 |
প্যারালাইজড এই বাংলাদেশি গত ৩ মাস পড়ে আছেন ইউএই’র ইরানি হাসপাতালে। তাকে দেশে পাঠাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাহায্যের অনুরোধ জানিয়েছে সবাইকে |
সড়ক দুর্ঘটনায় হাতের বারোটা বেজে যাওয়ায় বহুদিন লেখালেখি হয় না বাংলানিউজ ২৪.কমে, প্রতিদিন সংবাদ দেখি ইচ্ছা করে কিছু লেখার কিন্তু হাত সায় দেয় না। বলে আরো কিছুদিন ধৈর্য ধরতে। এখনো হাতের আঙ্গুলগুলো সাহস পায় না কোনো কিছু লেখার, শুধুমাত্র মনোবলের জোরে আজ লিখতে বসলাম। কারণ, সাম্প্রতিক গুরুতর এই বিষয়টি নিয়ে লেখা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।
অন্য কেউ যেহেতু লিখছেন না, আমাদের দূতাবাস যেহেতু চোখে ঠুলি পড়ে কানে তুলা আর পিঠে কুলা বেঁধে বসে আছে তাই লিখতে হচ্ছে আমাকেই।
বহুদিন ধরেই এইচআর (মানব সম্পদ উন্নয়ন)-এ কাজ করছি, এই সময়কালে দেখেছি বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের নানা রকম খেলা। তা যাই হউক, সে খেলার কথা আজ না হয় নাই লিখলাম, আজ শুধু লিখছি আরব আমীরাতে বাংলাদেশি শ্রমিক ভিসা বন্ধ হওয়ার পেছনের কারণ নিয়ে।
এর প্রধান কারণগুলোর অন্যতম হলো-- গত ২/৩ মাসে বাংলাদেশের কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী ইউএই সরকারের অনলাইন ভিসা সিস্টেম হ্যাকিং করে নামে-বেনামে প্রায় হাজার দশেক ভিসা প্রিন্ট করিয়ে নিয়েছে বিভিন্ন কোম্পানির নামে। আর সে সমস্ত ভিসায় দেশে থেকে আসাও শুরু করেছিল শ্রমিক।
কিন্তু ‘চোরের দশদিন আর গেরস্থের একদিন’ কথার বাস্তবতা প্রমাণে একদিন ধরা পড়ে গেল বিষয়টা। সেদিন এক ফ্লাইটে ৩০ জন শ্রমিক আরব আমীরাতে প্রবেশ করলো এক কোম্পানির হয়ে। কিন্তু যে কোম্পানির নামে তাদের ভিসা তাদের কোনও প্রতিনিধি এয়ারপোর্টে উপস্থিত হলো না।
পরিস্থিতি বুঝতে পেরে হতাশ আর অসহায় শ্রমিকরা শুরু করলো কান্নাকাটি। তাদের বিলাপে ইমিগ্রেশন পুলিশ সংশ্লিষ্ট কোম্পানি প্রতিনিধিদের খবর দেয়। কিন্তু ওই কোম্পানি সাফ জানিয়ে দেয়-- এ সমস্ত ভিসা তারা ইস্যু করেনি। তাহলে ভিসা ইস্যু করল কি ‘ভূতে’ !!!
হ্যাঁ, এ সমস্ত ভূত হলো আমাদের দেশের কতিপয় সোনার ছেলে যাদেরকে ধরার জন্যে এখন মাঠে রয়েছে কয়েকটি শক্তিশালী গোয়েন্দা দল। কিন্তু আসল সমস্যা আরো একটি রয়েছে, আর তা হলো এখানকার মিডিয়া। এখানকার মিডিয়াগুলো মূলত ভারতীয় এবং পাকিদের (পাকিস্তানি) দখলে। পাকিদের জ্বালায় যেমন আমরা অস্থির দেশেও ঠিক তেমনি এখানেও। এখানকার পত্রিকাগুলোয় পাকিস্তান ক্লাব বা ইন্ডয়া ক্লাব নামে আলাদা বিভাগও আছে যেখানে তারে নিজেদের নানান কর্মকাণ্ডের খবর প্রকাশ করে দেশের প্রশাসনে ও বাইরে আলাদা একটা ইমেজ ধরে রাখে।
এরপর রয়েছে ভারতের কেরালা রাজ্যের মালয়ালাম ভাষায় প্রচারিত বেশ কয়েকটি দৈনিক যারা প্রতিনিয়ত আমাদের দেশের শ্রমিকদের নিয়ে নানারকম বাজে সংবাদ পরিবেশন করে। যেমন দেখা গেল, এক বাংলাদেশি শ্রমিক রাস্তায় থুথু ফেলছে— এ ধরনের বিষয়কেও অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে সচিত্র সংবাদ প্রকাশ করা হয় ওই মালইয়ালাম পত্রিকায়।
ঘটনা যে আমরা কিছু ঘটাই না তেমনটাও নয়, আমরা হচ্ছি আলু শ্রেণির সব্জি অর্তাৎ কোনো তরকারীর সঙ্গে ব্যবহৃত হতে ভালোবাসি। যেমন ধরুন পতিতাবৃত্তির যে ব্যবসা এখানে পরিচালিত হচ্ছে তার প্রধান হর্তাকর্তা হচ্ছে কোনও ভারতীয় কিংবা পাকিস্তানি। কিন্তু একেবারে নিচে যাদের অবস্থান অর্থাৎ দালাল এরা সবাই আমরা অর্থাৎ পুলিশ যখন ধরপাকর শুরু করে তখন শুধু দালালদেরই ধরে। এর ফলে নাম হয় বা বদনাম হয়— “ইস্ ছি ছি, বাংলাদেশিরা এসব কাজে জড়িত!”
আরো একটি প্রধানতম সমস্যা যেটি পাঠকদের উদ্দেশ্যে না লিখলেই নয় তা হলো, এখানে চট্টগ্রামের বহু সংখ্যক অধিবাসী রয়েছেন যারা নিজেরাই কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে ভিসা বাণিজ্য চালায়। মজার বিষয় হলো এরা যখন দেশ থেকে কাউকে রিক্রুট করে তখন তাদের বেতন বলা হয় বাংলা টাকার হিসেবে। আরো একটি আশচর্য বিষয় হলো চুক্তিটা হয় এমন যে ‘কাজ নাই বেতন নাই’। আর যে সমস্ত লোক এ নিয়মে আসে অধিকাংশ সময়ই তাদের হাতে কাজ থাকে না। সুতরাং তারা করবেটা কি? পেট চালানো আর দেশে পরিবার তোষণের জন্য তারা বেছে নেয় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যেমন পান বিক্রি করা (এখানে অবৈধ), রাস্তায় দাঁড়িয়ে মোবাইলের ব্যালেন্স বিক্রি করা, পতিতাবৃত্তির দালালি করা, পর্নো সিডি বিক্রয় করা।
ইদানিং অবশ্য কেউ কেউ পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে পকেট মারা। আমরা যেহেতু একেবারে শেষ পর্যায়ের অপরাধগুলো করি তাই পুলিশের চোখে আমরা অপরাধী ও সংখ্যায় একটু বেশি। কিন্তু আমাদের যারা পরিচালনা করেন সেই পাকি বা ইন্ডিয়ানরা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
আর এখানকার মিডিয়াগুলো কোনো অপরাধের কারণে বাংলাদেশি কেউ ধরা পড়ালে যে নিউজ করে তার হেডলাইন করে এভাবে, “বাংলাদেশি পতিতা ব্যবসায়ী গ্রেফতার।” আর যদি একই অপরাধে ভারত কিংবা পাকিস্তানের কেউ গ্রেফতার হয় তখন বিষয়টাকে মিনিমাইজ করে বা খুব ছোট করে নিউজ লেখা হয় যার শিরোনাম বদলে হয় এরকম, “এশিয়ান পতিতা ব্যবসায়ী গ্রেফতার”।
আমাদের দূতাবাসের একটা লেবার উইং রয়েছে যারা কিনা বাংলাদেশের সকল সরকারি ছুটিছাটার সঙ্গে এখানকার সরকারি ছুটিছাটাও উপভোগ করে। রবি থেকে বৃহষ্পতি ৯-৫টা পর্যন্ত শুধু অফিসে আসা যাওয়াই যাদের কাজ। ইনারা এসব কিছু দেখেনা না। কেনেএসব দেখেন না বা তারা এখানে থেকে কেন বেতন পান-- সেই প্রশ্ন তারা তাদের বিবেককে কখনো করেছেন কি না কে জানে? আর তাদেরকে যারা এখানে পাঠান, সেই ঊর্দ্ধতনরা বিষয়গুলো খোঁজ রাখেন কি না বা রাখলেও এ প্রসঙ্গে উপরের একই প্রশ্ন তারাও নিজেদেরকে করেন কি না সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে মাঝে মধ্যে খুব ইচ্ছে হয়।
shahriar.axar@gmail.com
বাংলাদেশ সময়: ১৮৫৪ ঘণ্টা, ৩০ আগস্ট, ২০১২
সম্পাদনা: আহ্সান কবীর, আউটপুট এডিটর ahsan.akraza@gmail.com