 |
কবি আবুল হোসেনের জন্ম ১৫ আগষ্ট , ১৯২২ সালে খুলনা জেলায়। পড়ালেখা করেন কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট ও কুষ্টিয়া হাইস্কুলে, কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সম্পাদক ছিলেন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে রবীন্দ্র পরিষদেও, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির কার্যকরী পরিষদ, পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ডের কার্যনির্বাহী পরিষদ ও বাংলা একাডেমীর কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন, বাংলা একাডেমীর ফেলো ছিলেন। কবিকৃতির জন্য পেয়েছেন ১৮৯০ সালে একুশে পদক, ১৯৭৯ সালে নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক, ১৯৬২ সালে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার সহ আরোও অন্যান্য পুরস্কারে ভূষিত হন। নিরন্তন কবিতা ছাড়াও তিনি অনুবাদ করেছেন অনেক গদ্য ও পদ্য। লিখেছেন শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক নানা সমালোচনা। আরো লিখেছেন স্মৃতিকথা, ছোটগল্প ও ভ্রমণ বৃত্তান্ত। আবুল হোসেন আধুনিক কবিতার পুরোধা পুরুষ, পথিকৃৎ। তিনি প্রথম আধুনিক মানসিকতার, চেতনা-অবচেতনার কবি। ছন্দবদ্ধ সমিল গদ্য কবিতারও পথিকৃৎ তিনি। লেখক জীবনের শুরুতেই সঙ্গ পেয়েছিলেন আবু সয়ীদ আইয়ুব, হুমায়ুন কবীর, সৈয়দ মুজতবা আলী, বুদ্ধদেব বসু, সঞ্জয় ভট্রাচার্যের। পরিচয় ঘটেছিল রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম ও জীনানন্দের সাথে।
কবিতা নিয়ে কথা বলতে গেলে কী নিয়ে কথা বলা ঠিক? কবিতায় কবির যে-চিন্তা ও ভাবনা দেখা যায়, তা নিয়ে? কবিতা যে আবেগ থেকে উঠে আসে ও যে- আবেগের জন্ম দেয়, তা নিয়ে? কবিতায় ছন্দ ও মিলের কারুকাজ থাকে, তা নিয়ে? কবিতার শব্দ নিয়ে? কবিতা যেভাবে ভাষার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়, তা নিয়ে? নাকি, অন্য কিছু নিয়ে? প্রথমেই কবিতার সংজ্ঞায়ন সম্পর্কে প্রশ্ন করি। কবিতা সম্পর্কে কবি আবুল হোসেন বলেন- ‘মানুষ যখন এমন কিছু লিখতে চায়, যা সৃষ্টিশীল এবং যা তাকে লিখতেই হয়, যা লিখিত না হওয়া পর্যন্ত মানুষ নিজের কাছ থেকে মুক্তি পায় না, কিন্তু যা গিয়ে ভাষার চেনাজানা নানা ধরনের ব্যবহারের মধ্যে এমন একটি ব্যবহারও খুঁজে পায় না, যা দিয়ে ওই লেখা সে লিখতে পারে, তখন সে যা লেখে এবং যেভাবে তা লেখে, তারই নাম কবিতা।’
আবুল হোসেন বলেন- ‘না আমি কবিতার কোন নতুন সংজ্ঞা তৈরি করছি না। তবে বলতে চাই, যে- লেখে কবিতা তাকে অবশ্যই সৃষ্টিশীল হতে হবে। সৃষ্টিশীল হওয়া মানে নতুন হওয়া।’
আধুনিক বাংলা কবিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে কবি আবুল হোসেন এর বক্তব্য হলো- ‘আমাদের সমাজে ওই সময়ে যারা লিখতেন তারা তখন আধুনিক কবিতা লিখতেন না। আমাদের সমাজে আমিই প্রথম বাংলা সাহিত্যে আধুনিক বাংলা কবিতা লিখি।তারও আগে বুদ্ধদেব বসু বাংলা সাহিত্যে আধুনিক কবিতা লিখেন। এবং তিনি সকলকে অনুপ্রেরণা দেন লেখার জন্য।’
তিনি আরো বলেন- ‘আমার প্রথম বই “নববসন্তে” ১৯৪০ সালে ওই আধুনিক কবিতা সংকলিত হয়। আমরা ওই সময়ে সাধারণত রবীন্দ্রনাথের ধারা থেকে বের হয়ে নতুন ধারা সৃষ্টি করি। ১৯৪০ সালে আমরা যে কবিতা লিখেছিলাম এর পর আমি আর তেমন কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করি নি। চল্লিশের দশকের সেই কবিতা সে সময়ে আমাদের সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করে। আমরা আধুনিক কবিতা বলতে যা বুঝি সে কবিতা ভাষা-ভাবে এই সত্তর বছর পরেও তেমন কোন পরিবর্তন হয়েছে বলে আমি মনে করি না। বাংলা সাহিত্যে তো এরপরে শুধু গুণগত নয়, ভাষা বা আঙ্গিকের দিক থেকেও কোন পরিবর্তন হয় নি বলে আমি মনে করি। আমাদের দেশে সাম্প্রতিক কালে যারা লিখছে তারা বেশিরভাগই গদ্য কবিতা লিখছে। রবীন্দ্রনাথের পরই আধুনিক কবিতা অন্য পথে গিয়েছে।’
সাহিত্যে গুণের বিচারে তিনি নববসন্তের কথা বলেন। তিনি ‘নববসন্ত’ প্রসঙ্গে বলেন- ‘ওই বইটাই আমার ব্যক্তিগত ভাবে বেশি পছন্দ।’ বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ-কে। তিনি আরো বলেন- ‘সত্যি বলতে কি রবীন্দ্রনাথ, মধুসূধন ও ত্রিশের কবিতার পরে বাংলা সাহিত্যে তেমন কোন পরিবর্তন হয় নি। আহসান হাবিব, ফররুখ আহমদ এবং আমি একসঙ্গে লিখতাম। আমাদের পরে অনেকেই লিখেছে তবে আমার কখনো মনে হয় নি আমি কারো চেয়ে পিছিয়ে আছি।
ইংরেজি ভাষায় তাঁর প্রিয় কবি ডব্লিউ বি ইয়েট্স । আর বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি তাঁর জীবন-যাপন সম্পর্কে বলেন- ‘আমি যখন স্মৃতিকথা লিখলাম সে সময়টা আমার জীবনের সেরা সময়।
আবুল হোসেন আত্মতৃপ্ত তিনি মনে করেন, তিনি যা পেয়েছেন দেশ থেকে দেশের মানুষের কাছ থেকে তা ভুলবার নয়। তিনি একই সাথে অতৃপ্ত এই ভেবে যে- ‘যদি আরো ভাল লিখতে পারতাম...’
বাংলাদেশ সময় : ১৬০৮ ঘণ্টা, ০৬ জানুয়ারি ২০১৩
এমজেএফ/ pageeditor@banglanews24.com