ঢাকা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে ‘রাজাকার’ বলায় মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন মজুমদারের দায়ের করা মানহানি মামলায় কাদের সিদ্দিকীকে (বীর উত্তম) জামিন দিয়েছেন আদালত।
সোমবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজিরা তিনি হাজিরা দেন। তবে এ সময় তিনি কোনো আইনজীবী নিয়োগ দেননি কিংবা কোনো জামিন চাননি।
এদিকে, কোনো আইনজীবী নিয়োগ না করায় ও জামিন না চাওয়ায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুর রহমান সম্মান দেখিয়ে তাকে জামিন দেন।
এর আগে সকাল সোয়া ১০টায় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আদালতে আসেন কাদের সিদ্দিকী।
মামলার শুরু থেকে তিনি নিজেই নিজের মামলার শুনানি করেন।
শুনানিতে কাদের সিদ্দিকী বলেন, “মাননীয় আদালত! আমি আপনার সমন পেয়ে আপনাকে এবং আপনার আদালতকে দেশের একজন সুনাগরিক হিসেবে সম্মান জানাতে হাজির হয়েছি। আপনি সমনে বলেছিলেন- ‘আপনি স্বয়ং কিংবা উকিলের মাধ্যমে আদালতে হাজির হইবেন। ইহার যেন অন্যথা না হয়।‘ মাননীয় আদালত! আপনি দেখতে পাচ্ছেন, আমি এর অন্যথা করিনি।”
তিনি বলেন, “বাদী রুহুল আমিন মজুমদার একজর বীর মুক্তিযোদ্ধা। তার বয়স ৫৭ বছর। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৩ বছর। ৫৭ থেকে ৪৩ বাদ দিলে বাকী থাকে ১৩ বছর। তিনি তখন একজন শিশু মুক্তিযোদ্ধা। বাদী বলেছেন- তিনি একজন শিক্ষিত, সমাজসেবী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান। পক্ষান্তরে বিবাদী একজন জ্ঞানপাপী ও লোভী। হীন মানসিকতায় তিনি ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে সামাজিক ও আর্থিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বক্তব্য রাখেন যা ১০/২/২০১৩ তারিখে যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।”
কাদের সিদ্দিকী বলেন, “মাননীয় আদালত! বাদী একজন খুবই শিক্ষিত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তাতেও কোনো সন্দেহ নাই। আমি ‘অশিক্ষিত’ এতেও কোনো সন্দেহ নেই। তিনি একজন সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান হতেও পারেন। আমি আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ‘অসম্ভ্রান্ত’ এতেও কোনো সন্দেহ নেই। যদিও আমার পরিবারের একজন এখনও মন্ত্রীসভার সদস্য।”
তিনি বলেন, “১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ হয়, তখন আমার প্রেসিডেন্ট ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর বাদী যার পক্ষ হয়ে মামলা করেছেন, তার প্রেসিডেন্ট ছিলেন ইয়াহিয়া খান। আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম আর তিনি ...”
এ সময় তাকে বাধা দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, “এগুলো মামলা সংক্রান্ত কথা নয়, মামলার বিষয়ে কথা বলুন।”
কাদের সিদ্দিকী বলতে থাকেন, “বাদী যে ধারায় এ মামলা দায়ের করেছেন, তা সঠিক হয়নি।”
তিনি বলেন, “বাদী মুক্তিযোদ্ধা নন। ‘১৩ বছরের ব্যক্তি’ মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেনা। মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট কোনো মন্ত্রী দিতে পারেন না। তার (বাদী) গায়ে কোনো আঁচড় লাগেনি। তিনি একজন ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’।”
তিনি আরও বলেন, “মহীউদ্দীন খান আলমগীর দেশের সেরা অর্থনীতিবিদ হতে পারেন, কিন্তু তিনি ‘মুক্তিযোদ্ধা’ নন। তিনি ৭১ সালে পাকিস্তান সরকারের অধীনে চাকরি করেছিলেন।”
কাদের সিদ্দিকী বলেন, “এ মামলায় আমি জামিন প্রার্থনা করবোনা। মামলাটি খারিজ করে দেবেন; নতুবা আসামি হিসেবে আমাকে জেলে পাঠাবেন। মহীউদ্দীন খান আলমগীর এ মামলা করলে অন্য কথা ছিল। এই মামলা চলতে পারেনা।”
এ সময় ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, “এ পর্যায়ে মামলাটি খারিজ হতে পারেনা। এটি বিচারিক আদালতের কাজ।”
আদালত কাদের সিদ্দিকীকে নিজ জিম্মায় জামিন দিতে চাইলে কাদের সিদ্দিকী বলেন, “আমি জামিন চাইনা। আমি যদি এই সিদ্ধান্ত নিই যে, আপনার কোর্ট থেকে আমি বের হবোনা, তাহলে আমাকে হত্যা করে বের করতে হবে।”
এর পর ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি বিচারিক আদালতে বদলি করে কাদের সিদ্দিকীকে নিজ জিম্মায় জামিনে যাওয়ার আদেশ প্রদান করেন।
উল্লেখ্য, ১৯ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডির ৭/৮-এ ফ্রিস্কুল স্ট্রিট হাতিরপুলের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণমূলক সংগঠন ন্যাশনাল এফ.এফ. ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন মজুমদার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের পক্ষে ঢাকার সিএমএম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন।
ওই দিন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুর রহমান বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে ১৮ এপ্রিল কাদের সিদ্দিকীকে সশরীরে আদালতে তলব করেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ৯ ফেব্রুয়ারি কাদের সিদ্দিকী ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সম্মেলনে বলেন, ‘রাজাকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্ভব নয়’, যা পরদিন বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়।
মামলায় উল্লেখ করা হয়, মহীউদ্দীন খান আলমগীর শুধু সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন, তিনি অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জনপ্রিয় লেখক।
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়, স্বাধীনতা যুদ্ধে তার পরিবারের সদস্যরা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি পদক্ষেপে তাদের অংশীদারিত্ব জাতির কাছে প্রমাণিত।
ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর কিংবা তার পরিবারের কেউই ‘রাজাকার’ নন মর্মে মামলায় দাবি করা হয়।
এদিকে, মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে ‘রাজাকার’ বলায় তার আনুমানিক ২ কোটি টাকার মানহানি হয়েছে উল্লেখ করা এ মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ সময়: ১৫০৪ ঘণ্টা, মার্চ ১৮, ২০১৩
এমআই/সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, আশিস বিশ্বাস, অ্যাসিস্ট্যান্ট আউটপুট এডিটর