৪ আষাঢ় ১৪২০, মঙ্গলবার জুন ১৮, ২০১৩ ১০:৩৯ এএম BDST banglanew24
01 Oct 2012   05:29:08 PM   Monday BdST
E-mail this

উল্কা’র গল্প

টিংচার ইউথেনেসিয়া


উল্কা
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
টিংচার ইউথেনেসিয়া উল্কা’র গল্প

রবীন্দ্রসদন মেট্রো ষ্টেশনের মস্ত হাঁ করা দরজা পেরিয়ে রিচার্ড নেমে এলো জমজমাট এক্সাইড মোড়ে। রিচার্ডের ধীরস্থির দৃশ্যপটটি প্রতিবারই এক্সাইড মোড়ের প্রাণচাঞ্চল্য ভরিয়ে তোলে নানা রঙে রাঙানো আঁচড়ে। এই আঁচড়ে বিঁধে থাকে তীব্রতা, তীক্ষ্ণতা এবং গতি। এক-দুই-তিন-চার মাত্রা জুড়ে ফেলে সে অনুভব করে কলকল করে প্রবাহিত হয়ে চলেছে স্বরবৃত্ত ছন্দের স্রোত। রেলিঙের এপাশে ফুটপাথ ধরে ঠেলাঠেলি করে এগিয়ে চলেছে আমজনতা আর রাস্তা জুড়ে চলেছে পাবলিক বাস, প্রাইভেট কার আর হলুদ ট্যাক্সির টেক্কা-টাস্ক। বড় বড় বিজ্ঞাপনে কোথাও এক গা গয়না পরে আকর্ষণীয় হয়ে জ্বলজ্বল করছে অপরূপা নারীরা, কোথাও একবাটি পটাটো চিপসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে অল্প বয়েসী ছেলে-মেয়েরদল, আবার কোথাও ফিসফিস করে বলে যাওয়া কোনও শব্দে বেড়ে উঠছে নতুন যৌবনে পা দেওয়া মেয়েটি। এসবে বিশেষ কোনও হেলদোল নেই তার। মেট্রো থেকে বেরুলে রিচার্ডের প্রথমেই চোখে পড়ে এইসব বিজ্ঞাপন। কলকাতা অনেক বদলে যাচ্ছে শুধু এটুকুই মনে হয় তার। বিজ্ঞাপন এক্সাইড মোড় পিছনে ফেলে ফুটপাথ ধরে এগিয়ে চললো রিচার্ড। কিছুটা গিয়ে মোড় ঘুরলেই নন্দন পড়বে। এ পথ তার বহুদিনের চেনা। কাঁধের ঝুলিটা বাগিয়ে নিয়ে অভ্যাসবশত ঝুলি থেকে পেনটা বের করে বুক পকেটে গুঁজলো সে। মোটা কালো ফ্রেমের চশমায় রুমাল বুলিয়ে স্বচ্ছ করলো দৃষ্টি। ট্র্যাফিক পুলিশ রাস্তায় নামেনি এখনও। জেব্রাক্রসিং পেরিয়ে রিচার্ড গিয়ে দাঁড়ালো নন্দনের প্রবেশ পথে।

