 |
(কবিতাসংশ্লিষ্ট সাতটি নির্ধারিত প্রশ্ন নিয়ে ‘সপ্তজিজ্ঞাস’ নামের এ আয়োজন। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমের পক্ষ থেকে তানিম কবিরের করা প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়েছেন কবি ইলিয়াস কমল)
কবিতা কেন লিখেন— একজন কবি এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে বাধ্য কি না? যদি বাধ্য নন— তো কেন? আর হোন যদি— আপনার প্রতিও একই প্রশ্ন; কেন লিখেন কবিতা?
কবিতা কেন লিখি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে এক অর্থে কবি বাধ্য নন। কারণ, কবি মাত্রই স্বাধীন। যদিও একজন কবি সমাজ, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতির বাইরে নয় বলে কবিরও বাধ্যবাধকতা থাকে। তবে তা তার কবিসত্তার কাছে। অন্য কারো কাছে নয়। তাই, কেন কবিতা লিখি এই প্রশ্নের উত্তর দিতেও কবি কেবল নিজের দিকেই তাকাবে।
‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’— এই ‘কেউ কেউ’ বা ‘কারও কারও’ কবি হয়ে ওঠায় ঐশীপ্রাপ্তির কোনও ঘটনা থাকে কি? নাকি পুরো ব্যাপারটাই রেওয়াজ নির্ভর? আপনার কী মনে হয়?
সবাই যদি কবি হয়েই যাইতো, তাইলে কি এই প্রশ্নটা করার প্রয়োজন পড়তো? মনে হয় না। তাই ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’ এই ‘কেউ কেউ’ বিষয়টা ঠিক ঐশীপ্রাপ্তিও না আবার রেওয়াজ নির্ভরও না। এটা এক ধরনের আপেক্ষিক বিষয়। কেউ হয়তো তার মেধার ব্যবহার করেই সেরা কবিতাটা লিখে ফেলতে পারেন, আবার কেউ হয়তো কবিতায় দীর্ঘদিনের চর্চার মাঝ দিয়ে একটি কাঠামোতে দাঁড়াতে পারেন। আমি মনে করি প্রকৃত কবিতায় স্বতঃস্ফূর্ততা, মেধা ও চর্চার সব উপাদানই থাকবে। যা সেরা কবিদের কবিতার দিকে তাকালেই চোখে পড়ে।
এখনকার কবিদের ছন্দবিমুখতার কারণ কী বলে মনে হয় আপনার? কবিতার জন্য ছন্দের প্রয়োজনীয়তা কতোটুকু? কবিতার স্বতঃস্ফূর্ত বিস্তারে ছন্দ আপনার কাছে সহায়ক নাকি প্রতিবন্ধক?
ছন্দবিমুখতা কোথায়? খুব সাধারণভাবে গল্পচ্ছলে কবিতা লিখতে গেলেও একটা ছন্দের ভেতর তা নির্মিত হবে। কোনও কবিতাই ছন্দের ঊর্ধ্বে নয়। আর ছন্দ বলতে যদি অন্ত্যমিল বোঝেন তাহলে ঐ ছন্দের দিন তো সেই রবীন্দ্রনাথের আমলেই শেষ হয়ে গেছে।
দশকওয়ারী কবিতা মূল্যায়নের প্রবণতাটিকে কিভাবে দেখেন? আপনার দশকের অন্যান্য কবিদের কবিতা থেকে নিজের কবিতাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার উপাদানসমূহ কী বলে মনে হয় আপনার?
দশকওয়ারী কবিতা মূল্যায়ন কেবল কবির সূচনাকে ধরার জন্য একটা পদ্ধতি। আর এছাড়া যা হতে পারে তা হলো ঐ কবির উদ্ভব ও কাব্য চর্চার সময়ের রাজনীতিক অর্থনৈতিক সময়টাকে চর্চা করার জন্য সহায়ক একটি পথ। কিন্তু বাংলা কবিতায় কবি তালিকার দীর্ঘ সারিতে দাঁড়ানোর জন্য যে দশকওয়ারী হিসেব বা বিবেচনা করা হয়, এটা খুবই অশ্লীল এবং বাজে একটা পদ্ধতি। এর চেয়ে ভালো হতে পারে কেবল এই কবিতাগুলোর চেয়ে ঐ কবিতাগুলো ভালো— তা আবিষ্কার করা।
অন্যান্য কবিদের থেকে আমার কবিতা আলাদাভাবে চিহ্নিত করার সময় কি এখনই এসে গেছে? এখনো তো সমবয়েসী কারোর ৫০টা করে লেখা পড়া হয়েছে কিনা তা নিয়েই সংশয় রয়েছে। তাহলে এর মাঝে এমন প্রশ্ন করা তো বোকামি ছাড়া আর কিছু না। এমন প্রশ্ন আপনি আজ থেকে যারা বিশ বছর আগে লিখতে এসেছে, যারা নিজেদের এক একটা স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি করতে চেষ্টা করছে তাদের করা ভালো। আমি কোন ছাড় এই প্রসঙ্গে কথা বলবো?
তিরিশের দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত— প্রত্যেকটি দশক থেকে যদি তিনজনের নাম করতে বলা হয় আপনাকে— কারা আসবেন? উল্লিখিত কালখণ্ডে কোন দশকটিকে আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়?
দশকওয়ারী চিন্তা করলে দুই বাংলায় পঞ্চাশ ও ষাটের দশক বেশ উল্লেখযোগ্য বলে মনে হয়। নাম জিজ্ঞেস ও বলার চর্চাটা আমাদের দেশে খুব অশ্লীল পর্যায়ে নেমে গেছে। যা আমাদের রুচিরও প্রমাণ দেয়। এইসব ছোটখাটো স্থানে আমার মতো অনুল্লেখ্য ব্যক্তিরা কে কি বললো না বললো তা নিয়ে অনেকের বিশ্রী বদ হজম হয়, যা চারপাশের পরিবেশ দুষিত করে। এ কারণে কবিতা চর্চার সুষ্ঠু পরিবেশ ধরে রাখতে এমন প্রশ্ন না করাই নিরাপদ।
দেশভাগোত্তর দুই বাংলার কবিতায় মৌলিক কোনও পার্থক্য রচিত হয়েছে কি? এ-বাংলায় ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন। ওপার বাংলায়ও নকশালবাড়ি আন্দোলনসহ উল্লেখযোগ্য কিছু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন— এসমস্ত কিছুর আলাদা আলাদা প্রভাব কবিতায় কতোটা পড়েছে বলে মনে করেন?
দুই বাংলার কবিতায় চোখ বন্ধ করলেও দুটো রূপ স্পষ্ট বোঝা যায়। তার প্রধান কারণ ভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট। পাশাপাশি আমাদের অঞ্চলে কবিতায় রাজনৈতিক প্রভাব খুবই কমে এসেছে। অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গের কবিতায় তা ততটা কমে নি। বরং কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা বেড়েছেও। দশকওয়ারী শব্দটা আমি ব্যবহার করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করি না যদিও তারপরও বলা যায়, গত দশকে (শূন্য) আমাদের দেশের কবিদের কবিতায় সামাজিক দায়বোধের চিহ্ন আশঙ্কাজনকভাবে কম দেখা গেছে। এ থেকে আমরা ধারণা করতে পারি এই সময়ের কবিরা হয় নিজের একান্তই কোনও জগত থেকে কবিতা লিখেন, নয়তো সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনা তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারে না। এমনকি কোথাও কোথাও রাজনৈতিক জীবনের চেয়ে বেশি সামাজিক জীবনের অনুপস্থিতি আমাকে আশ্চর্য করেছে। আমি মনে করি, প্রত্যেক কবিরই একটা ন্যূনতম সামাজিক দায় থাকা উচিত, অথচ পশ্চিমবঙ্গের কবিতায় এই সামাজিক দায়বোধের চিহ্নটা যথেষ্ট রকমেরই চোখে পড়ে। এছাড়াও এই অঞ্চলের কবিতা নৈর্বক্তিক কাব্যচর্চার ক্ষেত্রে অনেক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। এটাকেও আমার খুব উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন বলে মনে হয়। তবে এই নৈর্বক্তিক কাব্যভাষা কতটা আন্তর্জাতিক কবিতার সাথে মিলে, তা দেখার সময় হয়ে এসেছে এখন।
কবিতার বিরুদ্ধে জনবিচ্ছিন্নতা ও দুর্বোধ্যতার অভিযোগ বিষয়ে কিছু বলুন। কবির কি পাঠকের রুচির সাথে আপোষ করে কবিতা লেখা উচিৎ? বর্তমানে বাংলা কবিতার পাঠক কারা?
কবিতার বিরুদ্ধে জনবিচ্ছিন্নতা ও দুর্বোধ্যতার অভিযোগটা আমি মানি না। কারণ, যে বা যারা এই অভিযোগ করে তারা কবিতার ধারবাহিক পাঠে মনযোগী পাঠক নয়। যদি তারা মনযোগী পাঠক হতো, তবে তারা বাংলাদেশের কবিতার যে বিবর্তন এটাকে দেখতে পেতেন। এই বিবর্তন টের না পেয়ে একবার চোখ মেলে তাকিয়ে দেখেছে বারোটা দশ বাজে মাঝখানে আরও কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকালে যেমন মনে হয়, মাত্র তো একটা পলক ফেললাম, এর মধ্যে ঘণ্টা পার হয়ে গেল? এমন করে কবিতার পাঠ করে বলেই কবিতার এই জনবিচ্ছিন্নতার অভিযোগটা আসে। আর কবি কেন পাঠকের রুচির সাথে আপোষ করবে? তার যদি পাঠকের রুচিকে প্রাধান্য দিতে ইচ্ছা থাকে তবে সিনেমায় নামুক, সেখানে দর্শকদের রুচির ওপর নির্ভর করেই সিনেমা নির্মিত হয়।
কবিতার ধারবাহিক পাঠক এখন কমে গেছে তা স্পষ্ট। তাই কবিতার পাঠক কারা সে প্রশ্ন করা আরো একটি বোকামি ছাড়া আর কিছু না।
।।
ইলিয়াস কমল
জন্ম: ৯ মার্চ ১৯৮৪
জন্মস্থান: ফুলপুর, ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ
পেশা: সাংবাদিকতা
সম্পাদিত কাগজ: পাঁচিল
।।
বাংলাদেশ সময় : ১৩৪২ ঘণ্টা, ০৪ মার্চ ২০১৩
দ্য-টিকে