 |
| চট্টগ্রাম কিডনি হাসপাতাল ও গবেষণাকেন্দ্রের নকশা |
চট্টগ্রাম: আড়াই লাখ বর্গফুটের ২০তলা ভবনের নকশা অনুমোদন হলেই বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বিশ্বমানের কিডনি হাসপাতাল ও গবেষণাকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু করবে বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশন (বিকেএফ)। নির্মাণকাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫০ কোটি টাকা।
নগরীর খুলশী থানার জাকির হোসেন সড়কে ইজারা নেওয়া যোগাযোগ ও রেলপথ বিভাগের ১ একর ২১ শতক ভূমির ওপর এ হাসপাতাল কমপ্লেক্সটি নির্মিত হবে। নির্মাণব্যয় সংগ্রহ করা হচ্ছে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সমাজসেবী ও বিকেএফ সদস্যদের অনুদানের মাধ্যমে।
বিশেষায়িত এ হাসপাতাল কমপ্লেক্সে কিডনি মেডিসিন (নেফ্রোলজি), কিডনি সার্জারি (ইউরোলজি) বিভাগ ছাড়াও থাকবে শিশুরোগ ও শল্য চিকিৎসা, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি, অর্থোপেডিকস, জেরিয়াট্রিক মেডিসিন, অংকোলজি বা ক্যানসার, কার্ডিওলজি ও কার্ডিও থোরাসিক সার্জারি বিভাগ।
বাংলানিউজের সরেজমিন অনুসন্ধান ও বিকেএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় বিষয়টি উঠে আসে।
সোমবার দুপুরে বিকেএফের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম বাংলানিউজকে বলেন, ‘বিকেএফের বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলেই ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে।’
অর্থের জোগান কীভাবে দেবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামসহ দেশ-বিদেশের অনেক শিল্পগ্রুপ, ব্যবসায়ী, ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। আশাকরি, অর্থসংকট কোনো প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াবে না।’
বিকেএফের প্রাথমিক উদ্যোক্তাদের অন্যতম ও প্রখ্যাত কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. ইমরান বিন ইউনুস বাংলানিউজকে বলেন, ‘নকশা অনুমোদন হলেই আমরা কিডনি হাসপাতাল কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণকাজ শুরু করে দেব। তহবিলের কোনো সংকট নেই। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অনেক মানুষ অনুদান দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করে আছেন। আপ্রাণ চেষ্টা করে যাব আমাদের স্বপ্ন যেন দুঃস্বপ্নে পরিণত না হয়।’
বৃহত্তর চট্টগ্রামে ২ শতাধিক কিডনি প্রতিস্থাপন করা এবং ৬ শতাধিক ডায়ালাইসিস করতে হয় এমন কিডনি রোগী বসবাস করছেন উল্লেখ করে ড. ইমরান বিন ইউনুস বলেন, ‘চমেক হাসপাতাল, আগ্রাবাদ মা, শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল, হলি ক্রিসেন্ট, ন্যাশনাল হাসপাতাল, সিএসসিআর, সার্জিস্কোপ, মেডিক্যাল সেন্টারসহ সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র মিলে ডায়ালাইসিসের মেশিন আছে বড়জোর ৩ ডজনের মতো। যা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম।’
দীর্ঘ গবেষণার কথা উল্লেখ করে খ্যাতিমান এ চিকিৎসক বলেন, ‘ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, বিভিন্ন ধরনের নেফ্রাইটিস ও ক্রনিক রোগ, অস্ত্রোপচারজনিত সমস্যার কারণে কিডনির সমস্যা বাড়ছে। এ ছাড়া জ্বর, ডায়রিয়া পরবর্তী পানিশূন্যতা, বিষক্রিয়া, প্রসবকালীন জটিলতা কিংবা দুর্ঘটনাজনিত কারণে কিডনি অচল হয়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশের ওপরও কিডনির সুস্থতার বিষয়টি জড়িত।’
তিনি জানান, এক্ষেত্রে বিকেএফ কিডনি রোগীদের ৩টি মেশিনে তুলনামূলক কম খরচে ডায়ালাইসিস ও আনুষঙ্গিক সেবাদি দিয়ে আসছে। বিকেএফের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে চট্টগ্রাম কিডনি হাসপাতাল কমপ্লেক্সটি হবে কিডনি রোগীদের নিরাপদ ঠিকানা।
সূত্র জানায়, বর্তমানে বেসরকারি ক্লিনিকগুলো যেখানে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ডায়ালাইসিস ফি নিচ্ছে সেখানে বিকেএফ নিচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। ৫ জন বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে বিকেএফে বহির্বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন একজন মেডিক্যাল অফিসার। এ ছাড়া ১ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ২ জন ল্যাব অ্যাসিস্টেন্ট, ২ জন অফিস সহকারী ও ৩ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আছেন কিডনি রোগীদের সেবাকার্যক্রম পরিচালনার জন্য।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে প্রবাসী কয়েকজন কিডনি বিকল হওয়া রোগীর অনুপ্রেরণায় বিকেএফ (চ-৮৭৩) আত্মপ্রকাশ করেছিল। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে এ ফাউন্ডেশন।
এ সময় ফাউন্ডেশন সংগৃহীত চিকিৎসাসামগ্রী ব্যবহার করে চালু করা হয়েছিল পেরিটোনিয়াল ও হিমোডায়ালাইসিস, যা আকস্মিক কিডনি বিকল হওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে খুবই ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়। শুধু তাই নয়, চমেক হাসপাতালে সরকারিভাবে কিডনি বিভাগ চালুর আগেই রোগীরা ডায়ালাইসিস সেবা পান। এরপর সেখানে সরকারি কার্যক্রম শুরু হলে বিকেএফ জাকির হোসেন সড়কের নতুন ঠিকানায় চলে আসে।
২০০২-০৩ সালে বিকেএফ নিজস্ব ভূমিতে অবকাঠামো নির্মাণ করে। ২০০৭ সালের ২৬ এপ্রিল বিকেএফ পরিচালিত চট্টগ্রাম কিডনি হাসপাতালে প্রথম ডায়ালাইসিস সেবাকার্যক্রম শুরু করা হয়। বর্তমানে এখানে ৩টি ডায়ালাইসিস মেশিন রয়েছে। যাতে প্রতিদিন ৬ জন কিডনি রোগীকে ডায়ালাইসিস করা হচ্ছে।
বেসরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল এ প্রতিষ্ঠানে ৩টি ডায়ালাইসিস মেশিন দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, চন্দনাইশের রফিকুল ইসলাম ও রোটারিয়ান সাইফুল হক। এ ছাড়া ১৯৯২ সালে বাদশা শিল্প গ্রুপের অর্থায়নে বাদশা ব্লক, ২০০৭ সালের জুলাইতে টিকে গ্রুপের অর্থায়নে হেমোডায়ালাইসিস ভবন ও ২০০৮ সালের এপ্রিলে লোহাগাড়া চুনতির কামাল উদ্দিন আহমেদ খানের অর্থায়নে হেমোডায়ালাইসিস ব্লক নির্মিত হয়।
বিকেএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম বলেন, ‘কিডনি রোগ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিকেএফ চলতি জানুয়ারি থেকে সোশ্যাল মোবিলাইজেশন কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিমাসে আমরা ৪টি সচেতনতামূলক ক্যাম্প করব। কারণ আমরা উপলব্ধি করছি ব্যয়বহুল এ রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। মানুষ সচেতন হলে, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচারে একটু পরিবর্তন আনতে পারলেই আমার মতো কাউকে কিডনি প্রতিস্থাপন করে বেঁচে থাকতে হবে না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কিডনি রোগীর অভিভাবক বাংলানিউজকে বলেন, ‘বিকেএফ প্রতিষ্ঠা হয়েছে ৩ দশক আগে। কিন্তু এখনো চট্টগ্রামে কিডনি রোগের বিশেষায়িত হাসপাতালটি গড়ে উঠেনি। বাধ্য হয়ে রোগীদের ঢাকা কিংবা প্রতিবেশী দেশ ভারতে দৌড়-ঝাঁপ করতে হচ্ছে। কিডনি প্রতিস্থাপন করে আসা এবং ডায়ালাইসিস জরুরি এমন রোগীদেরও পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন দুর্ভোগ।’
উল্লেখ্য, বর্তমানে বিকেএফের আজীবন সদস্য ৭২৭ জন এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ৩৭ জন।
বাংলাদেশ সময়: ২০৪০ ঘণ্টা, জানুয়ারি ০৭, ২০১৩
এআরএম, সম্পাদনা: তপন চক্রবর্তী, ব্যুরো এডিটর