আজও নন্দনে খুব ভিড় করেছে লোকে। যদিও তারা শুধু মকাই দানা চিবুতে চিবুতে আর কোলায় ঠাণ্ডা চুমুক দিয়ে সিনেমা দেখার জন্য প্রেক্ষাগৃহের সামনে জড়ো হয়েছে তা তাদের হাবভাব দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু এর মধ্যেও থমকচাল খুঁজে পেয়েছে রিচার্ড। তাই বিরক্তি আসেনা তার। কিন্তু কবিতাও যে আসছে না সেটাই অহরহ কুরেকুরে খাচ্ছে তাকে। রিচার্ডের জন্ম বেড়ে ওঠা স্কুল কলেজ সবই কলকাতায় আর কলকাতার চিরন্তন সংস্কৃতি ঝাড়াই মারাই করে গড়ে নেয় নতুন কবিতা জন্ম দেয় নতুন কবির। এসবের অন্যথা হয়নি রিচার্ডের সাথে। প্রেম, শরীর, বিচ্ছেদ, যৌনতা এসব কিছু ছুঁচ সুতোয় টেনে রিচার্ড বুনেছিলো শ্রাবণীর অশরীরী নক্সা কিন্তু সেই কবিতা আটকে পড়েছে কোনও এক অজানা পথে। তা এই চক্রব্যূহ থেকে আর বেড়িয়ে আসতে পারেনি। সেখানেই ঘুরে মরছে বাগাডুলির মতো।  শ্রাবণী রিচার্ডের কলেজ জীবনের প্রেম। সেন্ট পলস্‌কলেজে এসে শ্রাবণীকে দেখার পর থেকেই খাতার পাতায় পেন ছোঁয়ালেই উপচে পড়তো শ্রাবণীর কাজল কালো চোখ, তার শরীর জুড়ে গড়াতে থাকা লাবণ্য, তার ঠোঁটের পাশে তিল, হালকা করে বাঁধা বিনুনির থেকে হড়কে আসা এক ঝিল্লি চুল। আবার সে শখ করে শাড়ি পড়ে এলে কুঁচি, আঁচল, ব্লাউজের পাড় এবং তার ফাঁকে দেখে ফেলা নরম পাতলা কোমর নাড়িয়ে দিতো তার কবিত্ব। শ্রাবণীকে তখন খুব ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছা করতো রিচার্ডের। দু’হাত দিয়ে তার থেকে সব কবিতা তুলে বিছিয়ে দিতে ইচ্ছা করতো খাতার পাতায়। শ্রাবণীর এসব কিছুই জানা ছিলো না। রিচার্ডের একজোড়া চোখ সবসময় ঘোরাফেরা করতো তার প্রতিটা কৌণিক বিন্দু জুড়ে। প্রতিদিন কলেজের লেকচার, ক্যান্টিন, লাইব্রেরিতে ফেরোমনের মতো ছড়াতে থাকা শ্রাবণীর মাধুর্যকে নিজের করে নিতে একদিন সাহস দেখিয়ে ফেলেছিলো রিচার্ড। বাস্কেট বল কোর্টে সেকেন্ড ইয়ারের গেরুয়া বলটাকে বাস্কেট করার আনন্দ উল্লাসের মাঝে শ্রাবণীর লাজুক কণ্ঠস্বর ভেসে এসেছিলো রিচার্ডের কানে। ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’ প্রবাদটা রিচার্ডের জীবনে বেশ অন্য ভাবে দেখা দিয়েছিলো। বাতাসের ঝাঁপটায় বিগড়ে গেছিলো ধর্মের কল! আজও খুব হাওয়া দিচ্ছে গরমটা বেশ কম। নন্দন প্রেক্ষাগৃহের পরিধি ঘিরে থাকা ছোট ছোট ফোঁয়ারার জল উপরে উঠে নিচে নেমে আসার সময় হাওয়ার ধাক্কায় ঘেঁটে যাচ্ছে। ছিটকে গিয়ে পড়ছে এদিক-ওদিকের দেয়ালে, জলের গভীরে কৃত্রিম আকৃতি নিয়ে। সেই আকৃতি ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে ভর করে। বাতাসে সবকিছু ভাসে! শব্দ, আলো, ধুলো, গন্ধ! একমুঠো বাতাস ধরতে পারলেই কবিতা হতে পারে। কিন্তু শ্রাবণী ছাড়া রিচার্ড আর কিছুই ধরতে পারেনি কখনো। আজ একবার হাত বাড়িয়ে বাতাস ধরার চেষ্টা করলো সে। যদিও এটা প্রথম চেষ্টা নয়। আঙুলের ফাঁকফোঁকর দিয়ে হুড়হুড় করে ফসকে গেল কবিতারা! মৃদু হেসে পিচের রাস্তা ধরে রিচার্ড এগিয়ে চলল জীবনানন্দ সভাঘরের দিকে।

‘ঔরস’ কালচে নীল সিল্কের বিরাট চাদরের উপর ঝলমল করছে। তার পাশে এলোমেলো তুলি টেনে আঁকা রয়েছে বিমূর্ত নারীপুরুষ প্রকৃতি। জীবনানন্দ সভাঘরের কবি আসনের পেছনের দেওয়াল জুড়ে রয়েছে ‘ঔরস’-এর ব্যানার। এই ছোটকাগজেও একসময় রিচার্ড গোমসে্‌র কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। কবি আসন থেকে তার গম্ভীর গলা কাঁপিয়েছে সভাঘরের প্রতিটা মানুষের চেতনাকে। কিন্তু কয়েক মাসে রিচার্ডের কাব্যচেতনা পথভ্রষ্ট হওয়ায় ধীরে ধীরে লেখনী শিথিল হয়েছে, বেড়ে গেছে শাব্দিক জীবাশ্ম। এই জীবাশ্মের ভার বহন করতে করতে দিন দিন কেমন অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে রিচার্ড। সভাঘরে অনেক চেনা মুখ প্রতিবারের মতো জমা হয়েছে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা চলছে বিভিন্ন কবি ও তাদের কবিতা নিয়ে। আজ ঔরসের শততম সংখ্যার আলোচনা হবে কবিতা পাঠের সাথে। কিছুমাস আগেও রিচার্ড কেমন একটা আইডেণ্টিটি ক্রাইসিসে ভুগতো। নিজেকে অজান্তেই একঘরে করে নিচ্ছিলো সে নিজেকে। কবিসভায় এসে সকলের থেকে পালিয়ে বেড়াতো, কেউ কথা বলতে এলেই চোখ নামিয়ে নিতো। যদি সমস্বরে জানতে চায় ‘কি ‘‘জেহাদের নিষ্কৃতি’’ কেমন চলছে?’ অপমানের বাঁধন বেঁধে রেখেছিলো তাকে। কিন্তু এখন মুখ লুকিয়ে পালানোর আর দরকার পড়ে না। স্পট লাইট ছেড়ে এক ঝটকায় সকলের অলক্ষ্যে চলে গেছে সে। এই ধরনের অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে আছে রিচার্ড। কলেজ জীবনে তার সাথেও ঘটেছে এরম ঘটনা কিন্তু তখন সকলে হন্যে হয়ে খুঁজেছে তাকে। অভিমানে গাল ফুলিয়েছে সহপাঠী সিনিয়ার জুনিয়াররা। সেকেন্ড ইয়ারের পরীক্ষা শেষে কলেজ ফেস্ট। কলেজ চেঁচাচ্ছে জয় রক্‌ বলে আর রিচার্ডের কলমে—
‘গ্রে স্কেল ফিল্ম রিল স্ক্যাণ্ডেল
মাফিন ময়েসচারাইসার মেরুশিরালিপি
খসে পড়ে লতানের পায়ে।

