 |
লন্ডন: ২০১২ সালের বর্ষসেরা নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশির (এনআরবি) স্বীকৃতি পেয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নৃত্যশিল্পী আকরাম খান। যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় বাংলা ম্যাগাজিন মিলেনিয়ামের উদ্যোগে বিশ্বব্যাপি বাংলাদেশিদের মধ্যে পরিচালিত জরিপ অনুসারে তাকে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
‘এনআরবি পার্সন অফ দ্য ইয়ার ২০১২’ শিরোনামে মিলেনিয়ামের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সংখ্যার প্রচ্ছদ রচনায় জরিপের বিস্তারিত উঠে এসেছে। আকরাম খান প্রসঙ্গে মিলেনিয়ামে বলা হয়, লন্ডন অলিম্পিক ২০১২-এর কোরিওগ্রাফার আকরাম খান তার কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের মধ্যে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
২০১২ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া জরিপের মাধ্যমে মিলেনিয়ামের পক্ষ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বাংলাদেশিদের কাছে বর্ষসেরা নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশির জন্য মনোনয়ন চাওয়া হয়। শতাধিক মনোনয়নের মধ্য থেকে ১৪ সদস্যের একটি কমিটি চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য ২০ জনকে বাছাই করে। কীর্তি বিবেচনায় তাদের মধ্য থেকে সেরা হন আকরাম খান।
জরিপে দ্বিতীয় হয়েছেন আমেরিকান বংশোদ্ভূত বাংলাদেশি শিক্ষাবিপ্লবী ও বিশ্বখ্যাত খান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সালমান খান। তৃতীয় হয়েছেন একুশে পদকজয়ী যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ মনসুরুল আলম খান।
বিশজনের তালিকার অন্যরা হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ও টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলরের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান, যুক্তরাজ্য প্রবাসী সমাজকর্মী ও জাতিসংঘে বাংলাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের উদ্যোক্তা তোজাম্মেল (টনি) হক, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি রোশনারা আলী, থাইল্যান্ড ও লাওসে দায়িত্ব পালনকারী ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আসিফ আনোয়ার আহমেদ, সিমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান যুক্তরাজ্য প্রবাসী ইকবাল আহমদ ওবিই, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক মহাসচিব ও যুক্তরাজ্যের স্যাফোর্ড ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর আইরিন খান, আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির হোয়াইট হাউস প্রতিনিধি জুয়েল সামাদ, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ সংবাদ ব্যক্তিত্ব নীনা হোসেন, নামিবিয়ার মৎস্য ও সামুদ্রিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ উপদেষ্টা মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া, সুদান প্রবাসী টেলিকমিউনিকেশন প্রকৌশলী মনির সরকার, যুক্তরাজ্যে কারি ইন্ডাস্ট্রির নেপথ্য কারিগর এনাম আলী, আফ্রিকায় কর্মরত তথ্য প্রযুক্তিবিদ মোস্তাক আহমেদ, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য গবেষণা ও মাননিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (এফডিএ) মূল্যায়নকারী বিজ্ঞানী (টক্সিকোলোজিস্ট) তাহের খান, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান উদ্যোক্তা সুমাইয়া আন্দালিব কাজি, বিজয় ব্যাজের উদ্যোক্তা কানাডা প্রবাসী বেলায়েত হোসেন চৌধুরী, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের বাংলা বিভাগের প্রধান সাবির মোস্তফা ও বাংলাদেশের ঐতিহ্য নৌকা বাইচকে যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠাকারী আজিজ উর রহমান।
মিলেনিয়াম সম্পাদক মাহবুব হোসেন জানান, প্রবাসীরা বিভিন্ন কীর্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে নতুন পরিচয় দিচ্ছেন। তাদের কীর্তি ও অর্জনকে সম্মান জানানো এবং তা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই প্রবাসে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্বকারী জনপ্রিয় ম্যাগাজিন মিলেনিয়াম ২০১১ সাল থেকে এ উদ্যোগ নেয়। প্রথমবার এনআরবি পার্সন অফ দ্য ইয়ার নির্বাচিত হয়েছিলেন ব্রিটিশ এমপি রোশনারা আলী।
