 |
এক অনলাইন স্টাডি গ্রুপে কিছু ছোট ভাইবোনের সাথে মিলে কুরআনের শেষ পারার সূরাগুলো পড়ছি। উদ্দেশ্য, বিভিন্ন তাফসির পড়ে একেক জনের উপলব্ধি আলোচনা করা।
আমার কাছে এই উদ্যোগটা খুবই ভাল লেগেছে, কারণ ভাল কাজে তাগিদ দিলে যে দিচ্ছে তারও সওয়াব হয়, আর যে তাড়া খেয়ে পড়তে বসছে তার তো কথাই নেই।
এক সপ্তাহ সময়, প্রথম তিন দিনে যে ক`টা তাফসির পাওয়া যায় পড়ে নিজের চিন্তাভাবনাগুলি লিখতে হবে, কারো কোন প্রশ্ন থাকলে ইমেইলে জানিয়ে দেবে। সপ্তাহের বাকি দিনগুলি চলবে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, চিন্তাভাবনা, আর সপ্তাহান্তে একত্রিত হয়ে এ নিয়ে আলোচনা। এই প্রয়াসের প্রথম পদক্ষেপ ছিল সূরা নাবা, যা কিনা শেষ পারার প্রথম সূরা। আমি সবসময়ই তাফসির পড়তে গেলে গোগ্রাসে যা পাই সব পড়ি। ইউটিউবে লেকচার পেলে সেগুলোও শুনি। পড়তে পড়তে, শুনতে শুনতে একাগ্রচিত্তে অপেক্ষা করি কখন পুরোটুকু একটা ছবি হয়ে ধরা দেবে।
কুরআনের অল্প যে ক`টা সূরা যত্ন করে পড়েছি, প্রত্যেকটাই তাফসিরের বাইরেও আমাকে অন্য কোনো উপলব্ধি এনে দিয়েছে। যতক্ষণ সেটা না আসে, আমার মনে হয়, আমি ঠিকমত পড়িনি, আরো পড়তে হবে। তাছাড়া, কোনো একটা সূরা নিয়ে পড়াশুনা করাটা আমার কাছে মনে হয় একটা ভ্রমণের মত। শূণ্য থেকে শুরু করে পথের দু`ধারে যা পাই হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে শেষ পর্যন্ত যখন গন্তব্যে পৌঁছাই, তখন মনে হয়, যতদূর এসেছি, আরো ততদূর হেঁটে গেলেও একটুকু ক্লান্তি আসবে না। প্রতিবারই নতুন অনেক কিছু শিখবো। কিছু কাজে লাগাতে পারবো, কিছু আজীবন চেষ্টা করে যাব কাজে লাগানোর।
সূরা নাবা প্রথম দৃষ্টিতে আরো অনেকগুলো সূরার মতই পরকালের বর্ণনা, আল্লাহর মাহাত্ম, ভয় ও আশার সংকলন। খুব তাড়াতাড়ি করে পড়ে গেলে মনে হবে, `এ আর নতুন কী? জানিই তো!` কিন্তু কুরআনের বিশেষত্বই এই, একে নিয়ে যতই সময় কাটানো হয়, ততই এর নতুন নতুন রূপ ধরা পড়ে। একটু ধৈর্য নিয়ে সূরাটা আবারো পড়লে দেখা যাবে এখানে মানুষের দিন রাত্রি যাপনের সুন্দর একটা ছবি ফুটে উঠেছে। পড়লে দৃশ্যগুলো যেন চোখের সামনে ভাসতে থাকে। আল্লাহ কুরআনের অনেকগুলো সূরাতেই গল্পের মতো প্রেক্ষাপট তৈরি করে ভাষার মাধুর্যে এমন মোহনীয় আবেশ তৈরি করেছেন যে পাঠক/শ্রোতারা নিজের অজান্তেই পুরো বিষয়টা কল্পনা করতে শুরু করে। এটা হচ্ছে মনোযোগ আকর্ষণের খুব ভালো একটা পদ্ধতি। একবার শুনতে শুরু করলে বিমোহিত না হয়ে উপায় নেই। তাই তো রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কাফিরদের উদ্দেশে সূরাগুলো পড়তেন, তারা কানে আঙুল দিয়ে রাখত, শুনতে চাইত না। আমি পড়তে পড়তে মনের মধ্যে নোট করে নিয়েছি, পরবর্তীতে আমার লেখায়ও আমি মনোযোগ টানার এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করবো।
কুরআনের বর্ণনাগুলি শুধু মনে ছবিই আঁকে না, মনে ভীষণভাবে নাড়াও দেয়। কারণ এখানে বৈপরীত্যগুলি এতো কঠোরভাবে আসে, মনটা দু`রকমের চিন্তার মাঝে পড়ে ভীষণরকমের দুলতে থাকে। এই যেমন, এই মাত্র আল্লাহ বললেন, ভূমিকে মায়ের কোলের মতো নিশ্চিন্ত করে দিয়েছি, পর্বতকে পেরেক বানিয়ে গেঁথে দিয়েছি, যাতে একটুও ভয় না করে তোমাদের। অথচ শেষ বিচারের বর্ণনায় তিনি বললেন কী - পর্বত নাকি ধুলার মতো হয়ে যাবে, মনেই হবে না এখানে কিছু ছিল, আকাশ ফেটে অনেকগুলো দরজার মত হয়ে যাবে। ওরে বাবা! পড়তে পড়তে আমার মনে হচ্ছিল, এ যেন আমাদেরই জ্ঞানের বড়াই, যা দিয়ে পর্বতের মত অটল হয়ে বসে থাকি - `চাক্ষুষ না দেখলে বিশ্বাস করব না` - সেদিন সব গরিমা ধূলিস্যাৎ হয়ে যাবে। যে জ্ঞানকে আমরা মনে করি আকাশ ছুঁয়েছে, এর উপরে কেউ যেতে পারবে না - সেদিন এ আকাশই দেখিয়ে দেবে, আমাদের জ্ঞানের অগম্যও আরো অনেক অজানা রয়েছে। সূরা নাবায় শেষ বিচারের দিনের এ বর্ণনা যেন আমাদের অহংকার আর ক্ষুদ্রতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
কিয়ামতের বর্ণনার পরে ততোধিক ভয়ঙ্কর জাহান্নামের বর্ণনা শুরু হয়েছে। ঠিক জায়গাটার বর্ণনা না, সে জায়গায় অবিশ্বাসীরা কী ধরনের ব্যবহার পাবে সে বর্ণনা। আমি এগুলো পড়লে এতো ভয় পাই, এ অংশগুলোর তাফসিরও ভাল করে পড়তে পারিনা।
নোংরা মেশানো ফুটন্ত পানি কীভাবে খাওয়া সম্ভব - ভাবতেই গা গুলিয়ে বমি আসে।
তাই তাড়াতাড়ি চলে যাই জান্নাতের বর্ণনায়। সুন্দর বাগান, পানীয়.. আহা! এমন করে বর্ণনা দেওয়া - ভয় আর আশায় দোদুল্যমান চিত্তে ছাপ না পড়ে উপায় কী? সবচেয়ে সুন্দর লেগেছে এ কথাটা - `বেহেশতে কেউ অর্থহীন বাজে কথা শুনবে না, মিথ্যাচার শুনবে না।`
অর্থহীন বাজে কথা শুনবে না? আমি কখনও এভাবে ভাবি নি যে, অর্থহীন বাজে কথা শুনলে মনের ভেতর যে একটা চাপ অনুভূত হয়, সেটা আমাদের আত্মারই সহজাত বৈশিষ্ট্য। যে মানুষটা হাসতে হাসতে অন্যের নামে বাজে কথা বলে, সে শত ভালো কাজ করলেও তার জন্য আর শ্রদ্ধাটা ফিরে আসে না। কেন আসেনা, তা নিয়ে খুব অপরাধবোধে ভুগতাম। এখন আর ভুগিনা, কারণ আল্লাহ নিন্দা ও পরচর্চাকারীকে জাহান্নামের সবচেয়ে ভয়াবহ জায়গায় রাখবেন বলে প্রতিজ্ঞা করে সম্পূর্ণ একটি সূরাই নাযিল করেছেন। ভাবলাম, যদি বেহেশতে যেতে চাই, তাহলে এ ধরনের কথা বলার অভ্যাস তো পুরোপুরি বাদ দিতে হবে। কিন্তু তা কি এতই সহজ? বন্ধুদের সাথে আড্ডায় তো চলে কেবল রসিকতার ছলে বদনাম আর বিরামহীন বাগাড়ম্বর। এর থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকারের ভালো কথা বলার চর্চা করতে চাইলে হঠাৎ করেই কাছের বন্ধুরা দূরে চলে যায়, আত্মীয়স্বজন পাকামো দেখে বিরক্ত হয়, সবকিছুর মাঝে নিজেকে খুব আঁতেল আর রাশভারী মনে হতে থাকে। কিন্তু অন্যভাবে চিন্তা করতে গেলে, বাজে কথা, মিথ্যা কথা - এসব না থাকলে সে পরিবেশটা কিন্তু জান্নাতেরই একটা প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়াবে, আর সে জন্য কি একটু পরিশ্রম করা যায়না?