দশদিক বেতার বলয় শ্রাবণের মৌতাতে কবির মিনার
পেরিস্কোপে জেড লাইন স্তর কিছু স্তরিভূত যৌন বিলাপ

কয়েকটা মৌন ফুটনোট হাড়গিলে কলির কেরামতি।
আঙ্গিনায় বিছানো বাসরুট কোলাজ ছিঁড়ছে স্যাটায়ার
নগ্ন আঁচিল ঢাকা হৃদয়ে মিলন পরিযায়ী
পেশির ফুটোয় বাঁচে শ্রাবণীর পীড়িত যৌবন—’

ভাইব্রেশান মোডে থাকা মোবাইল ফোনটা কেঁপে উঠলো শ্রাবণীর স্টাডি টেবিলে। ফিলসফি নোটের পাহাড় সরিয়ে ফোনটাকে অন করে কানে দিলো সে, ‘হাই রিচি!’
‘ঘুমাচ্ছিলে?’
‘নাহ বলো...’ এলিয়ে আসা কোঁকড়া চুলে হাত বুলিয়ে উত্তর দিলো শ্রাবণী।
‘আজ আরেকটা লিখলাম। এখনও পর্যন্ত ৯৯ টা!’ উচ্ছ্বসিত রিচার্ড।
‘ওয়াও! অনেকগুলো হলো তো! আর কটা লিখবে? এবার অন্যকিছু লেখো...’
‘এটা জানি না কটা লিখবো। অন্যকিছু লিখতে ইচ্ছা করে না। তোমাতেই শুধু কবিতা খুঁজে পাই প্রিয়ে!’ হালকা হেসে উঠলো রিচার্ড। ‘এগুলো একদিন একটা বইতে থাকবে আর সেই বইটা তোমাকে ডেডিকেট করবো।’
‘আমি অতো কবিতা পড়তে ভালোবাসি না কিন্তু এগুলোতে আমি আছি তাই একটা আকর্ষণ রয়েছে! আচ্ছা রিচি তুমি হঠাৎ আমায় নিয়ে লিখতে গেলে কেন? কতবার জিজ্ঞাসা করেছি। কিছুতেই উত্তর দাও না!’
‘তোমাকে অমর করে রাখার জন্য! শোনো নি রবি ঠাকুর লিখেছিলেন ‘‘আজি হতে শত বর্ষ পরে
কে তুমি পড়িছো বসি আমার কবিতা খানি কৌতূহল ভরে। আজি...’’
রিচার্ডের কথা মাঝপথে কেটে দিয়ে শ্রাবণী উত্তর দিলো ‘শত বর্ষ! শত দিন বাদেই কেও পড়বে কিনা সন্দেহ! এতো কাব্য করে উত্তর না দিয়ে সত্যিটাই বলতে পারতে আমাকে পটানোর জন্য কবিতা লিখতে শুরু করেছিলে। আর এখনও এই কষ্টসাধ্য কাজটা হাসিমুখে চালিয়ে যাচ্ছো! যাই হোক কাজটা ভালোই হলো। ইস আমি যদি কবিতা লিখতে পারতাম! কি ভাল হতো... তোমাকে নিয়ে দু-চার কলম...’
স্বশব্দে হেসে উঠলো রিচার্ড ‘ওকে। এই সিরিজের শেষ কবিতা তুমি লিখবে। আর তোমার ধারণাটা যে পুরো ভুল তা নয়। তোমাকে পটানোর জন্য না তোমাকে দেখে আমার কবিতা পেতো! সাউন্ডস ক্রেজি কিন্তু সত্যি। তারপর মনে হলো তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি কবিতায় তাই বাস্তবে ভালবাসতে চাইলাম। চাইলাম কবিতার বাইরেও শ্রাবণী থাকুক আমার জীবনে। যাকে কবিতায় আবিষ্কার করেছি তাকে অনূভবে আরেকবার আবিষ্কার করি... আর ‘‘শ্রাবণী চিরকল্প’’ তো কলেজে হৈ চৈ...’
কথা অসম্পূর্ণ রেখে পিক্‌পিক্‌আওয়াজ দিয়ে কেটে গেল রিচার্ডের ফোন। ব্যালেন্স শেষ। কলব্যাক করেনি শ্রাবণী। হয়তো ওর ফোনেও ব্যালেন্স নেই এই সান্ত্বনার মাঝে রিচার্ডের ফোন বেজে উঠলো কলেজের কালচারাল সেক্রেটারি প্রমিত’দা। ভেবেছিলো যেন-তেন প্রকারে কাটিয়ে দেবে কিন্তু প্রমিত’দার কাছে সেটা সম্ভব নয়। টুঁটি চেপে ধরে ফেস্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত স্ক্রিপ্ট লেখার দায়িত্ব কাঁধে চাপিয়ে তবে ছাড়লো। ‘হে ইশ্বর’ এই দুটো শব্দ ব্যয় করা ছাড়া আর শব্দ ব্যয় করার সামর্থ্য ছিলো না রিচার্ডের। তক্ষুণি লেগে পড়তে হলো কাজে। তিন দিনের মধ্যে খাজনা পেশ না করলে শ্রাবণীর সামনে বাজনা বাজিয়ে ছেড়ে দেবে প্রমিত’দা। ছোটখাটো হুমকিও ঠুসে দিয়েছে কাজের সাথে। মানে মানে নিজের ইজ্জত বাঁচিয়ে নিয়েছিলো রিচার্ড। সেই থেকে কলেজের কোনও অনুষ্ঠানই বাদ পড়তো না। স্ক্রিপ্টের আর্জি নিয়ে হাজির হতো প্রমিত’দার রেফারেন্স! এমন কি কলেজ ছাড়ার পরও। সকলের মনে অজান্তেই প্রিয় জায়গা করে নিয়েছিলো রিচার্ড। শ্রাবণীর বন্ধুরাও যে রিচার্ডের গুণগান করে সে কথাও রিচার্ড শুনেছে শ্রাবণীর মুখে। ভালোলাগে সকলে মনে রাখলে পছন্দ করলে কিন্তু এখানে কেও সেভাবে মনে রাখতে চায়নি রিচার্ড গোমস্‌কে। কে জানে ঔরসের পুরনো সংখ্যাগুলো কেউ এখনও ঘেঁটে দেখে কিনা?

‘কে জানে ‘‘অ্যাসেন্ট অফ স্যাপ’’-এর সাহিত্যমূল্য কতটা? রসের সাহিত্যমূল্য নিয়ে আজকাল আর কথা ওঠে না। সে যেমনি হোক রস হলেই হলো। আস্বাদনের জিভটাকে আপেক্ষিক বলাও যায় না ঠিক। আজকাল জিভ বেঁকালেও কবিতা হয়।’ ভরা সভাঘর গমগম করে উঠছে কাব্যিক ভাষ্যে। লাল মাইকের সামনে কবি ধৃতিমান মুখোপাধ্যায়। ধৃতিমান’দার সাথে কবিতা পাঠের আসরেই আলাপ রিচার্ডের। যেমন অসাধারণ লেখেন তেমনি অসামান্য জ্ঞ্যান। বিভিন্ন কবিসভায় কবিতা নিয়ে তার অনেক মূল্যবান আলোচনা শুনেছে রিচার্ড। মানুষটিকে দেখলে ভক্তি জাগে। গোল্ডেন ফ্রেমের চশমার ওপারে চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে। এনার থেকেই প্রথম ‘শ্রাবণী চিরকল্প’ যথার্থ প্রশংসা পেয়েছিলো। আজ যেন তিনি একটু অন্য মুডে মন হলো। ঔরসের খানিক আলোচনার পরই প্রসঙ্গ, কারো জীবনে কবিতা লেখা শুরুর কথা অলোচনায় টেনে আনলেন। ‘নারী-প্রকৃতি-প্রেম প্রথম কবিতা এর বাইরে কেও কখনো লেখেনি। প্রথম কবিতা এভাবেই ধরা দেয়।তারপর গভীরতা বাড়ে আসে রাজনীতি-সমাজ-বিমূর্ততা-মৃত্যু-যৌনতা। মাঝে থাকে অসংখ্য শাখা প্রশাখা। কবিতার মূল ভালোবাসা। কোনও কিছুর প্রতি ভালোবাসা জন্মালেই কবিতা হয় সেটা সব কিছু হতে পারে। ঘৃণা হত্যাকে ভালোবেসেও কবিতা লেখা যায়। শুধু তাতে থাকবে ছন্দ লয় ভাষার বৈচিত্র্য পাঠককে আকর্ষণের বিজাতীয় ফর্মুলা।’
ফর্মুলা আচ্ছা খাসা আছে রিচার্ডের কবিতায়। ২৭০’র পরের কবিতাগুলোতে শ্রাবণীর ক্ষুধার্ত যৌবন তৃপ্তি পেয়েছে। স্বতঃস্ফূর্ত কলম ছুটে বেড়িয়েছে পাতার পর পাতা ‘শ্রাবণীর বুকে আঁকা ছিন্নভিন্ন মুক্তির যন্ত্রণা’। নিকষ কালো বর্ষাঘন সন্ধ্যেবেলা লাফিয়ে রিচার্ডের বুকে এসে পড়েছিলো শ্রাবণীর ভেজা কাপড়ে জড়ানো শরীর। সমস্ত সঁপে দেওয়ার আবেদন ছিলো সেই কাঁপতে থাকা বুকে। কাপড়ের থেকে মুক্ত অ্যাডাম সেদিন ইভ কে পেয়েছিলো। পৃথিবীর আরেক সুন্দর অনুভূতি যা অন্তর থেকে অন্তরঙ্গে পাড়ি জমিয়ে আরও প্রকট হয়ে উঠলো। বৃষ্টির ফোঁটার স্বচ্ছতায় নতুন করে চিনেছিল পরস্পরকে। দুটো ঠোঁট একে অপরকে আলিঙ্গন করেছিলো হারানো প্রিয়জনকে বহুদিন পর খুঁজে পাওয়ার আনন্দে। বন্ধ চোখের সামনে চলতে থাকা দৃশ্য মুছে দিতে তাড়াতাড়ি চোখ খুললো রিচার্ড। ‘স্বপ্নেও কবিতা পাওয়া যায় বই কি... হোক না বিমূর্ত। শুধু ফর্মুলা থাকলেই কেল্লা ফতে!’ ধৃতিমান’দা আলোচনা শেষ করে টেবিল ছাড়লেন। এবার শুরু হবে কবিতা পাঠ। কবিতা পাঠের জন্য মঞ্চে এলেন সুললিত পাণ্ডা। ‘কবিতার জ্বর ক্যান্সার হতে পারে—’ শেষ লাইন পাঠ করতেই হাত তালিতে ফেটে পড়লো সভাঘর। ‘শ্রাবণী চিরকল্প’ মোড়ক উন্মোচনে এরমই হাত তালি পড়েছিলো, মনে পরে রিচার্ডের। ২০০ টি কবিতার সংকলন প্রচ্ছদে বিমূর্ত নারী মুখ। ফেরার পথে একটা কপি তুলে দিয়েছিল শ্রাবণীর হাতে। সে বছর বইমেলায় ভালোই বিক্রি হয়েছিলো বইটা। সেখানেও কবিতা পাঠের সুযোগ মিলেছিলো। তখন প্রতিদিন শ্রাবণী ওদের গাড়িটা নিয়ে হাজির হয়ে যেত রিচার্ডকে বইমেলায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। প্রায় প্রতিদিনই দু’জনে উপস্থিত থাকতো কখনো আড্ডায় কখনো কবিতা পাঠে আবার কখনো ঔরসের স্টলে। সেই দিনগুলোর ঔজ্জ্বল্য অস্থিরতা দিনের শেষে মুখ ঢাকতো শ্রাবণীর এলো চুলের পর্দায়। শ্রাবণীর নগ্ন শরীরে নিজেকে উজার করে রিচার্ড মাখিয়ে দিত মায়াবী কামনার আতর। শ্রাবণীর গলার ভাঁজে ভাঁজে কেঁপে উঠত ঘামের চকচকে দানা। সারা বিছানা ভরে উঠতো এক ঐশ্বরিক সুগন্ধে। এটা প্রতিবার রিচার্ড অনুভব করলেও শ্রাবণী পারেনি। শ্রাবণীর কাছে জানতে চাইলে একটাই জবাব আসে ‘আই অ্যাম প্রাউড টু বি ইওর গার্লফ্রেন্ড।’ শুধু ‘গর্ব’ আর কিছুই বলে না শ্রাবণী। রিচার্ডের কবিমহলে যে ভালোবাসা সম্মান তার অনেকটাই শ্রাবণীর জন্য কিন্তু যখন তার কাছে এসব কিছুই ছিলো না ভালোবাসা ছাড়া সেই অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েও কি শ্রাবণী নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে? এই প্রশ্নের উত্তর রিচার্ড জানে না। শ্রাবণী কি রিচার্ড গোমসকে নিয়ে স্বপ্নের রাজ্যে বেঁচে আছে না তার রিচিকে নিয়ে ধর্মতলায় সাধারন মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যেতেও চায়? সব প্রশ্নগুলো এই মেট্রোসিটির ভুলে যাওয়া লোডশেডিং-এর মতোই মাঝে মাঝে উপস্থিত হয় রিচার্ডের মনে। আর নিমেষের মধ্যে মিলিয়ে যায় উজ্জ্বল ল্যাম্পশেডের রোশনাইয়ে। এসবের মাঝে চলেছে রিচার্ডের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘শ্রাবণী আমার জেহাদের নিষ্কৃতি’-র জন্য কবিতা লেখা। স্মৃতির পাতা থেকে মুখ সরাতে রিচার্ডের কানে এলো শ্রীমন্তি বসু কবিতাপাঠ করছেন। মনটা ভারী ভারী লাগছে। এতো শব্দ, এতো কবিতা কিন্তু রিচার্ড নিঃস্ব। সভাঘর ছেড়ে সে বেরিয়ে পড়লো রাস্তায়।

অফিস ফেরৎ যাত্রীসমেত বাসগুলো ক্রসিংয়ে সিগনালে আটকা পড়ে ধুঁকছে, জ্যামের বাহুল্য এসময় রাস্তাটাকে মাকড়শার জালের মত ঘিরে ধরে। একটা সবুজ মানুষ চলমান হয়ে ওঠে কালচে বৃত্তের মধ্যে। মন্দারমনির থেকে ফেরার পর যেন জীবনটা অদ্ভুত বদলে যেতে শুরু করেছিলো রিচার্ডের। শ্রাবণীর বাড়িতে মিথ্যে বলে আর পাঁচটা প্রেমের জুটির মতোই সমুদ্রের তটে জুড়ে ফেলেছিলো দু’জনের নাম। কিছু সময়েই ঢেউ এসে মুছে দিয়ে একরাশ ফেনা ফেলে গেছিলো। এসব সত্বেও প্রতীকী বলে কিছু হয় এই ভাবনা আসেনি রিচার্ডের প্রেমসিক্ত মনে। এর ফল কলকাতায় ফিরে ভুগতে হয়েছিলো। বাঙালি পরিবারে মেয়েদের জীবনের প্রতিটা পর্যায় কেটে যায় কোনও না কোনও পুরুষের তত্ত্বাবধানে। বিয়ের আগে বাবা তার পর স্বামী আর শেষে সন্তান। এরম কিছু ঘটতে চলেছে শ্রাবণীর সাথে। বোজা বোজা গলায় অনেক কিছুই বলতে চাইছিলো সে। পাশে হঠাৎ এক গম্ভীর পুরুষ কণ্ঠস্বর গর্জে উঠতেই আচমকা থেমে গেছিলো কথোপকথন। অসহায়ের মতো লেগেছিল রিচার্ডের। কিছু বোঝার আগেই সব কিছু কেমন লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। কবিতার খাতায় এর অদ্ভুত প্রভাব দেখেছিলো রিচার্ড। কবি মহলে ‘জেহাদের নিষ্কৃতি’ ঝিমিয়ে পড়ার খবর পঁচা গন্ধের মত ছড়িয়ে পড়ছিলো।

‘নিসর্গ ব্রেক চ্যাট বাতিঘর ইল্যুশান
প্রেম জোন পার করা রেক্লেস নপশিইয়াল ফাইট
মোমকূপ ভেঞ্চার চুপ চুপ ক্যাপচার্ড স্ক্রিম

শ্রাবণীর ঘরকুনো জাপানি ঘুড়ির ক্যাপশান
কম্বো আই লাইন
স্প্যাসটিক নামতায় দু এক্কে চার

ঘোড়া চাপা জেব্রা বেসিন
রেভলিউশান স্কেলে পারফিউম কালচার
এলোমেল এক্স ফ্যাক্টর পেটে চোরা পজেটিভ ব্লিস
গেঁথে গেছে কট্টর তামাক বলয়ে’

কয়েক মাস বিরতির পর এক দুপুর বেলা দেখা মিলেছিলো শ্রাবণীর। সুযোগ বুঝে পালিয়ে এসেছিলো বাড়ি থেকে। কলিং বেলের শব্দ সেই অনুমান আরও সঠিক বলে প্রমাণ করেছিলো।
‘একি তুমি? কী হয়েছে তোমার শ্রাবণী? কোথায় হারিয়ে গেছিলে তুমি?’
‘রিচি... আমি...’ গলা যন্ত্রণায় কেঁপে উঠলো শ্রাবণীর।
‘ভেতরে এসো’ শান্ত হয়ে জাবাব দিলো রিচার্ড। বাইরের দরজা বন্ধ করে ঘরে এসে বসোল দু’জনে।
এক গ্লাস জল শ্রাবণীর দিকে বাড়িয়ে দিলো সে। এবার অপেক্ষা ঐ চরম সংবাদের যা বেদনার্ত কণ্ঠ বয়ে বেড়াচ্ছে এতোদিন ধরে।
চোখের জল মুছে গ্লাসটা একপাশে নামিয়ে রাখলো। শ্রাবণীর যন্ত্রণা কিছুটা কম করে নিতে রিচার্ড আলতো করে শ্রাবণীর দুটো হাত নিজের হাতে তুলে নিলো।
‘আই উইল কিল হিম!’ লাল চোখ তুলে রিচার্ডের দিকে তাকালো শ্রাবণী।
‘কী বলছো আবোলতাবোল! কাকে মারবে? কী হয়েছে তোমার? প্লিজ বলো।’
‘বাবা চায় আমি রুপানকেই বিয়ে করি। ও হিরণ আঙ্কেলের ছেলে এখন ইউ কে তে থাকে। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করছে ইকোনমিক্সে। গত সপ্তাহে ওরা এসেছিলো আমাদের বাড়ি। বিয়ে করতে চায় আমায়।’
‘তুমি আমাদের সম্পর্কের কথা জানিয়েছো বাড়িতে?’
‘আমি সব বলেছি রিচি কিন্তু আমার কথা শুনতে কেও রাজি নয়। তাই আমি কাল রাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ওকে মেরে ফেলা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।’ দৃঢ় হয়ে উঠলো শ্রাবণীর কণ্ঠ।
‘কাম ডাউন। মাথায় এসব উদ্ভট চিন্তা এনো না। আমরা ভেবে-চিন্তে অনেক কিছু করতে পারি। শুড আই টক টু ইওর ফাদার? বা রুপানের সাথে কথা বলবো কি? আমি একবার চেষ্টা করি যদি বোঝানো যায়।’
‘না এসব করে কিছু হবে না। যদি কোনও লাভ হতো আমি তোমায় বলতাম।’

‘তো প্রমিস মি তুমি খুন করা এবং এসব কথা আর ভাববে না। তোমার সাথে আমার জীবন জড়িয়ে আছে। পুলিশি ঝামেলায় পড়লে আমরা পরস্পরকে হারিয়ে ফেলবো চির দিনের মতো।’ মরিয়া হয়ে উঠলো রিচার্ড। কিছু সময়ের জন্য রিচার্ডের ড্রয়িং রুমের পরিবেশটা কেমন স্তব্ধ হয়ে গেল দেওয়ালে ঝুলে থাকা ক্রুশে বিদ্ধ যীশু খ্রিস্টের মতো। যীশুর মাথার কাটা বেঁধানো বেড়িটার নিদারুণ যন্ত্রণা যেন সশরীরে ভর করেছে শ্রাবণীর জীবনে। এই ক্ষত থেকে ঝরতে থাকা রক্তের সাক্ষী একমাত্র রিচার্ড। কবিতা প্রেম স্বপ্ন এসব দিয়ে সে বহুদিন ধরে নিজে হাতে সৃষ্টি করেছে শ্রাবণীকে। শ্রাবণীকে এই ভয়াবহ মানসিক টানাপোড়েনে বড্ড অন্য রকম লাগছে। মুখ থেকে কে যেন কেড়ে নিয়ে গেছে প্রাণচাঞ্চল্য। রিচার্ডের হাতটাকে চেপে নিয়ে ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে কালো ফ্রেমে বাঁধানো ‘the last supper’ পোস্টারটার দিকে।

‘১৯৪০-এ ইংল্যান্ডে একজন মহিলা তার স্বামীর আফটার শেভ লোশানে নিকোটিন মিশিয়ে খুন করেছিলx আর...’ বাঁ চোখের কোল উপচে রিচার্ডের হাতে উপর টুপটাপ হয়ে ভেঙে পড়লx শ্রাবণীর অন্তরাত্মা। কথা শেষ করার আগেই শ্রাবণীর মুখটা চেপে ধরল রিচার্ড। ‘নাহ... একদম চুপ।’ শ্রাবণীকে বুকে জরিয়ে ধরলx রিচার্ড। দুপুরের মেঘ কালো হতে হতে এখন অঝর ধারায় বৃষ্টি নেমেছে। এরমধ্যে অদ্ভুতভাবে নিবিড় হয়ে মিলিত হচ্ছে লোডশেডিং মোমের আলো শ্রাবণী আর বাইরে বৃষ্টির ছমছম শব্দ। শ্রাবণীর শরীর থেকে চেনা সুগন্ধটা শুষে নিচ্ছে রিচার্ডের চার দেওয়ালের পলেস্তারা। সবাই শ্রাবণীকে হারিয়ে ফেলার ইঙ্গিত করছে। এসব থেকে পালাতে চোখ বন্ধ করলো রিচার্ড। স্পর্শ ঘ্রাণ এই দুই ইন্দ্রিয় ঘিরে রয়েছে শ্রাবণীর অস্তিত্বকে। এছাড়া আর কিছু চাই না রিচার্ডের। ‘যাও চোখে মুখে জল দিয়ে এসো তারপর ভাববো দুজনে বসে। কিছু না কিছু পথ তো বেরুবেই।’ রিচার্ডের বুকের থেকে উঠে এলো দুটো ভারী ভারী প্রতিজ্ঞাবদ্ধ অসহায় চোখ। সেদিন শ্রাবণীকে নিয়ে পালানোর একটা প্ল্যান করেছিল রিচার্ড। মনে হয়েছিলো শ্রাবণী কিছুটা ছন্দে ফিরেছে। বিকেলবেলা শ্রাবণীকে পৌঁছে দিয়ে বাবা মায়ের সমাধিটা ঘুরে বাড়ি ফিরেছিলো সে। সেদিন খুব মিস করছিলো রিচার্ড বাবা মাকে।

তারপর তিনমাস কেটে গেছে। মানসিক অবসাদ তাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খেয়েছে ক্ষুধার্ত জন্তুর মতো। নিজের কাছেই কেমন কাপুরুষ হয়ে উঠেছে সে। আজ রিচার্ড নন্দন থেকে বেরিয়ে পার্ক সার্কাস সিমেন্টরির পথ ধরলো। এখানকার কেয়ারটেকারের সাথে বেশ আলাপ আছে রিচার্ডের, তাই ইচ্ছা মতো বাবা মায়ের কাছে ছুটে আসতে পারে সে। এই একাকীত্বের জীবনে শ্রাবণী ছিলো স্নিগ্ধ সবুজ চাদরের মতো সেই চাদর কোথায় হারিয়ে গেল আচমকা। সেদিন শ্রাবণীকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার পর আর দেখা হয়নি ওর সাথে। অনেকবার ওকে ফোন করেছে বাড়ির সামনে অপেক্ষা করেছে। এতদিনে রিচার্ড এক অদ্ভুত জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। শুধু অজানা রাস্তায় হেঁটে চলেছে শ্রাবণীর খোঁজে। শ্রাবণীর থেকে গলগল করে বেরুতে থাকা সুগন্ধ আজ আর জমাট বেঁধে নেই, পলেস্তারা ভেদ করে ইটের মধ্যে মিলিয়ে গেছে। সমাধির সামনে বসে চোখের জল ফেলে রিচার্ড মুখ তুললো। আজ পূর্ণিমা বোধয়। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে কবর। ছোটবেলায় একবার রিচার্ডের বাবা তাকে পূর্ণিমার রাতে চাঁদ দেখিয়ে বলেছিলেন এই গোলাকৃতির রহস্য। সারা মাস ধরে চাঁদের কম আলোয় বিভ্রান্ত প্রাণ আজকের দিনে স্নিগ্ধ আলোয় নিজের ঘর খুঁজে নেয়। অজানার হদিশ মেলে অদেখার দেখা মেলে। বড় হওয়ার পরও কথাটা রিচার্ডের মনে হয় আর ভাবলেই খুব বোকা বোকা লাগে। সত্যি কি কোন লজিক আছে নাকি সরল শিশু মনে বিশ্বাস জাগানোর প্রচেষ্টা ছিলো ওগুলো।
 
বাড়ি ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ালো রিচার্ড। এখানে কতো শরীর একসাথে ঘুমায় পাশাপাশি অচেনা অজানা। কেমন একটা শিহরণ জাগে। আজ অনেকক্ষণ কেটে গেছে এখানে। একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে। ফিরে যাওয়ার প্রত্যেকটা ফুট স্টেপের আওয়াজ আজ বুকের মধ্যে ধ্বনিত হচ্ছে। বাবা মায়ের কবর ছাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে মেইন গেটের দিকে। এমন সময় রিচার্ডের চোখ পড়লো একটা অচেনা এপিটাফে। বাবা মায়ের আশ-পাশের প্রায় সব এপিটাফ চেনা তার। অদ্ভুতভাবে সম্মোহিত হয়ে রিচার্ড এগিয়ে গেল সেদিকে। এপিটাফের উপর হালকা আলোর প্রতিফলনে পড়তে অসুবিধা হলো না তার।

‘মিক্স মিডিয়ার ক্যানভাসে লেখা শেষ কবিতা
শ্রাবণীর ঘোরে মুগ্ধ পিপাসা কবির দোয়াত
নিকোটিনে পোড়া প্রতিলিপি মুক স্বার্থকোলাজ
নির্লোভ স্মৃতি নয়নাভিরাম ব্যথার আগুন
পরলোক ভাঙা জ্যোৎস্নায় চুপ কাব্যধারা
টিউলিপ প্রেম বাগিচা জড়ায় শান্তি নামুক’

- শান্তি কামনায় শ্রাবণী

কবি রিচার্ড গোমস
জন্ম: ৩০/১/১৯৮৬
মৃত্যু: ৬/৩/২০১২

রিচার্ড এপিটাফ ধরে মাটিতে বসে পড়লো। জ্যোৎস্নার তরঙ্গে প্রকৃতি উত্তাল হয়ে উঠেছে। জ্বলে জ্বলে উঠছে শ্রাবণীর সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত। শেষ দেখা! ক্লিক... ফ্ল্যাশ! শ্রাবণীর হার্টবিট, ওর গায়ের চেনা গন্ধ, লাল হয়ে ওঠা অসহায় চোখ এক অচেনা শ্রাবণী। বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। কলেজ-কবিতা-প্রেম-যৌনতা নিয়ে পর্যায়ক্রমিক অঙ্ক কষেছে সময়। ভাজক গুণ ভাগফল যোগ ভাগশেষ। উত্তরে ভাজ্য-ই পড়ে থাকে। ভাবনা চিন্তার সুনামি আছড়ে পড়ছে পাড়ে। ভাঙছে সব ভাঙছে আর কিছুই বাকি নেই গড়ে ওঠবার মতো। হঠাৎ রিচার্ডের চোখ পড়লো এপিটাফ ধরে থাকা হাতের দিকে। এখনও ব্যান্ডেজটা রয়েছে। সেদিন শ্রাবণীকে পৌঁছে বাড়ি ফেরার পর শেভ করার সময় ব্লেডে লেগে বুড়ো আঙুলটা কেটেছিলো।

লেখক : পশ্চিমবঙ্গীয় কবি ও গল্পকার, omanisha.alo@gmail.com

বাংলাদেশ সময়: ১৬৩০ ঘণ্টা, ০১ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা : তানিম কবির, tanimkabir@gmail.com

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
banglanews24 All Apps
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
IIMEJ
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান