একুশে মেলায় এসেছে তারুণ্যের ব্যঞ্জনাময় বারোটি ছোটগল্পের চমৎকার সংকলন সাইফুল্লাহ সাইফ-এর ‘কয়েকটি ডানাকাটা প্রজাপতির উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন’।,
কী ভাবছে আমাদের তরুণ সমাজ? সময়ের অগ্রপথিক কীভাবে সাজাতে চায় তার সময়? সময়কে ধারণ করাই কী সাহিত্য ও শিল্পের চরম উপাসনা? প্রশ্ন আছে এবং প্রশ্ন ছিল। কিন্তু ছোটগল্পের প্রশ্নগুলো যখন উত্তর হয়ে মানুষকে নিয়ে যায় ভাবনার অন্তিমে, একটি শিহরণ প্রাণের রস জাগিয়ে বলে, ‘এ যে তাই, যা আমি ভাবি’। এভাবেই অদ্ভুত সেতুবন্ধন হয়ে যায় লেখকে ও পাঠকে । এরকম অসংখ্য সেতুবন্ধনের নিদর্শন এই বইটি ।
বিষয় বৈচিত্র্য, শৈল্পিক আঙ্গিকে, মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদে এবং প্রেমের নিপুণ পরিবেশনায় পাঠক বারবার খুঁজে পায় নিজেকে। এই আত্ম-অনুসন্ধানইতো আধুনিক সাহিত্যের মানদণ্ড। সাইফুল্লাহ সাইফের গল্পগুলো কেবল প্রেম ও দারিদ্র্য নিপীড়িত মানুষের জলছবি না, জীবন ও প্রেম নৈব্যত্তিক প্রশ্নে এখানে দ্বিধান্বিত । তাই একটি সোচ্চার উচ্চারণ ‘নৈতিকতা’- যা পাঠককে নিয়ে যায় সমাজের শিকড়ে । যেমন ‘উলুবনের ঝিঁঝিঁ পোকা’ ও ‘নরকের নর্তকী’ ।
গল্প কখনো কথা বলে না, অন্তরাত্মাকে দিয়ে কথা বলায় । ‘এক খণ্ড জমি’ ও ‘পরিহাস’ গল্প দুটি চেতনার কেন্দ্রে গিয়ে হাহাকার জাগায়। ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব এতে প্রায়ই অনুপস্থিত এবং কোথাও কোথাও প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু মনস্তত্ত্বের চূড়ান্ত উপাদান এখানে সক্রিয় থেকে প্রশ্ন করায়- পৃথিবী ও মানুষ আর কতো বড় হবে? বড় হওয়ার অর্থই বা কী?
‘বিরহ তোমায় ভালোবাসার অর্চনা’, ‘অব্যক্ত ব্যঞ্জন’ এবং ‘যুগলবন্ধন’ প্রেমের গল্প। লেখক প্রেমকে আধুনিক সময়ের ধাঁধা হিসেবে না দেখিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন সুন্দরের রূপকে। তাই একটি রেষ থেকে যায় অনুভবের শেষ সীমান্ত ঘিরে ।
‘অশরীরীর অমরত্ব’ ও ‘এইতো আমি’ লেখকের অন্যান্য গল্প থেকে আলাদা। বিমূর্ত চিত্রকলার মতো পাঠককে নিয়ে যায় অন্য কোনো পরাবাস্তবিক অনুসন্ধানে।
ভাষা ব্যতিত ভাবের অস্তিত্ব হয়ে পড়ে সংকটাপন্ন- তাই আধুনিক লেখকরা ভাষার ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। তরুণ লেখক সাইফুল্লাহ সাইফের সচেতনতা চমৎকারভাবে চোখে পড়ে। তার সাবলীল উপস্থাপনা মনকে নিয়ে চলে দৃশ্যের আরও গভীরে এবং যা কিছু দৃশ্যমান তা আরও মূর্ত হয় চোখের সামনে। এখানেইতো তারুণ্যের জয় । তারুণ্য যা বলে- নতুন করে বলে ।
একজন লেখকের ভাবনা কখনো কখনো নিজস্ব চিন্তার বলয় ভেঙে রূপ নেয় সার্বজনীনতায়; তখন জীবনের সাধারণ দুঃখ-কষ্টগুলো দৃষ্টিগোচর হয় নান্দনিক বিন্যাসে। ভাষার প্রাঞ্জলতা ও দক্ষতা ছাড়া যা অসম্ভব। বর্তমান নাগরিক লেখকেরা পল্লী-কথাকে সাহিত্যের কাতারে আনতে প্রায়ই হিমশিম খান। কিন্তু জীবন যেখানে যে রূপ, তাকে সে রূপে উপস্থাপন না করলে যে সুন্দর সত্য হারায়। নন্দন-তত্ত্ব ও সৃষ্টি-তত্ত্বের বিচারে সাইফুল্লাহ সাইফের মুনশিয়ানা প্রশংসার দাবি রাখে। কারণ তার আঞ্চলিকতা ভাষার সাবলীল উপস্থাপনায় চরিত্রগুলোকে পুতুল চরিত্র নয়- মনে হয় রক্ত মাংসে সৃজিত অদেখা আমিত্বের রূপায়ন ।
গল্পগুলোর চমৎকারিত্ব কেবল বিষয়ভিত্তিক প্রকাশেই নয়, শেষ করার ভেতর দিয়েও রেখে যায় তার জাদুকরী ছাপ। শেষের ব্যঞ্জনায় পাঠক খুঁজে পায় চরম উৎকর্ষতা। গল্পের এই নাটকীয় সমাপ্তি অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। সর্বসাকুল্যে বলা যায়- একটি সুন্দর সমাপ্তিই পারে একটি সার্থক গল্পের ইতি টানতে।
বইটি পাঠককে নতুন জগতের সন্ধান দেবে। ‘কয়েকটি ডানাকাটা প্রজাপতির উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে সাহিত্যকাল প্রকাশন। প্রচ্ছদ এঁকেছেন মোজাম্মেল প্রধান। মূল্য ১৩০ টাকা। বইটি পাওয়া যাচ্ছে একুশে বইমেলার ১১৬ নম্বর স্টলে।
বাংলাদেশ সময়: ১৪৫৩ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৩
সম্পাদনা: আসিফ আজিজ, নিউজরুম এডিটর