এমনি করে আয়াতের পর আয়াত, একের পর এক প্রসঙ্গের পরিবর্তন পড়তে পড়তে সূরার শেষ পর্যন্ত এলাম। মনে হল, এখনও যেন গন্তব্যস্থলে পৌঁছাই নি।
আরো কী যেন জানার ছিল! তাই পড়লাম এই সূরা নাযিলের প্রেক্ষাপট। জানলাম, অবিশ্বাসীরা শেষ বিচারের দিন নিয়ে হাসাহাসি করায় আল্লাহ এই উত্তর পাঠিয়েছেন। তখন সূরাটা আবারো পড়লাম। কই! ঠিক উত্তরের মত তো লাগেনা? তার ওপর এক প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে এতো তাড়াতাড়ি মোড় নিয়েছে, মূল ভাবটায় মনোযোগ রাখাই কঠিন।
তখন কুরআন বন্ধ করে চোখ বন্ধ করে একটা ঘটনা চিন্তা করতে শুরু করলাম। আমি একটা স্কুলের প্রধান শিক্ষক, আমার ছাত্রছাত্রীরা ভীষণ বেয়াদবি করছে। তাদের ধারণা, এসব করে তারা দিব্যি পার পেয়ে যাবে, আমি কিছুই করতে পারবনা। আমার নাকি এতো ক্ষমতাই নেই। আমি এসব শুনে প্রচণ্ড রেগে গেছি, ক্লাশ মনিটরকে ডেকে ধমক দিয়ে বলছি, `ওরা এসব কী শুরু করেছে? ওরা জানে, ওরা কার নামে কথা বলছে? যে ক্লাশরুমটাতে বসে এসব বলছে, সে রুমটাও তো আমার তৈরি! ওদের এখনই সাবধান করে দাও, না হয় এমন শাস্তি দেব.. যে আর কোনদিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।` তারপর এই কথাগুলি যেন ভালোমতো মাথায় ঢোকে, সেজন্য পরিণতিরও একটা ছোটখাট ফিরিস্তি দিলাম, যাতে ক্লাশ মনিটর গিয়ে ওদের শোনায়। আমি এতোই রেগে আছি যে ওদের ডেকে সরাসরি কথা বলারও রূচি হচ্ছেনা। পুরো ঘটনাটা এভাবে যখন দেখলাম, তখন আল্লাহ কেন তিন চার আয়াতের পরেই প্রসঙ্গ পাল্টে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছেন, সেটা বুঝতে বেশ সুবিধা হল।
কিন্তু সূরা নাবায় আরো একটা অংশ আছে, তা হচ্ছে, মুত্তাক্বীন বা আল্লাহভীরুদের পুরস্কার। আমি নিজেকে প্রধান শিক্ষকের জায়গায় বসিয়ে যখন ছাত্রদের ধমক দিচ্ছিলাম (মনে মনে), তখন আমার অবস্থান বোঝাতে চাইলে আমি কেবল উপরের কথাগুলোই বলতাম। পুরস্কারের কথা বলতাম না, কারণ তাতে সুরটা নরম হয়ে আসে, ছাত্ররা আমার কথায় ভয় নাও পেতে পারে। আমি যখন খুব রেগে আছি, তখন কথার সুর বদলে, নরম হয়ে ভালো ভালো কথা বলাটা আমার আসে না, এটাই স্বাভাবিক।
তখন বুঝলাম, আল্লাহ যতই রাগ হন, তাঁর একটা অংশ ক্ষমা ও দয়া দেখিয়েই যাবে। আমরা সংকীর্ণমনা হতে পারি, আমাদের উদারতা আমাদের রাগের কাছে পরাজিত হতে পারে, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অতুলনীয় এবং আশ্চর্য রকমের ভারসাম্যপূর্ণ। এই সূরায় আল্লাহ যাদের উদ্দেশ্য করে কথা বলছেন, তাদের অপরাধ কিন্তু কম না। তবুও, তিনি শাস্তির বর্ণনা করেই শেষ করেননি, আশার বাণীও শুনিয়েছেন। জান্নাতের অপূর্ব সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন, তার চেয়েও বড় কথা, তিনি নিজেকে তাদের প্রতিপালক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
চল্লিশ আয়াতের এই বিরাট সূরায় শেষের চার আয়াতে পাঁচবার `রব` (প্রতিপালক) আর `আর-রহমান` (সবচেয়ে বেশি দয়ালু) উল্লেখের মাধ্যমে আল্লাহ যেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন, "আমার কঠোরতা দেখে দূরে সরে যেওনা, আমি তোমাদের শাসন করলেও, প্রতিপালন আর দয়া থেকে কখনও সরে যাবনা।"
আমি প্রধান শিক্ষক হয়ত হব না, কিন্তু মা তো হব! আমার সন্তানদের ওপর অসম্ভব রাগও হবে কখনও কখনও। তখন শাস্তি দিলেও, করুণা বা মায়ার এই অংশটুকু দেখাতে যেন না ভুলি। তা না হলে আমার মনের কঠোরতা ওদের দূরে ঠেলে দেবে।
সূরাটি পড়ে আমি উপলব্ধি করলাম, সূরা নাবা আমাকে মায়ের শাসন ও ভালবাসার প্রকৃত ভারসাম্য শিখিয়েছে, আর মায়ের চেয়েও অনেক গুণ ভালবাসা যাঁর মাঝে, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরিয়ে দিয়েছে। সূরা নাবা এখন শুধুই আমার কাছে একটি সূরা না, আল্লাহর ভালবাসার অগুণিত নিদর্শনভাণ্ডারে আরো একটি সংযোজন।
লেখক- যুক্তরাষ্ট্রে জীববিজ্ঞান বিষয়ে পিএইচডি করছেন।
মেইল: nusrat807@yahoo.com
সম্পাদনা: শিমুল সুলতানা
মেইল: bn24.islam@gmail.com