ঢাকা: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সভাপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর মো. রকিবুর রহমানকে ঘিরে পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বেশ আশার সঞ্চার হয়েছিল। তারা ভেবেছিল তৃতীয় বারের মতো ডিএসইর সভাপতি হয়ে তিনি পুঁজিবাজারের মহাধসকে মোকাবেলা করতে পারবেন।
একই সঙ্গে পুঁজিহারা বিনিয়োগকারীদের ভাগ্য উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা রাখবেন। তার দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আবার স্থিতিশীলতায় ফেরাবেন পুঁজিবাজারকে। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের সেই প্রত্যাশা ধীরে ধীরে হতাশায় রূপ নিতে শুরু করেছে।
রকিবুর রহমানের ওপর আর আস্থা রাখতে পারছেন না সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে অধিকাংশ বিনিয়োগকারী মন্তব্য করেছেন ‘যে লাউ, সেই কদু’।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, মো. রকিবুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় আড়াই মাস (৪৯ কার্যদিবস) পরও বাজার স্থিতিশীল করতে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনও পদক্ষেপ নিতে পারেন নি।
এ বিষয়ে শাকিল রিজভী সিকিউরিটিজে অ্যাকাউন্টধারী ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী মো. রেজাউল করিম বাংলানিউজকে বলেন, ‘তিনি (রকিবুর রহমান) দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা লাখ লাখ বিনিয়োগকারী ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু দুই মাস যেতে না যেতেই বাজারে সেই আগের অবস্থা বিরাজ করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তার প্রতি যে বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে বাজারে আবার সক্রিয় হয়েছিলাম সেই বিশ্বাস ও আস্থার জায়গাটি এখন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
সম্প্রতি বাজারের প্রধান গুজব কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাইকোর্টে রিট খারিজ হওয়ার পরও কেন বাজার নিম্নমুখী এমন এক প্রশ্নের জবাবে ডিএসইর সভাপতি মো. রকিবুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, ‘হাইকোর্ট রিট খারিজ করে দিয়েছে কিন্তু বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ বাড়ছে না। বড় বড় বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগে আগ্রহী নয়, তাই বাজার নিম্নমুখী।’
হাইকোর্ট রিট খারিজ করার পর কোন কোন পরিচালক তাদের পদ হারাচ্ছেন তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা উচিত ছিল।
পদ হারানো পরিচালকদের শেয়ার ধারণের বিষয়ে তিনি বলেন, যেহেতু পরিচালকরা নির্দিষ্ট সময়ে শেয়ার ধারণ করতে পারেননি। তাই যেসব পরিচালক পদে বহাল থাকতে এসইসির কাছে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করবেন। তাদের প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছিল সেটা ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুঁজিবাজার একটি সেনসিটিভ জায়গা। তাই বাজার একটু নিম্নগামী হলেই আস্থা নষ্ট করা উচিত না। ভাল কোম্পানির শেয়ার কিনলে একসময় লাভবান হওয়া যায়।
এদিকে, বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিএসইর সাধারণ সূচকের তেমন উন্নতি হয়নি। যদিও শুরুটা ছিল ভালই। নতুন সভাপতি আসার ৪৯ কার্যদিবসে ডিএসইর সাধারণ সূচক বেড়েছে মাত্র ৪০ পয়েন্ট।
মো. রকিবুর রহমান ডিএসইর সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন গত ১৮ মার্চ। সেদিন লেনদেন শেষে ডিএসইর সাধারণ সূচক ছিল ৪ হাজার ৬২৫ পয়েন্ট। ৪৯ কার্যদিবস পর অর্থাৎ গত ২৮ মে ডিএসইর সাধারণ সূচক দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬৪৫ পয়েন্ট। অর্থাৎ এ সময়ের মধ্যে সাধারণ সূচক বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ৪০ পয়েন্ট। তার এ সময়ের মধ্যে ডিএসইর সর্বোচ্চ সাধারণ সূচক দাঁড়ায় গত ১৭ এপ্রিল। এদিন লেনদেন শেষে সূচক দাঁড়ায় ৫ হাজার ৫০২ পয়েন্টে।
এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার ডিএসই ভবনের সামনে রেজওয়ান চৌধুরী নামের এক বিনিয়োগকারী তার অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, ‘১৯৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে রকিবুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। যে মামলার এখনও কোনও সুরাহা হয়নি।
২০১০ সালে শেয়ারবাজারে কারসাজির জন্য গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ইব্রাহীম খালেদের প্রতিবেদনেও তাকেই দায়ী করা হয়। এমনকি এসইসিকে রকিবুর সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। আর তাকেই আবার ডিএসইর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়েছে। তার কাছ থেকে একটি স্থিতিশীল বাজার আমরা কখনই প্রত্যাশা করতে পারি না।’
তিনি আরও বলেন, তার দায়িত্ব নেওয়ার পর লোক দেখানোর জন্য ডিএসইর সাধারণ সূচক কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়েছে। যেটা ছিল একটা ফাঁদ। আর আমাদের মতো সাধারণ বিনিয়োগকারী তার ফাঁদে পা দিয়ে সবকিছু হারাতে বসেছি।
অন্যদিকে, বাজার বিশ্লেষকরা মনে করে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার গুজব নির্ভর হওয়ার এখানে সিন্ডিকেট খুবই সক্রিয়। তারা বাজার থেকে ফায়দা লুটতে ধসের বাজারে কম দামে শেয়ার কিনে রাখে। তারপর বাজার যখন একটু ঊর্ধ্বমুখী হয় তখন ওই শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বেরিয়ে আসে।
অপরদিকে ঊর্ধ্বমুখী বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও কোনও কিছু বিবেচনা না করে শেয়ার কেনে। ফলে বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তারা আরও বলেন, বাজারে গুজব রটনাকারী যে সিন্ডিকেট রয়েছে তাদের দমন করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পক্ষ থেকে আজও তেমন কার্যকরী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
বাজার বিশ্লেষকরা বলেন, বাজার থেকে লাভবান হতে হলে কারও কথায় কান না দিয়ে কোম্পানির পূর্বের কয়েক বছরের পারফরমেন্স দেখে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ করা উচিত।
সম্প্রতি পরিচালকদের শেয়ার ধারণের বিষয়ে এসইসির প্রজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে যে রিট হয়েছে তার খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট। হাইকোর্ট যেহেতু রিট খারিজ করে দিয়েছে তাই যাদের কাছে নূন্যতম ২ শতাংশ ও সমষ্টিগতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার নেই, তারা নিয়ম অনুযায়ী পরিচালক পদ হারাবেন।
পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান-উর-রশিদ বাংলানিউজকে বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা অনেক আশা নিয়ে এই বাজারে আবারও সক্রিয় হয়েছিল। কিন্তু বাজারে এখন কি হচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে না। অতীতে বিনিয়োগকারীদের পক্ষে আন্দোলন করেছি। ভবিষ্যতেও যদি বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতি কোনও আঘাত আসে তবে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করবো।’
বাংলাদেশ সময় : ১৩৩৮ ঘণ্টা, মে ২৯, ২০১২
এসএনএইচ/সম্পাদনা: নজরুল ইসলাম, নিউজরুম এডিটর; নূরনবী সিদ্দিক সুইন, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর