 |
| ছবি: দেলোয়ার হোসেন বাদল / বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
রামু (কক্সবাজার) থেকে: জামায়াতকে নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
শনিবার বিকেলে রামুর খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত সম্প্রীতি সমাবেশে দেওয়া প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ অভিযোগ করেন।
খালেদা জিয়া বলেন, “এই জামায়াত ছিলো তাদের (আওয়ামী লীগ) দোসর। তারা ১৯৯৫-’৯৬ সালে জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। ’৮৬ সালে জামায়াতকে নিয়ে এরশাদ নির্বাচন করেছেন। নিজামীকে পাশে বসিয়ে হাসিনা আমাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন কর্মসূচি ঠিক করেছেন।”
“তখন কোথায় ছিলো যুদ্ধাপরাধী” প্রশ্ন তুলে খালেদা জিয়া বলেন, “আমরাও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই। তবে সেটা হতে হবে নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের।”
“এখনো জামায়াতের সঙ্গে তলে তলে তাদের (আওয়ামী লীগ) সম্পর্ক আছে কি না তা কে জানে” বলে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, “তারা চেষ্টা করছে কিভাবে জামায়াতকে পক্ষে নেওয়া যায়। জামায়াত এখন সন্ত্রস্ত। কিভাবে আপোষ করে তাদের নিয়ে নির্বাচন করা যায় সে চেষ্টা করছে। এজন্য তাদের (জামায়াত) ওপর নির্যাতন বাড়িয়ে দিয়েছে।
রামুর বৌদ্ধ বসতি ও বিহারে হামলার ঘটনায় প্রশাসন, গোয়েন্দা ও সরকারকে দায়ী করেন খালেদা জিয়া।
“জনগণের টাকা লুটপাট করে তারা এখন (আওয়ামী লীগ) মোটাতাজা হচ্ছে” মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, “আপনাদের নাওয়ের তলা ফুটা হয়ে গেছে। পালাতে পারবেন না।”
এ সময় সরকারকে রামুতে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করার আহবান জানিয়ে ওই ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানান বিরোধী দলীয় নেতা।
তিনি বলেন, “রামুর ঘটনায় জড়িতদের বিচার না করলে আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাদের বিচার করা হবে।”
তিনি বলেন, “দেশে তৈরি সম্ভব না হলে প্রয়োজনে বিদেশ থেকে মূর্তি এনে ক্ষতিগ্রস্ত বিহারে স্থাপন করা হবে।”
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করারও আহবান জানান তিনি।
খালেদা জিয়া বলেন, “এক দিকে নাফ নদী, আরেক দিকে সাগর, পালাবে কোথায়। আওয়ামী লীগ পালাতে পারবে না।”
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে ঈঙ্গিত করে তিনি বলেন, “তাদের খায়েশ হয়েছে যতদিন বাঁচবে ক্ষমতায় থাকবে। এজন্য সংবিধান সংশোধন করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করে নিয়েছে। এখন আমাদের সামনে পথ দু’টি-নিজেরাই তারা নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার পুনর্বহাল করবে অথবা আন্দোলনের মাধ্যমে এ সরকারের পতন ঘটানো হবে।”
তিনি বলেন, “আমরা সম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাস করি। বৌদ্ধরা নিরীহ। তারা শান্তিময় জীবন-যাপন করতে পছন্দ করেন। ২৯ সেপ্টম্বর ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলাম। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা উচ্চ পর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি করার দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার করেনি, কারণ এতে আওয়ামী লীগ জড়িত। ওই তদন্ত কমিটি করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতো।”
খালেদা জিয়া বলেন, “এখান থেকে থানা মাত্র দু’শ গজ দূরে। অথচ ঘটনার সময় পুলিশ আসেনি। কারণ, সরকার নির্দেশ দেয়নি। এই একই ঘটনা তারা বিডিআর এ ঘটিয়েছিল। এখন সরকারের লোকের এসে মায়াকান্না করছে। গত দুই মাসে তারা কিছু করেনি। আমরা আসবো শুনে তাড়াহুড়া করে কিছু ঘরবাড়ি বানাচ্ছে।”
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, “তারা (আওয়ামী লীগ) চায়নি আমরা এখানে আসি। এ কারণে আমি ফেনী থেকে আসার পর সেখানকার গডফাদার ককটেল মেরে ভয় দেখিয়েছে। যাতে আমরা ভয় পেয়ে রামুতে না আসি।”
তিনি বলেন, “এই আওয়ামী লীগ যতবার ক্ষমতায় এসেছে, ততবার সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতন করেছে। আমি তরুণদের বলবো, তোমরা পুরানো বইপত্র ঘেঁটে দেখ, তাহলে দেখতে পাবে ১৯৭২ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত তারা কি করেছিল। তোমাদের সামনে আওয়ামী লীগের মুখোশ খুলে যাবে।”
খালেদা জিয়া বলেন, “আওয়ামী লীগ এবার ক্ষমতায় এসেছে লুটপাট, নির্যাতন আর খুন-গুম করতে। আওয়ামী লীগ নাকি ধর্ম নিরপেক্ষ! মূলত এটা তাদের মুখোশ, বাহ্যিক আবরণ। বিএনপি ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা বলে। আওয়ামী লীগকে যদি দেখেন বুঝতে পারবেন প্রতিদিন গুম আর খুন তাদের কাজ। জিনিসপত্রের দাম বেশি, তাদের কাছে মানুষের রক্তের দাম নেই। ৪ টাকার লবণের দাম এখন ৩২ টাকা।”
খালেদা জিয়া বলেন, “ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের দয়ায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। তাদের কিসের ভয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিতে। ফুটবল খেলায় দু’টি দল থাকে। আমাদের দেশে অনেক দল আছে। প্রধান দল হলো দু’টি। খেলতে গেলে মাঠ সমান থাকতে হবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হতে হবে। নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙ্গে দিতে হবে। পদত্যাগ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে।”
পুলিশ প্রশাসনের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগই চিরস্থায়ী সরকার নয়। তাদের কথা শুনবেন না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অন্যায় আদেশ মানবেন না। এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ১৭ বছর জেল হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর নামে যতগুলো মামলা রয়েছে তার নিরপেক্ষ বিচার হলে শাস্তি হতে পারে। অথচ তার নামের মামলা তুলে নেওয়া হয়েছে। আর আমাদের নামে হয়রানির মামলা দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। সেইসব ভিডিও ফুটেজ আমাদের কাছে আছে। এর বিচার হলে প্রধানমন্ত্রী কি করবেন।”
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বৌদ্ধদের উদ্দেশ্যে বলেন, “যারা আপনাদের ক্ষতি করেছে তাদের বিচার হবে। আমরা সরকারে এলে বৌদ্ধদের ঘরগুলো সুন্দর করে গড়ে দেব। বিদেশ থেকে মূর্তি এনে সাজাতে পারবেন।”
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় বিএনপি সভাপতি আহমেদুল হক চৌধুরী। আরো বক্তব্য রাখেন- মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, এম মোরশেদ খান, ড. সুকোমল বড়ুয়া, স্থানীয় বিএনপি দলীয় এমপি লুৎফর রহমান কাজল, জামায়াতের এমপি আ. ন. ম শামসুল ইসলাম, বৌদ্ধভিক্ষু শুদ্ধানন্দ মহাথেরো প্রমুখ।
মির্জা ফখরুল বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনার রসনা সংযত করুন। নইলে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে।”
মওদুদ বলেন, “এখানে তদন্ত করতে এসে জেনেছি আওয়ামী লীগ প্রভাবিত এলাকায় বৌদ্ধবিহার ও মন্দির, বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু বিএনপি প্রভাবিত এলাকায় কোনো বৌদ্ধ বিহার ধ্বংস হয়নি।”
সুকোমল বড়ুয়া বলেন, “ম্যাডাম বৌদ্ধ সম্প্রদায় আপনার সঙ্গে আছে। প্রধানমন্ত্রী এখানে এসেছিলেন। তার সমাবেশে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ আসেনি।”
বাংলাদেশ সময়: ১৭৪৫ ঘণ্টা, নভেম্বর ১০, ২০১২
জেডএম/