জন্মগ্রহণের পর একটি ধ্রুব সত্য সবার জন্য নিশ্চিত। কেউ জানে না কে বড় হয়ে কি হবে? কে হবে ডাক্তার, কে সাংবাদিক বা কে হবে ফিল্মমেকার।
কেউ জানে না কার নিবাস হবে কোথায়? আমি জীবনেও অস্ট্রেলিয়ার স্বপ্ন দেখিনি। আমেরিকাই ছিল আসল টান। সে টানের ভিসা যোগাড় করার জন্য মরিয়া হলেও এক সময় পাড়ি দিলাম প্রশান্ত পাড়ে। যে দেশে অভিবাসী হবার টেস্টে কোয়ালিফাই করার পরও সে দেশটির রাজধানী যে ক্যানবেরা তা নিয়ে সংশয় ছিল; আধো চেনা অনেক অচেনা এই দেশটিতে জীবনের এতগুলো বছর কাটবে এ ছিল স্বপ্নাতীত। আমাদের মত ছোট খাটো মানুষের কথা থাক। যারা পালাক্রমে বাংলাদেশ শাসন করেন তারাও কি জানতেন
একাধিকবার দেশ শাসন করবেন? পুরো পরিবার সমেত বঙ্গবন্ধুর তিরোধান ও শেখ হাসিনার আগমন স্বপ্নের চেয়েও বিস্ময়ের। একইভাবে জিয়ার আকস্মিক বিদায় গৃহবধূ খালেদার প্রধানমন্ত্রিত্ব আরব্য রজনীর গল্পের চেয়েও শিহরণ জাগানিয়া। ঠিক তেমনি লাখো যোগ্য বাঙালি আছেন বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। তা যে যেখানেই থাকুক না কেন, জীবনের পাশাপাশি আরেকটি সত্য মাথা নিচু করে ছায়ার মত সবাইকে অনুসরণ করে চলেছে তার নাম মৃত্যু।
আমি আশাবাদী মানুষ। জীবনমুখি মানুষ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুকে বলেছেন ``মরণ রে তুঁহু মম শ্যাম সমান"। অসাধারণ অভিব্যক্তি। শ্যামের বাঁশির ফুঁ শুনে বিরহিনী রাধিকা ঘরে থাকতে পারতেন না। কূল মান ইজ্জতের বালাই ছেড়ে ছুটতেন। মানুষের জীবনও কি তা-ই নয়? বাঁশী বাজলেই দে ছুট দে ছুট। পিছনে পড়ে রইল সংসার রাজ্যপাট সন্তান সম্পদ,
আধুনিক কবি অবশ্য বলতেন "যেতে পারি কিন্তু কেন যাব?" তাঁর অভিপ্রায় ‘যাবার আগে সন্তানের গালে একটি চুমু খাব’। তারপরও শক্তিকে আগুনেই যেতে হয়েছে। হুমায়ূন আছেন মাটির বিছানায়।
না, আমি মৃত্যুর কথা বলতে আসি নি। আমি বলছি জন্মদিনের কথা . কবিগুরু তাঁর জন্মদিনে নিজেই লিখেছেন `আজি মম জন্মদিন"। রিক্ততার বুক চিরে আপনারে উন্মোচনের অপার আগ্রহ ছিল তাঁর। আমাদের? আমরা আসলে কি চাই? এ লেখা যখন লিখছি তখন আমি যে কোন বাঙালির গড় আয়ুর শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। ৫৪ বছর কোনো অল্প সময় নয়। এই বয়সে
বঙ্গবন্ধু একটি স্বাধীন দেশ দিয়ে গেছেন। খ্যাতিমান মানুষেরা এই বয়সের আগেই দুনিয়াকে বদলে দিয়েছেন। মহানবীর নবুয়ত প্রাপ্তি বা কলম্বাসের আমেরিকা বিজয়ও এর আগে। ফলে জন্মদিনের ভাবনায় কিছুটা দুঃখ আর বেদনা থাকবেই। নিজের দিকে তাকিয়ে মনে হয় "আমার জনম গেল বৃথা কাজে/ আমি কাটানু দিন ঘরের মাঝে/ তুমি বৃথাই আমায় শক্তি দিলে শক্তিদাতা"।
আমরা এমন এক দেশের মানুষ যে দেশে মানুষের মৃত্যু ও আমাদের একত্রিত করে না। বিভেদ আর মানা না মানার কঠিন বাস্তবতায় জন্ম আমাদের। যে জাতি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বংগবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধকে একত্রে মানে না সে মানবে আমাকে? আমার মত তুচ্ছ মানুষকে? নৈব নৈব চ: মানার মত কি কাজ করেছি আমরা? নিজের ভালো আর নিজেদের প্রতি সুবিচার ব্যতীত কিছু করিনি।
তারপর ও মনে হয় অপমানের কাঁটায় ঘেরা জীবনের ফুল পাহারা দিতে দিতেই জীবন পাড়ি দিতে হবে। সংসারে ব্যর্থ মানুষের দায় ভালো করা বাজার করতে না পারার গ্লানি বিত্ত-বৈভবের প্রতি টানের অভাবে অপমান। অপমান সয়েছি সংখ্যালঘু পরিবারে জন্মাবার কারণেও। ভাবলাম দেশ ছাড়লেই তার সমাধান। ভুল, এখন অপমানিত হই কখনো দেশের পরিচয়ে কখনো বা বর্ণ প্রথায় এশিয়ান বলে।
তাতে কি? আমি জীবনকে কখনো অপমান গায়ে মাখতে দিইনি। যেসব মানুষ আঁধার তাড়িয়ে আলো হয়ে আছেন তাঁদের উজ্জ্বলতা ধার করে সব ধুয়ে মুছে সাফ করে রাখি। একটাই জীবন আমাদের।
এই জীবনে দেশ আর পৃথিবীর প্রতি আনুগত্য থাকলেই মানুষ ভালো থাকতে পারে। সংসার আর কর্মের মাঝে দেশ যদি মা হয়ে থাকেন তবেই শান্তি। আমি সে শান্তি পারাবারের যাত্রী, আমার মত তুচ্ছ মানুষকেও বাংলাদেশ ফিরিয়ে দেয় না। শত বিপদে মায়ের মত আগলে রাখে। মন খারাপে ভালোবাসে। আজ যখন মা-বাবা-গুরুজনহীন তখনো সে আপন হয়ে ধরা দেয়। আমরা যেন তার কল্যাণে জীবনপাত করতে পারি। এর চে বড় আর কি প্রার্থনা হতে পারে, আমি অন্তত জানি না। আমার সৌভাগ্য আমি বাংলাদেশে জন্মেছিলাম, মায়ার দেশে। মানুষের দেশে। ভালোবাসার দেশে। সে দেশেই যেন দহন দানে ফিরতে পারি।
অজয় দাশগুপ্ত, সিডনি প্রবাসী সাংবাদিক
dasguptaajoy@hotmail.com
বাংলাদেশ সময় ১০২২ ঘণ্টা, জানুয়ারি ০৮, ২০১২
এমএমকে; সম্পাদনা: জুয়েল মাজহার, কনসাল্ট্যান্ট এডিটর