৫ আষাঢ় ১৪২০, বুধবার জুন ১৯, ২০১৩ ৮:৫৮ এএম BDST banglanew24
05 Jan 2013   05:19:30 PM   Saturday BdST
E-mail this

মোহনা হাসান প্রেমা’র গল্প

আরাধনা


মোহনা হাসান প্রেমা
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আরাধনা মোহনা হাসান প্রেমা’র গল্প

সীমান্ত গাঁয়ের ছেলে হলেও অনেক আগেই কুসংস্কার ছিঁড়ে বের হয়ে গেছে তার মন মানসকিতা। কিন্তু ধর্মীয় বিষয়ে সে সবকিছুই বিশ্বাস করে, আর সে বিশ্বাসের ফলও পেয়েছে। এসএসসি পরীক্ষার আগে পূজো দিয়েছিলো ঠাকুরবাড়ির পুরোনো মনসা মন্দিরে। পাস করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মা মনসার পায়ে রেখে এসেছিলো একবাটি দুধ ও পঞ্চাশ টাকার একটি কচকচে নোট। দুধটুকু অবশ্য ছিলো মায়ের রান্নাঘর থেকে চুরি করা, আর টাকাটা এক পূজোয় বিদেশফেরত মামার কাছ থেকে পেয়েছিলো। কচকচে টাকার নোটটা দিতে কষ্টে বুকের পাজরটা ছিঁড়ে যাচ্ছিলো ওর। কেননা এতো ফর্সা টাকা তার চৌদ্দগোষ্ঠীর কোনো বন্ধু-বান্ধবের কাছেই ছিলো না। কিন্তু কী আর করা, ওই নোটটি ছাড়া আর কোনো টাকাও ছিলো না তখন। তাছাড়া ভগবান বলে কথা, সীমান্তের এতো বড় বিসর্জন নিশ্চয়ই বিফলে যাবে না। যায়ওনি। পরীক্ষায় বন্ধু নরেশের খাতা দেখে লিখতে গিয়ে কোত্থেকে হঠাৎ ম্যাজিস্ট্রেট এসে পেছনে দাঁড়ালো। সীমান্ত মা মনসার নাম জপ করতে করতে কিছুক্ষণ পর পেছনে তাকিয়ে দেখেছে ম্যাজিস্ট্রেট চলে যাচ্ছে।
মায়ের কৃপায় নরেশ ফেল হলেও পাস করে যায় সীমান্ত। এটা দেবীরই কৃপা। মাকে ধন্যবাদ দিতে মন্দিরে গিয়ে মনে মনে চকচকে নোটটি খুঁজতে থাকে সে। কিন্তু পায় না কোথাও। ‘আহা রে, অতো সুন্দর নোটটা যদি পেতাম টুক করে পকেটে ভরে চলে যেতাম’। হঠাৎ মনে হলো মা মনসা সামনে দাঁড়িয়ে সব শুনছে না তো! তখনই কান দুটো টেনে ধরে জিভে একটা কামড় বসিয়ে বললো ‘মা, আমি তো ঠাট্টা করেছি, তোমার দিব্বি খেয়ে বলছি কিছু মনে কোরো না। এভাবেই আমার পাশে থেকো’।

এইচএসসির সময় পূজো দিলো কালীমন্দিরে। মায়ের পায়ের কাছে দুটো কলা রেখে অনেক অনেক মিনতি করলো ‘মা, মাগো এ কলা দুটো ছাড়া আমার কাছে দেবার মতো আর কিছুই নেই। তোমার ভক্ত আমি মা, আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো না। আমায় তুমি পাস করিয়ে দিয়ো, তোমার দিব্বি মাগো। তোমার ভোগে আমি এক ছোবা দই চড়াবো। আমায় একটু দয়া করো। আপাতত এই কলা দুটো নিয়ে তুমি তুষ্ট থাকো। মাগো খুব মিষ্টি কলা, আমি নিজেও একটা খেয়েছি। একেবারে ভেজালমুক্ত’— বলতে বলতে মায়ের মন ভেজানোর জন্য সীমান্ত চোখের জলে গাল দুটো ভিজিয়ে ফেললো। তারপর মন্দির থেকে বের হয়ে সে স্বাভাবিক মানুষ। চোখে পানিও নেই, গলায় ভাঙা ভাঙা স্বরও নেই। হ্যাঁ, মা কালী কথা রেখেছে। পড়াশোনা তেমন না করলেও দেবীর কৃপায় পাস করলো সীমান্ত। রেজাল্ট পেয়েই জয় মা কালী, জয় মা কালী বলে একটু চেঁচিয়ে উঠলো সে। তারপর এদিন ওদিক তাকিয়ে নিজেকে সংযত করে নিলো। কেননা এসব শর্টকাট বুদ্ধি আর কেউ যেন বুঝতে না পারে। মনে সে কি আনন্দ! বাহ! দুটো কলাতেই কেল্লাফতে। একেই বলে ভগবান, ভোগে নয় ত্যাগেই তাদের শান্তি।
কিন্তু আমি যে কথা দিয়েছিলাম এক ছোবা দই চড়াবো... চোখ বন্ধ করে হাত দুটো প্রণামের উদ্দেশে তুলে ধরে সীমান্ত বললো— ‘মাগো কষ্ট নিয়ো না। ভালো দই আশেপাশের সব দোকানেই খুঁজলাম। কিন্তু পেলাম না, তাছাড়া তোমাকে তো আমি খারাপ কিছু খাওয়াতে পারি না।’ দু’ দুবার এতো সফলতা পেয়ে ভগবানের প্রতি তার বিশ্বাস দিন দিন গাঢ় ও শক্ত হয়ে উঠলো। তাছাড়া ভগবানরা যে একটু বোকা, তা বুঝতে বাকি রইলো না। একটু কান্নাকাটি, দু’ একবার পায়ের কাছে কপাল ঠেকানো, মন্দিরের ঘণ্টায় নিয়মমাফিক ঢং ঢং শব্দ, আর একটু-আধটু খাবার জিনিস পেলেই ভগবান হাতের মুঠোয়।

একদিন সীমান্তদের বাড়িতে বেড়াতে এলো তার মায়ের দূর সম্পর্কের বোন ললিতা মাসি। ললিতা মাসি বিধবা, ঘরদোর, জায়গা-জমি কিছুই নেই। তবে তার সুন্দরী যুবতি এক মেয়ে আছে। মাসির মতে মেয়েটা তার সম্পদ। মেয়েকে নিয়ে মাসির সে কি গল্প। ‘কতো বনেদি ঘর থেকে আমার মেয়ের বিয়ের কথা উঠেছে দিদি, কী আর বলবো, কিন্তু আমিই এড়িয়ে চলছি। একটু সবুর করি, আরও ভালো জামাই যদি পাই। ভগবানের কৃপায়, সবুরে আমার মেওয়া ফলবেই। কাকলির বাবা মারা যাওয়ার পর যারা আমাদের কটাক্ষ করেছিলো, তারাই এবার দেখবে আমার মেয়ে কোন ঘরে গিয়ে ওঠে। মেয়ে আমার সাক্ষাৎ মা লক্ষ্মী। এ তল্লাটে এমন মেয়ে আর কার ঘরে আছে শুনি? ’
কথাটা মিথ্যা না। কাকলি আসলেই সুন্দরী। তাছাড়া মেয়ে নাকি সকাল বিকেল শিবের মাথায় দুধ ঢালে, পূজো দেয়, উপোস থাকে। শিবের মতো স্বামী তো তারই প্রাপ্য। কিন্তু সীমান্ত তো শিব নয়। দেখতে জয় হনুমান বৈকি। কাকলিকে প্রেমের প্রস্তাব দিলে ও কি রাজি হবে? ‘যেভাবেই হোক কাকলিকে আমার চাই। ওকেই আমার বউ বানাবো। পেটে ভাত না জুটলেও কাকলিকে দেখলে আমার খিদে মিটে যাবে। জীবনেতো এমন মেয়েই প্রয়োজন।’
কিন্তু মাসির সাথে তার পটবে না। এজন্য মেয়েকেই পটাতে হবে। ‘মেয়েকে রাজি করাবো কিভাবে?’ হঠাৎ মন্দিরে পূজো দেয়ার কথা মনে পড়লো। কেন্দ্রীয় মন্দির। চারিদিকে আলোর ঝলকানি, মেঝেতে শ্বেতপাথরের কারুকাজ। সীমান্ত নিচের দিকে তাকিয়ে নিজের চেহারা দেখতে পায়। চারদিকে কতো ফুল, কতো সুগন্ধ। ধূপ আর ফুলের গন্ধে একেবারে মাতাল করা পরিবেশ। ‘আহা! এমন মন্দিরে ভগবানরা কি শান্তিতেই না আছে। এখানে যা চাইবো তাই পাবো।’ পকেটে অবশ্য কিছুই নেই। বাড়ি থেকে আসার সময় মায়ের সিঁদুরের কৌটাটি চুরি করে এনেছো সে। সেটাকে মায়ের পায়ের কাছে রেখে কাকুতি মিনতি জানালো। মা দুর্গা তখন সবেমাত্র বাবার বাড়িতে এসেছে। সবকিছু হয়তো তেমন গুছিয়ে উঠতে পারেনি। তাই একটু ব্যস্তই মনে হলো মা দুর্গাকে। ‘মা, মাগো তুমি আমায় আশির্বাদ করো। আমি যেনো এ সিঁদুর কাকলির মাথায় ছোঁয়াতে পারি। মাগো তোমাকে দেবার মতো কিছুই নেই। সিঁদুরটা খাঁটি ইন্ডিয়ান, আমার মা আমার এক মামাকে দিয়ে আনিয়েছে। তুমি একটু ট্রাই করে দেখো। অনেক রাঙা। মা আমার কথা তুমি রেখো। আমি কাকলি ছাড়া বাঁচবো না।’

সব দায়-দায়িত্ব মায়ের কাঁধে চাপিয়ে সীমান্ত নিশ্চিন্তে বাড়ি ফেরে। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, দু’সপ্তাহ পার হয়; কিন্তু কাকলির মধ্যে কোনো পরিবর্তন নেই। সীমান্তকে দেখলেই সে অন্দরে চলে যায়। সীমান্তও কিছু বলে না। কিছু করার চেষ্টাও করে না। কেননা তার বিশ্বাস মা দুর্গা আছে। ওদিকে ললিতা মাসিও যাওয়ার সুর তুলেছে। কাকলির নাকি বিয়ের কথা চলছে। ছেলের বাবা সেকেলে জমিদার, তাই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। সীমান্ত মন্দিরে যায়। মা দুর্গা অনেক আগেই বাবারবাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে। সিঁদুরের কৌটাটিও নেই। মন্দির এখন ঠাকুরশূন্য। মা দুর্গা চলে যাওয়ায় ধূপের গন্ধও আর নেই। কী করবে কিছুই বুঝতে পারে না। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে নিজেকে অনেক গালি দেয়। ‘ভগবানের ওপর ভার না দিয়ে নিজে নিজে যদি কাকলিকে আমার ভালোবাসার কথাটা জানাতে পারতাম। ইস! আর দুর্গাদেবী এমনটা আমার সাথে করতে পারলো? এভাবে কথা না রাখা ঠিক হলো?’ তারপরেই মনে হলো, সে মা দুর্গাকে সীমান্ত মিথ্যে বলেছিলো। সিঁদুরটি ইন্ডিয়ান নয়, কোনো এক গাঁয়ের মেলা থেকে মা কিনেছিলো। মা দুর্গা বোধ হয় এ জন্যই রাগ করেছে। ‘মা, মাগো একটু ঠাট্টাও বোঝনি। ইন্ডিয়ান না হলে কী হবে, সিঁদুর তো লালই ছিলো মা।’
বাড়ি ফিরে সীমান্ত দেখলো ললিতা মাসি ও কাকলি চলে গেছে। দিনের পর দিন নাওয়া-খাওয়া আস্তে আস্তে ভুলতে বসলো সে। তার দু’ সপ্তাহ পর বাড়িতে বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র এলো। মা সীমান্তকে ডেকে বললো— ‘সব কাজ গুছিয়ে নে। আসছে মঙ্গলবার কাকলির বিয়ে। কায়স্থ বংশের একমাত্র ছেলে। দাবি-দাওয়া কিছুই নেই। কাকলিকে দেখে ছেলের আর তর সইছে না। চটজলদি ঘরে তুলতে চাইছে। আশির্বাদটি শাদামাটাভাবে হয়ে গেছে। বিয়েটা ধুমধাম করে হবে।’ সীমান্ত কথাগুলো শুনলো। মুখ থেকে তার শুধু একটি কথাই বেরুলো— ও, তাই বুঝি!

বাংলাদেশ সময় : ১৭১৭ ঘণ্টা, ০৫ জানুয়ারি ২০১৩
দ্য-টিকে, এনআরএ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
banglanews24 All Apps
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
IIMEJ
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান