায় নিয়মিতই রসালো প্রতিবেদন ছাপা হতো। যদিও এর আগে রাইসুল ইসলাম আসাদ ও আল-মনসুরের সঙ্গে সুবর্ণার সম্পর্ক নিয়েও গুঞ্জন শোনা গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া হুমায়ূন ফরীদি সবে অভিনয়টা শুরু করেছেন। প্রয়াত নাট্যকার সেলিম আল দীনের মাধ্যমে তিনি ঢাকা থিয়েটারে যোগ দেন। তার আগেই অবশ্য দীর্ঘ দিনের প্রেমের পরিনতিতে বেলি ফুলের মালা দিয়ে চাঁদপুরের  মিনুকে বিয়ে করেন ফরীদি। বছর ঘুরতেই তাদের সুখের সংসার আলো করে আসে কন্যা সন্তান দেবযানী। শুরু হয় হুমায়ুন ফরীদির টিভিনাটকে অভিনয়। জনপ্রিয়তা তার পিছু নেয়। আসে অর্থ আর প্রতিপত্তি। এরই সাথে ফরিদী- মিনুর ভালবাসাও ফিকে হতে থাকে।

হুমায়ুন ফরীদির দুর্দান্ত অভিনয় ক্ষমতা তাকে নিয়ে যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। ঢাকা থিয়েটারের সতীর্থ সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে জুটি বেঁধে হুমায়ুন ফরীদি কয়েকটি টিভিনাটকে অভিনয় করলে তাদের জুটিও জনপ্রিয়তা পায়। ধীরে ধীরে আফজাল দৃশ্যপট থেকে সরে যেতে থাকে। সুবর্ণার সঙ্গে ফরীদির বন্ধুত্ব একসময় প্রেমে রূপান্তরিত হয়। তারপর ফরীদি তার পুরাতন সংসার ভেঙে সুর্বণার সঙ্গে  শুরু করেন নতুন সংসার। মিনুর সঙ্গে ফরীদির বিচ্ছেদে কষ্ট পেয়েছিল অনেক ভক্তই।

হুমায়ুন ফরীদির সঙ্গে সুবর্ণার মতো বিরোধ দেখা দেয় বানিজ্যিক চলচ্চিত্রে অভিনয় নিয়ে। টেলিভিশন তুমুল জনপ্রিয় অভিনেতা ফরীদিকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন অনেক নির্মাতা। ফরীদির ইচ্ছে আছে, কিন্তু সুবর্ণার আপত্তি। সুবর্ণা চান, ফরীদি টিভি আর মঞ্চনাটক নিয়েই থাকুক। ফরীদির কথা, ‘দেখি না একটা সিনেমায় কাজ করে। আমি তো আমার মতো করে কাজ করব।’ দুজনের মধ্যে সমঝোতা করতে তখন এগিয়ে আসেন আফজাল হোসেন।

বানিজ্যিক চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করে হুমায়ুন ফরীদি ব্যাপক সাফল্য পান। প্রতিটি ছবিতেই তিনি যোগ করেন নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য। চলচ্চিত্রে তুমুল চাহিদা তৈরি হয় ফরীদির। চলচ্চিত্র নিয়ে দিন-রাত তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এদিকে দুরত্ব বাড়তে থাকে সুবর্ণার সঙ্গে। এই দূরত্ব কমাতে সুবর্ণাকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ে নিয়ে আসেন ফরীদি। কিন্তু চলচ্চিত্র দর্শকেরা সুবর্ণা মুস্তাফাকে গ্রহণ করলো না। পরবর্তীতে বাংলাদেশের ছবিতে অশ্লীলতা বেড়ে যাওয়ায় হুমায়ুন ফরীদি চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। আবার টিভিনাটকে ঝুঁকেন। কিন্তু সুর্বণার সঙ্গে গড়ে ওঠা দুরত্ব কমাতে তিনি পারেন নি।

২০০৮ সালে আফসানা মিমির ‘ডলস হাউস’ ধারবাহিকে অভিনয়ের সময় নাটকটির অন্যতম পরিচালক বদরুল আনাম সৌদের সঙ্গে গড়ে উঠে সুবর্ণা মুস্তাফার অসম। বয়সে প্রায় ১৫ বছরের ছোট তরুণ নির্মাতার প্রতি সুবর্ণা এতোটাই অনুরক্ত হয়ে পড়েন যে, ফরীদির সঙ্গে দীর্ঘদীনের দাম্পত্য সর্ম্পক চ্ছিন্ন করতে পিছু পা হননি। এই ঘটনায় মানসিকভাবে ভীষণ আঘাত পান ফরীদি। ষাট বছরের কাছাকাছি বয়সে পৌছে হয়ে যান নিঃসঙ্গ। একাকীত্ব গ্রাস করে তাকে। জীবনের প্রতি একবুক অভিমান, নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্ব নিয়েই হুমায়ুন ফরীদি বিদায় নেন পৃথিবী থেকে।

বাংলাদেশ সময় ১৪২৫, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১২

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

বিনোদন

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান