 |
সিলেট: সিলেটের জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ দিয়ে বয়ে যাওয়া সারী নদীর উজানে বাধ দিচ্ছে ভারত। জৈন্তিয়া হিল ডিস্ট্রিকের মাইনথ্রু (Myntdu) নদীতে বাঁধ নির্মাণের কাজও প্রায় শেষ করে এনেছে তারা।
এর ফলে সিলেট অঞ্চলের পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীবন ও প্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদীরা।
জানা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে এ বাঁধ নির্মাণ করছে ভারত সরকার। মোট ৩টি ইউনিটে ১২৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
প্রথম ইউনিটটি চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই অনানুষ্ঠানিকভাবে চালু করার কথা। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে ডাউকি চ্যুতির কাছাকাছি মাইন থ্রু ‘লেসাকা হাইড্রো ইলেকট্রিক ড্যাম’ এর অবস্থান। প্রকল্পটি মাইন থ্রু, লামু ও উমসরিয়াং নদী ত্রয়ের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত।
এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে- মেঘালয়ের জৈন্তিয়া হিল ডিস্ট্রিক্টের আমলারিম বাঁকের পাহাড়ি খরস্রোতা মাইনথ্রু নদীর উপর ৬৩ মিটার উঁচু বাঁধ নির্মাণ।
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালাম ২০০২ সালের ২৫ অক্টোবর মাইনথ্রু লেসাকা প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তুর স্থাপন করেছিলেন।
সারী নদী সিলেটের জৈন্তাপুরের লালাখাল নামক স্থান দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। মেঘালয়ের পর্বতে এটির উৎসস্থল। পরে পুরো জৈন্তিয়া হিল ডিস্ট্রিক্ট ঘুরে সারী নাম ধারণ করে বাংলাদেশে ঢোকে নদীটি।
উৎসস্থল থেকে বাংলাদেশের সীমান্ত পর্যন্ত এটি ’মাইনথ্রু’(গুহঃফঁ) নদী নামেই পরিচিত।
খাসিয়া মাইনথ্রু নামটি ভারতীয় সরকারি দলিল নথিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। সারী নদী পরবর্তীতে কুইগাঙ নামক উপনদীর সঙ্গে মিলে গোয়াইন নাম ধারণ করে গোয়াইনঘাট সদর হয়ে সিলেট সদর সীমান্তে চেঙের খাল নামে সদরের কয়েকটি ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ছাতকে সুরমা নদীর সঙ্গে মিলেছে।
প্রায় শতাধিক ছোট বড় খাল ও নদী এর সঙ্গে মিশেছে। অনেকগুলো হাওর ও বিল প্রত্যক্ষভাবে এর সঙ্গে জড়িত। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ১৪২০ মিটার উঁচুতে এর উৎসস্থল অবস্থিত।
মাইনথ্রু (গুহঃফঁ) নদী মেঘালয়ের জোয়াই ও পার্শ্ববর্তী জনপদের মানুষদের কাছে আশীর্বাদস্বরূপ। তাদের কাছে এটি পরিচিত ‘কধ ঞধধিরধৎ কধ ঞধশধহ’ বলে। এর অর্থ আমাদের মহান ফেরেশতা।
অনাদিকাল থেকে এটি তাদের শহর ও জনপদের রক্ষক হিসেবে বিবেচিত হয়। এজন্য নদীটি বিভিন্ন উৎসব ও পার্বণের মাধ্যমে সর্বদা সম্মানিত ও পূজিত হয়। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ এ নদীর পানিই জোয়াই এ সরবরাহ করে। বিস্তৃত এলাকার চাষাবাদের অনুঘটক হচ্ছে এ নদীর পানি।
দেখা গেছে, ভারতের মতো বাংলাদেশের মানুষের কাছেও সারী নদীর গুরুত্ব অনেক বেশি। আনুষ্ঠানিকভাবে পূজা দেওয়া না হলেও মানুষের হৃদয় ও অস্তিত্বে এটি পূজনীয়। আবহমান কাল থেকেই এ নদীর স্বচ্ছ ও বিশুদ্ধপানি মানুষের তৃষ্ণা নিবারণ করে আসছে।
দৈনন্দিন গার্হস্থ্য কাজের জন্য এ নদীর ওপর নির্ভরশীল বিশাল অংশের মানুষ। প্রাক ব্রিটিশ আমলে এ নদীই ছিল যোগাযোগের একমাত্র পথ। বর্তমানেও পাথর, বালু, কৃষি পণ্য প্রভৃতি পরিবহনের ক্ষেত্রে এ নদী ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে।
জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জের সম্পূর্ণ ও সদরের একাংশের কৃষিকাজ সম্পূর্ণভাবে এ নদীর উপর নির্ভরশীল।
বর্ষার ভরা যৌবনে বয়ে আসা পলি এ জনপদের মাটিকে করে উর্বর, সুফলা। খরার সময়ে এ নদীর পানিই মানুষের প্রয়োজন মেটায়।
প্রাকৃতিক ও মৎস্য সম্পদের ক্ষেত্রেও সারী নদীর দান অপরিসীম।
বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো মানের বালির প্রধান উৎস হচ্ছে এ নদী। ‘সারীর বালি’ নামে খ্যাত এ বালির অফুরন্ত ভাণ্ডর এ নদী। সারা বছরই এখান থেকে বিরতিহীনভাবে বালি সংগ্রহ করা হয়। যা শুধু সিলেটের নয়, সারা দেশের প্রয়োজন মেটায়।
কয়েক হাজার মানুষের জীবন ও জীবিকা এ বালুর উপর নির্ভরশীল। প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব সরকারের ভাণ্ডারে জমা হয়।
অন্যদিকে, স্থানীয় প্রজাতির মাছের অবাধ প্রজননক্ষেত্র সারী নদী।
স্থানীয়রা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, স্বতন্ত্র প্রজাতির কিছু মাছ শুধু এ নদীতেই বসবাস করে। এখানকার মানুষের মাছের চাহিদা যুগ যুগ ধরে এ নদীই পুরণ করে আসছে। এ নদীর সঙ্গে সম্পৃক্ত শাখানদী, খাল ও অসংখ্য বিল হাওরের ইকোসিস্টেম ও জীব-বৈচিত্র্য এ নদীর উপরই নির্ভরশীল। অসংখ্য স্থানীয় প্রজাতির গুল্ম, লতা উদ্ভিদ এবং জলজ ও উভচর প্রাণির অস্তিত্ব এ নদীর সঙ্গে জড়িত।
তাই সারী নদীর উজানে বাঁধ হলে সিলেটের একটি বিশাল অংশের ভূ-প্রকৃতি, পরিবেশ- প্রতিবেশ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা তথা অস্তিত্বের সংকটের মুখে পড়বে এমন আশঙ্কা সিলেটবাসীর।
কারণ বাঁধের কারণে জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও সদরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। বর্ষাকালে বাঁধের অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিলে আকস্মিক বন্যা ও ঢল পুরো জনপদকে ওলট-পালট করে দেবে।
জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ও প্রাকৃতিক ছন্দপ্রবাহ বিনষ্টের কারণে বিল, হাওর, বাওর, খাল ও নদীর প্রাণিবৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে।
মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস ও ইকোসিস্টেম নষ্ট হবে। এতে জলচর প্রাণী লুপ্ত হবে যেমন, তেমনি তাদের উপর নির্ভশীল পরিযায়ী পাখীরাও হারাবে তাদের খাদ্য উৎস।
সারী নদী কেন্দ্রিক যে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, বাঁধের কারণে তাও ধ্বংস হয়ে যাবে। সারীর উচ্চমানের বালু আর পাওয়া যাবেনা। এতে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বে এবং এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত শত শত পরিবার পথে বসবে।
কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে সরকার। নদীপথ ধ্বংসের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়বে ও মাঝি মাল্লাদের জীবন হবে দুর্বিষহ। হাজার হাজার জেলের পরিবার পথে বসবে; ফসলি জমি ধ্বংসের কারণে প্রত্যাশিত ফসল না পাওয়ায় খাদ্যাভাব দেখা দেবে।
বাংলাদেশ সময়: ১৪৩১ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১১