 |
কোরবানি করা প্রত্যেক মুসলিম সামর্থ্যবান নর-নারীর ওপর ওয়াজিব। কোরবানি সম্পর্কিত কিছু জরুরি কথা-
কোরবানির পরিচয়: কোরবানি আরবি শব্দ। যার শাব্দিক অর্থ উৎসর্গ বা ত্যাগ করা। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় কোরবানি বলা হয় ওই নির্দিষ্ট জন্তুকে যা একমাত্র আল্লাহ পাকের নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্যেশে নির্দিষ্ট সময়ে একমাত্র আল্লাহর নামে জবেহ করা হয়।
কোরবানির তাৎপর্য ও ফজিলত: কোরবানির তাৎপর্য ও ফজিলত সম্পর্কে বহু হাদিস পাওয়া যায়। হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার কয়েকজন সাহাবি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সা.)! কোরবানি কি? প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সা.) বললেন, তোমাদের (জাতির) পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর সুন্নত। পুনরায় প্রশ্ন করা হলো, এতে আমাদের জন্য কি আছে? রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সা.) বললেন, কোরবানি করা গরু ও বকরির প্রতিটি পশমে নেকি রয়েছে। তখন সাহাবায়ে কেরাম আবার জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে ভেড়া ও দুম্বার ব্যাপারে আপনার অভিমত কি? তিনি উত্তরে বললেন, ভেড়া ও দুম্বার পশমেও ছওয়াব রয়েছে। (আহমাদ, ইবনে মাজাহ, মিশকাত-১২৯)।
তারগিব নামক গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, একবার হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সা.) স্বীয় কন্যা ফাতেমাকে (রা.) ডেকে বললেন “হে ফাতেমা! তুমি তোমার কোরবানির জন্তুর কাছে যাও, কেন না কোরবানির জন্তু জবেহ করার পর রক্তের ফোঁটা মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমার যাবতীয় গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।” হযরত ফাতেমা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! এটা কি শুধু আমার জন্য? প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সা.) জবাব দিলেন “এটা সব মুসলমানের জন্য”।
কোরবানির ইতিহাস: " সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম। অতঃপর সে যখন পিতার সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইব্রাহীম তাকে বললো, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে জবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি। সে বললো, পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে সবরকারি পাবেন।
যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করলো এবং ইব্রাহীম তাকে জবেহ করার জন্যে শায়িত করলো। তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইব্রাহীম, `তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! আমি এভাবেই সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান, কোরবানির বিনিময়ে।’’ সূরা আস-সাফফাত ৩৭
হজরত ইব্রাহিমকে (আ.) আল্লাহু স্বপ্নে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘হে ইব্রাহিম, তুমি তোমার প্রিয়বস্তুকে কোরবানি কর। এই প্রিয়বস্তু বলতে অশীতিপর বৃদ্ধ হজরত ইব্রাহিম (আ.) তার শিশু পুত্র হজরত ইসমাইমকে (আ.) বুঝেছিলেন এবং হজরত ইসমাইলকে (আ.) কোরবানি করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন।
হজরত ইসমাইমকে (আ.) এ কথা খুলে বলার পর হজরত ইসমাইল (আ.) হাসি মুখে সম্মতি দিয়েছিলেন এবং বাবার ছুরির নিচে স্বেচ্ছায় শুয়ে পড়েছিলেন। বৃদ্ধ ইব্রাহিম (আ.) দ্বিধাহীনভাবে জগতে তার সবচেয়ে প্রিয় হজরত ইসমাইমের (আ.) গলায় ছুরি চালিয়ে দিলেন। এভাবে দয়াময় আল্লাহ আসলে হজরত ইব্রাহিমকে (আ.) পরীক্ষা করেছিলেন এবং এ পরীক্ষায় তিনি পাস করে আল্লাহুর সন্তুষ্টি অর্জন করেছিলেন। পরে কোরবানি শেষে দেখলেন যে কোরবানি হয়েছে একটি দুম্বা, হজরত ইসমাইল (আ.) তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। সে অনুরাসের আল্লহুর সন্তুষ্টির জন্য আমরা প্রতি বছর গরু, ছাগল, উট, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি পশু কোরবানি করি।
কোরবানির মাংস ভাগ করার উত্তম পন্থা হলো- তিন ভাগের এক ভাগ আত্মীয়ের, এক ভাগ গরিব-দুঃখির এবং এক ভাগ নিজের জন্য রাখা। কোরবানির চামড়া কোনো মাদ্রাসায় দেওয়া উত্তম, অথবা উচিৎ মূল্যে বিক্রি করে ফকির, মিসকিন, মাদ্রাসা ইত্যাদিতে দান করে দিতে হবে।
উল্লেখ্য, যে কোরবানির চামড়া উচিৎ মূল্যে বিক্রি না করলে খাতিরে বিক্রি করলে কিংবা কোনো সন্ত্রাসীর ভয়ে কম দামে বিক্রি করলে কিংবা কসাইকে চামড়া ছাড়ানোর পারিশ্রমিক হিসেবে দিয়ে দিলে কোরবানি আদায় হবে না। সেজন্য সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো, মাদ্রাসা কিংবা এতিমখানায় দান করে দেওয়া।
"আমি বিশ্বস্ততা চাই, পশু-কোরবানি নয়
পোড়ানো-কোরবানির চেয়ে আমি চাই যেন মানুষ সত্যিকারভাবে আল্লাহকে চেনে।"
(কিতাবুল মোকাদ্দস, হোসিয়া ৬:৬)
পরিশেষে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে ফরিয়াদ জানাই- আল্লাহ তুমি আমাদের সবার কোরবানি কবুল করো। আমিন ছুম্মা আমিন।
লেখক- আল্লামা মোহাম্মদ আশেকুর রহমান
মুহাদ্দিস- কাগতিয়া এশাতুল উলুম কামিল এম. এ. মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম।
বাংলাদেশ সময়: ২০৪১ ঘণ্টা, অক্টোবর ২৬, ২০১২
সম্পাদনা: মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন ও শিমুল সুলতানা
ইসলাম ডেস্ক: bn24.islam@gmail.com