 |
| ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
চট্টগ্রাম: জামায়াত ইসলামীর ডাকা হরতালে সাড়া মেলেনি চট্টগ্রামবাসীর। সোমবার হরতাল চলাকালে বন্দরনগরীতে যানবাহন চলাচল ছিল অনেকটাই স্বাভাবিক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্কুল-কলেজসহ অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা ছিল।
নগরীতে দোকানপাটসহ অধিকাংশ ছোটখাট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভোরে বন্ধ থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে সেগুলো খুলে দেয়া হয়। এর ফলে মানুষের জীবনযাত্রাও ছিল প্রায় স্বাভাবিক। বিশেষত দুপুর থেকে নগরীতে হরতালের কোন প্রভাবই ছিলনা।
এদিকে হরতালে পিকেটিংয়ের চেষ্টাকালে নগরীতে ৯ জনকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে কোতয়ালী থানার সিরাজউদ্দৌলা রোড থেকে সরকারী হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ শিবিরের সভাপতি নাসির উদ্দিনসহ দু`জনকে আটক করে পুলিশ।
এরপর দুপুরে চট্টগ্রাম সরকারী কলেজের সামনে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা তিনটি গাড়ি ভাংচুর করে। এরপর পুলিশ ওই কলেজের ছাত্রাবাসে তল্লাশি চালিয়ে ৭ জনকে আটক করেন।
নগর পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো.মিজানুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, `হরতালে পিকেটিংয়ের জন্য শুধুমাত্র কোতয়ালী থানায় ৯ জনকে আটক করা হয়েছে। এর বাইরে নগরীর অন্য কোন থানায় আটকের কোন খবর পাওয়া যায়নি।`
এদিকে হরতাল ডাকলেও সোমবার জোরালোভাবে মাঠে নামেনি জামায়াত-শিবির। হরতালের সমর্থনে তারা হাতেগোণা কয়েকটি জায়গায় ঝটিকা মিছিল করেছে।
অন্যদিকে হরতাল প্রতিহত করতে মাঠে সক্রিয় আছেন গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সোমবার সকাল ১০টা থেকে নগরীর প্রেসক্লাব চত্বরে গণজাগরণ মঞ্চে গণ অবস্থান কর্মসূচী চলছে। মিছিলে, শ্লোগানে মুখর হয়ে আছে জামালখানসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকা।
মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনাল বাতিল, সম্প্রতি কক্সবাজারে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত তিনজনকে শিবির কর্মী দাবি করে ওই ঘটনার প্রতিবাদে জামায়াত ইসলামী এ হরতালের ডাক দেয়।
হরতাল শুরুর পর নগরী কিংবা জেলার কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। সকালে নগরীর ডিসি হিল এলাকায় ঝটিকা মিছিল বের করে পটকা ফাটিয়ে আতংক সৃষ্টি করে শিবির। এছাড়া মুরাদপুর, সিরাজউদ্দৌলা রোড এবং সিইপিজেড এলাকায় তারা টায়ার জ্বালিয়ে আতংক সৃষ্টির চেষ্টা করেছে।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) মোস্তাক আহমেদ বাংলানিউজকে জানান, সিরাজউদ্দৌলা রোডে টায়ার জ্বালিয়ে আতংক সৃষ্টির সময় শিবির নেতা নাসির উদ্দিন ও রশিদকে আটক করা হয়েছে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, হরতালের মধ্যে নগরীতে রিক্সা, অটোরিক্সা, হিউম্যান হলারসহ বিভিন্ন গণপরিবহন চলাচল করছে। কিছু কিছু এলাকায় গণপরিবহনের সংখ্যা কম থাকলেও অধিকাংশ এলাকায় যানবাহন চলাচলে হরতালের কোন প্রভাবই চোখে পড়েনি।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (পশ্চিম) আরেফিন জুয়েল বাংলানিউজকে বলেন, `গণপরিবহনের সঙ্গে ট্রাকও চলাচল করেছে। পিকেটাররা চোরাগোপ্তাভাবে মিছিল কিংবা টায়ার জ্বালানোর চেষ্টা করলেও ভাংচুর-অগ্নিসংযোগের কোন খবর পাওয়া যায়নি।`
নগরীতে যানবাহন চললেও দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ আছে বলে বাংলানিউজকে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। নগরীতে দূরপাল্লার যানবাহনের কাউন্টারগুলোও বন্ধ দেখা গেছে। তবে ট্রেন ও বিমান চলাচল স্বাভাবিক ছিল।
হরতালে নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাশ চলতে দেখা গেছে। নগরীর সেন্টপ্লাসিড উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, প্লে গ্রুপ থেকে দশম শ্রেণী প্রত্যেক ক্লাশে পাঠদান চলছে। তবে উপস্থিতির সংখ্যা কিছুটা কম বলে জানিয়েছেন ওই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মন্ত্রজয় ত্রিপুরা।
তিনি বাংলানিউজকে বলেন, `আগে কোনদিন হরতালে আমরা স্কুল খোলা রাখিনি। কিন্তু এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে আদেশ দিয়েছে, আমরা সেটা মেনে ক্লাশ নিচ্ছি।`
ওই স্কুলের দশম শ্রেণীর বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র অয়ন মজুমদার বাংলানিউজকে বলেন, `আমি সদরঘাট থেকে রিক্সায় করে এসেছি। হরতাল হলেও আমাদের শিক্ষকরা আমাদের ক্লাশ নিচ্ছেন, এটা আমাদের ভাল লাগছে।`
নগরীর সেন্ট স্কলাস্টিকা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়েও ক্লাশ চলতে দেখা গেছে। ওই স্কুলের সিনিয়র শিক্ষিকা বৃজেট ডায়াস বাংলানিউজকে বলেন, `আমরা জনগণের পক্ষে। জনগণ হরতাল প্রত্যাখানের যে আহ্বান জানিয়েছে, তার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আমরা স্কুল খোলা রেখেছি।`
নগরীর জুবিলী রোডে মেমন গ্রামার স্কুলে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে প্রত্যেক শ্রেণীতে পাঠদান চলছে। স্কুলের অধ্যক্ষ সৈয়দা সেলিমা আক্তার বাংলানিউজকে বলেন, `আগের হরতালে স্কুল বন্ধ রাখতে হত। এখন পরিস্থিতি বুঝে স্কুল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।`
মেমন গ্রামার স্কুলের শিক্ষিকা রনি দাশ বাংলানিউজকে বলেন, `স্কুল খোলা থাকায় আমরা টিচাররা সবাই উপস্থিত আছি। কিছুটা কম হলেও শিক্ষার্থীরাও সবাই উপস্থিত আছে।`
এদিকে হরতালের আগে রোববার রাতে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ককটেল ফাটিয়ে, টায়ার জ্বালিয়ে ব্যাপক আতংক সৃষ্টি করে সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচী পালনের জন্য সমালোচিত এ দলটি।
হরতালে সহিংসতা মোকাবেলায় নগরীতে ব্যাপকভাবে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে বলে বাংলানিউজকে জানিয়েছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) মোস্তাক আহমেদ।
তিনি বাংলানিউজকে জানান, নগরীর অর্ধশতাধিক পয়েণ্টে কমপক্ষে দেড় হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন আছে।
এদিকে হরতালের মধ্যে নগরীর প্রায় সব বেসরকারী কলকারখানা, শিল্প প্রতিষ্ঠান খোলা ছিল। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরাও যথারীতি কাজে যোগ দিয়েছেন। সিইপিজেডের সব কারখানাও যথারীতি খোলা ছিল। নগরীতে সব সরকারী অফিস-আদালত খোলা ছিল।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, হরতালের মধ্যে বন্দরের বিভিন্ন জেটি এবং বহির্নোঙ্গরে জাহাজ থেকে পণ্য উঠানামা স্বাভাবিক ছিল। পণ্য নিয়ে মাঝে মাঝে কিছু পরিবহনও বন্দর থেকে বের হয়েছে। তবে দুপুরের পর পণ্যবোঝাই পরিবহন স্বাভাবিকভাবেই বন্দর ছেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ সময়: ০৬১০ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ১৮,২০১৩
এসজি/এমইউ/আরডিজি/টিসি