 |
| ছবি: মোশাররফ / বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
তূর্ণা নিশিতা এক্সপ্রেস থেকে: রাত সাড়ে এগারোটা। স্থান কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন। চট্টগ্রাম, কুমিল্লার গন্তব্যে যাওয়ার জন্যে ‘তূর্ণা নিশিতা এক্সপ্রেসে’ উঠতে যাত্রীদের হুড়োহুড়ি। তবে এখনও ট্রেন ছাড়েনি ছাড়েনি। পরিবারের সকলের আদরের যে শিশুটি ট্রেনের ‘ঠ’ নাম্বার কম্পার্টমেন্টে বসে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আছে, তার গালের কাছেই চলে আসে আরেকটি শিশুর নরম আদুরে অথচ নোংরা গাল।
কোলের শিশুকে জানলা থেকে সরিয়ে নিয়ে বাবা, নোংরা গালটাকে সাবধানে হাত দিয়ে ধাক্কা দেয়। যেন হাতে নোংরা না লাগে।
কম্পার্টমেন্ট থেকে নামি কথা বলার জন্যে। কিন্তু ৬-৭ বছর বয়সী শিশুর মুখ থেকে গোঙ্গানো ছাড়া কথা বের হয় না। তবে উঁচু দাতের কারণে মনে হয় সবসময় হেসে আছে। খালি গা। পরনে যে প্যান্ট সেটিকে দড়ি দিয়ে কোনরকমে আটকে রাখা হয়েছে। প্যান্টের পেছনের কিয়দাংশ ছেঁড়া থাকলেও তাতে শরম পাওয়ার ক্ষমতা নেই বাক প্রতিবন্ধী শিশুটির। শুধু ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়ে থাকতে আর মানুষের কাছে হাত পাততেই শিখেছে ও।
পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল ১২ বছরের আরেক শিশু। নাম রাকিব।
রাকিব জানাল, বাক প্রতিবন্ধী এ শিশুটির নাম সুজন। সবাই এ নামেই ডাকে তাকে।
রাকিব বলে, বাবা-মার পরিচয় নাই ওর। এমনি ঘুইরা বেড়ায়।
রাকিবের মা থাকেন গাবতলী। মানুষের বাসা-বাড়িতে কাজ করেন।
ছোট হাতের ফাঁকে সিগারেটের আগুন লুকিয়ে রাকিব জানায়, দিনে দু’শ থেকে তিনশ’ টাকা আয় করে সে।
মিনিট দশের গল্পে রাকিব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, যদি ত্রিশ টাকা আয় করি কুলিদের দিতে হয় ২০ টাকা। আবার ২০ টাকা আয় করলে দিতে হয় ১২ টাকা।
রাকিবের ক্ষোভে একাত্মতা পোষণ করে আরেক ‘স্টেশন শিশু’ ১০ বছরের রুবেল।
কুলিদের টাকা দেয়ার কারণ হিসেবে ও বলে, ‘আমরা এখানকার কুলি না। বড়রা লিস্টেড (তালিকাভুক্ত)। তাই কাম করলে ওগোরে দিয়া করতে হয়।”
রাকিবের মা গাবতলীর যে বস্তিতে থাকেন সেখানে মাঝে মাঝে যায় ও। তবে বাবার কোন খবর জানে না সে। রাকিব বলে, “মাঝে মাঝে মায়ের কাছে যাই। তবে বেশিরভাগ সময় এখানকার বন্ধুদের সঙ্গেই রাতে ঘুমিয়ে পড়ি।”
আয়ের পুরোটা নিজেই খরচ করে সে। তারপরও নাকি হয় না। টান পড়ে। ও বলে, “অনেক খরচ।”
স্ট্যান্ডিং সিট কাটলেও কিছুক্ষণের জন্যে বসতে পারলাম জানলার পাশের একটি সিটে। কারণ তখনো সব সিট পূর্ণ হয়নি। এয়ারপোর্ট, টঙ্গী থেকে উঠবেন অনেক যাত্রী।
ল্যাপটপ খুলে তখন রাকিব আর সুজনের কথা লিখছি। ট্রেন তখন ছাড়া শুরু করেছে। ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। জানলা দিয়ে চোখ বড় করে ল্যাপটপের লেখা পড়ছে ১৩ বছরের সাজ্জাদ। ট্রেন এগোয়, লেখা বাড়ে, সাজ্জাদ দৌঁড়ায় আর পড়ে।
জিজ্ঞেস করি, “পড়তে পারো?” হাসি দিয়ে জানায়, “হ্যা।”
ধীর গতি থেকে গতি বাড়িয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটছে ট্রেন। সাজ্জাদ, রাকিব আর সুজনদের চোখ সেই ট্রেনের পথে ফ্যালফ্যাল করে দৃষ্টি ফেলছে, তবে অজানা গন্তব্যে!
আবার ট্রেন আসলে হাত পাততে হবে সুজনকে। বোঝা বইবার জন্যে দৌঁড়াবে রাকিব আর সাজ্জাদরা!
বাংলাদেশ সময় : ০০৩০ ঘণ্টা, মার্চ ১৭, ২০১৩
এমএন/সম্পাদনা: হুসাইন আজাদ, নিউজরুম এডিটর-eic@banglanews24.com