উল্লেখ্য, নৃত্যশিল্পী আকরাম খান বিশ্ব নৃত্যাঙ্গনে একটি পরিচিত ও জনপ্রিয় নাম। লন্ডন অলিম্পিক ২০১২-এর কোরিওগ্রাফার পরিচয় ছাড়াও তার রয়েছে এক বর্নাঢ্য ক্যারিয়ার। বাংলাদেশ নিয়ে তৈরি বিশ্বব্যাপি সাড়া জাগানো একক নৃত্যনাট্য ‘দেশ’ এর জন্য ২০১২ সালে তিনি মর্যাদাপূর্ণ ব্রিটিশ অ্যাওয়ার্ড ‘অলিভিয়ার’ লাভ করেন। চার বছর বয়স থেকে নৃত্যের প্রতি আকৃষ্ট আকরাম খান ব্রিটেনসহ পাশ্চাত্যের মিডিয়াগুলোতে বার বার ঝড় তুলেছেন তার নাচের প্রতিভা দিয়ে।
তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যত সুনামই অর্জন করুন, নিজ শেকড়কে কিন্তু ভুলেননি বাঙালির প্রবাসী প্রজন্মের এই প্রতিনিধি। আর তাই তার মেধা ও প্রতিভা দিয়ে বিশ্বাঙ্গনে তুলে ধরতে চেয়েছেন নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশকে। ২০১০ সালে তিনি দেশে এসেছিলেন মাতৃভূমিকে নিয়ে একটি নৃত্যনাট্য তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে। অস্কার বিজয়ী ভিজিওয়েল আর্টিস্ট টিম ইপ এর সহযোগিতা নিয়ে তৈরি করেন তার স্বপ্নের একক নৃত্যনাট্য ‘দেশ’। ৮০ মিনিটের এই একক নৃত্যনাট্যে দেহ, মন এবং ব্যক্তির জন্যে একটি পরিবর্তনশীল বিশ্বের ভারসাম্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন আকরাম খান।
‘দেশ’ নৃত্যনাট্যে স্থান পেয়েছে কবি শামসুর রহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’ কবিতার অংশ, স্থান পেয়েছে ‘রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়’ এর মত বাঙালির সাহসী স্লোগান। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটেনের লেস্টারে ও অক্টোবরে লন্ডনের শেডলার ওয়েলস থিয়েটারে ‘দেশ’ প্রদর্শনের পর প্রশংসিত হয় ব্রিটেনসহ সারা বিশ্বের নৃত্যাঙ্গনে। পাশ্চাত্য ধারণা নিয়েই শুধু নয়, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ নিয়েও যে নৃত্যনাট্য তৈরি করা যায়, তা-ই হাতেনাতে প্রমাণ করেন আকরাম খান।
শুধু ‘দেশ’ সৃষ্টির পর নয়, এর আগ থেকেই ব্রিটিশ মিডিয়া তাকে নিয়ে সরব ছিল। ২০০২ সালে ব্রিটেনের আইটিবিতে আকরাম খানকে নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। ২০০৮ সালে বিবিসি ও ২০১০ সালে চ্যানেল-৪ তাকে নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরি করে। সৃষ্টিশীল কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ পারফর্মিং আর্টস অ্যান্ড লিটারেচারে ১ম শ্রেণীতে ১ম স্থান পাওয়া আকরাম খান তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতোমধ্যে পেয়েছেন সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি। ব্রিটেনের রাণীর কাছ থেকে পেয়েছেন এমবিই খেতাব। ২০১২ এর অলিম্পিকে কোরিওগ্রাফার হিসেবে পারফর্ম করার জন্য সারা বিশ্বের ৬ হাজার প্রতিযোগী থেকে বাছাই করে ৫০ জনকে নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে আকরাম ছিলেন একজন।
৪ বছর বয়স থেকেই নাচের প্রতি আগ্রহী আকরাম খান লন্ডনের বাংলাদেশ সেন্টারে নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর কাছ থেকে নৃত্যশিক্ষা শুরু করেন। বিশ্বকাঁপানো থিয়েটার পরিচালক পিটার ব্রুকসের কাছেও দীক্ষা নিয়েছেন তিনি। দীক্ষা নেয়ার সুযোগেই পিটার ব্রুকসের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়।
ঢাকার অধিবাসী মোশাররফ খানের দুই সন্তানের একজন আকরাম খান। বিশ্বাঙ্গনে ব্যাপক খ্যাতি ও পরিচিতির পরও নিজ শেকড়ের প্রতি তার আলাদা টান। এই মূহূর্তে ফ্রান্সে রয়েছেন। বর্ষসেরা নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশি নির্বাচিত হওয়ায় তার প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলেও এ স্বীকৃতিতে খুবই আনন্দিত আকরামের বাবা মোশাররফ খান।
বাংলানিউজকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় মোশাররফ খান বলেন, “অনেক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিই আকরাম পেয়েছে। ‘এনআরবি অব দ্যা ইয়ার’ নিজ স্বজাতির দেয়া সম্মান। স্বজাতির দেওয়া স্বীকৃতির গুরুত্বই আলাদা।”
বাংলাদেশ নিয়ে আকরামের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা কৃতজ্ঞ বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালিদের কাছে, যাদের কারণে আকরাম আজ এ সম্মানে ভূষিত হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, তার ছেলে আকরাম শেকড় সন্ধানী এক নৃত্যশিল্পী, বিশ্বখ্যাতি ব্যবহার করে যে নিজ মাতৃভূমিকে তুলে ধরতে চায়। এনআরবি পুরস্কারের পর তার বারবার দেশের কথা মনে পড়ছে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, আকরামের পিতা মোশাররফ খান ছেলের এনআরবি অফ দ্য ইয়ার স্বীকৃতি পাওয়ার খবর প্রথম জানতে পারেন বাংলানিউজ প্রতিনিধির কাছে।
বাংলাদেশ সময়: ১৬৪১ ঘণ্টা, মার্চ ১৫, ২০১৩
সম্পাদনা: হাসান শাহরিয়ার হৃদয়, নিউজরুম এডিটর