 |
| ছবি: উজ্জল ধর/বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ থানার বিভিন্ন এলাকায় রোববার জামায়াত ইসলামীর অঙ্গসংগঠন ছাত্রশিবির ব্যাপক তান্ডব চালিয়েছে। শিবিরের কর্মীরা আকস্মিক মিছিল বের করে পুলিশের পিকআপ ভ্যান সহ কমপক্ষে ৯টি গাড়ি এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও তিনটি দোকান ভাংচুর করেছে।
শিবির কর্মীদের হামলায় নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার উপ-পরিদর্শক (এস আই) বশির আহমেদ ও তিন কনস্টেবল এবং দু`জন সিএনজি অটোরিক্সা চালক সহ ৬ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
এছাড়া নগরীর চকবাজার এলাকায় পুলিশ ও শিবির কর্মীদের মধ্যে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এদিকে শিবির কর্মীরা পুলিশের পিক আপ ভ্যানে হামলা চালিয়ে ২০ রাউন্ড গুলি লুট করে নিয়ে গেছে।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (উত্তর) মো.শহীদুল্লাহ বাংলানিউজকে বলেন, `শিবিরের সন্ত্রাসীরা আকস্মিকভাবে মিছিল বের করে ভাংচুর করেছে। তারা পুলিশ সদস্যদের উপরও হামলা করেছে। শিবিরের পূর্বঘোষিত কোন কর্মসূচী না থাকলে ঝটিকা মিছিল বের করে তারা বিভিন্ন সহিংস কর্মকান্ড ঘটাচ্ছে।`
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, রোববার সকাল ১০টার দিকে নগরীর ষোলশহর দু`নম্বর গেইট এলাকায় আকস্মিকভাবে শিবিরের শতাধিক নেতাকর্মী `নারায়ে তকবীর` শ্লোগান দিয়ে মিছিল শুরু করে। মিছিলটি দু`নম্বর গেইট থেকে জিইসি`র মোড়ের দিকে আসার পথে দৈনিক পূর্বকোণ অফিসের অদূরে একই অভিমুখী একটি বিআরটিসি দোতলা বাস ভাংচুর শুরু করে। এসময় একই এলাকা দিয়ে যাওয়া পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান, একটি মাইক্রোবাস এবং একটি সিটি সার্ভিসের বাসও ভাংচুর করে শিবিরের কর্মীরা।
নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসি (তদন্ত) নাসির উদ্দিন বাংলানিউজকে জানান, বায়েজিদ বোস্তামি থানার পিক আপ ভ্যানটি দামপাড়া পুলিশ লাইনে জ্বালানি তেল নেয়ার জন্য যাচ্ছিল। গাড়িটি পূর্বকোণ অফিস অতিক্রমের আগেই শিবিরের কর্মীরা বড় ইট, ইটের টুকরা এবং গজারি লাঠি দিয়ে ভাংচুর শুরু করে ও পুলিশের উপর হামলা চালায়।
হামলায় আহত বায়েজিদ বোস্তামি থানার এস আই বশির আহমেদ ও তিন কনস্টেবলকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে ঘটনার সময় ওই এলাকায় পুলিশের একটি টহল টিম এগিয়ে আসার চেষ্টা করলে শিবিরের কর্মীরা তাদের উপর ইট, পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং তাদের ধাওয়া দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টহল টিমের এক কনস্টেবল বাংলানিউজকে বলেন, `আমরা শিবিরের সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধের জন্য এগিয়ে যাবার চেষ্টা করলে স্যার (টহল টিমের এস আই) চীৎকার দিয়ে বলেন, দৌঁড়ে পালাও। তখন আমরা পেছন দিকে পালিয়ে যায়।`
নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মিরাজ উদ্দিন আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, `শিবিরের সন্ত্রাসীরা পুলিশের পিকআপ ভ্যানে হামলা করার পর সেখানে অবস্থানরত আনসার সিপাহীর থ্রি নট থ্রি রাইফেলের ২০ রাউন্ড গুলি লুট করে নিয়ে গেছে। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করার প্রক্রিয়া চলছে।`
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দু`নম্বর গেইটে ভাংচুর করে শিবিরের কর্মীরা আবারও প্রবর্ত্তক মোড়ের দিকে মিছিল করে যাবার সময় নাসিরাবাদে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামেন অস্থায়ী রোড ডিভাইডারগুলো ব্যাপক তছনছ করে এবং ওই কার্যালয়ের সামনে কর্তব্যরত নিরপত্তা কর্মীদের দিকে লক্ষ্য করে ইট, পাটকেল নিক্ষেপ করে।
এরপর মিছিলটি মিমি সুপার মার্কেটের সামনে দিয়ে যাবার সময় তিনটি সিএনজি অটোরিক্সা ভাংচুর করে। এতে দু`জন চালক গুরুতর আহত হন। তাদের চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রবর্ত্তক মোড়ে ইকবাল (২৩) নামে আহত এক অটোরিক্সা চালক বাংলানিউজকে বলেন, `ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্পের মত বড় বড় লাঠি দিয়ে গাড়িগুলো ভেঙ্গেছে। হামলা দেখেই যাত্রীরা বের হয়ে ভয়ে পালিয়ে গেছে। আমি বের হয়ে অটোরিক্সার সামনে দাঁড়ালে তারা আমার হাতে লাঠিগুলো দিয়ে পেটাতে থাকে। এক পর্যায়ে আমি পড়ে যাই।`
প্রত্যক্ষদর্শী প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএলবি চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আরাফাত বাংলানিউজকে জানান, মিমি সুপার মার্কেটের সামনে থেকে প্রবর্ত্তক মোড়ে এসে কয়েকজন শিবির কর্মী ইটের টুকরা ছুঁড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের সামনে আয়না ভাংচুর করে। তাদের প্রত্যেকের হাতে বড় বড় লাঠি ছিল।
এসময় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের প্রাইভেট কার, এক ছাত্রীকে নিয়ে আসা একটি মাইক্রোবাস এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিচতলায় তিনটি দোকান ভাংচুর করে। দোকানগুলো হচ্ছে, খাবার দোকান সিজল, ডাইন আউট এবং ফুড ম্যাক্স।
সিজলের ব্যবস্থাপক মো.ইলিয়াস বাংলানিউজকে বলেন, `মিমি সুপারের সামনে থেকে শিবিরের ছেলেরা কয়েকজন পুলিশকে ধাওয়া করে। পুলিশ সদস্যরা আমাদের দোকানের সামনে চলে আসে। এসময় শিবিরের লোকজন দোকান ভাংচুর শুরু করে। আমার দোকানের ভেতর কয়েকজন ছাত্রী ছিল। তারা চীৎকার করে কান্না শুরু করে দেন।`
এরপর শিবিরের কর্মীরা নগরীর চকবাজার এলাকার দিকে চলে যায়। সেখানে গিয়ে তারা মিছিল শুরু করলে কয়েক প্লাটুন পুলিশ গিয়ে তাদের ধাওয়া দেয়। শিবিরের কর্মীরা পুলিশের ধাওয়ার মুখে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে সেখান থেকে পুলিশের উপর ইট, পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। তবে পুলিশের ধাওয়ার মুখে টিকতে না পেরে তারা চমেকের ছাত্রাবাসের সামনে দিয়ে চলে যায়।
এদিকে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার প্রতিবাদে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সকাল সোয়া ১১টার দিকে রাস্তায় নেমে আসে। তারা প্রবর্ত্তক মোড়ে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে এবং দু`পাশের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়।
প্রায় আধাঘণ্টা পর নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (উত্তর) মো.শহীদুল্লাহ`র নেতৃত্বে একদল পুলিশ এসে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। পরে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেন।
এদিকে শিবিরের হামলায় আহতদের দেখতে রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান পুলিশ কমিশনার মো.শফিকুল ইসলাম। পরে পুলিশ কমিশনার সহ সিএমপি`র উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা জামায়াত-শিবিরের সাম্প্রতিক তান্ডবের ঘটনায় করণীয় নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন।
জামায়াত-শিবিরের বিবৃতি
চট্টগ্রাম নগরীতে জামায়াত-শিবিরের তান্ডবের পর রোববার বিকেলে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়েছেন জামায়াত-শিবিরের নেতারা।
বিবৃতিতে তারা দাবি করেছেন, বিভিন্ন মিডিয়ার নগরীর ষোলশহর ও প্রবর্তক মোড়ে হামলা, গাড়ী ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে শিবিরকে জড়িয়ে যে সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। ষোলশহর মোড়ে জামায়াত-শিবিরের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে কোন ধরণের হামলা, গাড়ী ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেনি। পরবর্তীতে প্রবর্তক মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত ভাংচুর ইত্যাদির সাথে জামায়াত শিবিরের কোন সম্পর্ক নেই।
বিবৃতিতে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন, জামায়াত ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগর শাখার আমির ও সাংসদ মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারী নজরুল ইসলাম, নগর উত্তর ছাত্রশিবির সভাপতি মুহাম্মদ ইসমাইল, সেক্রেটারী আ ম ম মাসরুর হোসাইন এবং নগর দক্ষিণ সভাপতি মুহাম্মদ মহিউদ্দিন ও সেক্রেটারী এম এইচ সোহেল।
বাংলাদেশ সময়: ১০৪৫ ঘণ্টা, নভেম্বর ১৮, ২০১২
আরডিজি/টিসি