 |
| ছবি: দেলোয়ার হোসেন বাদল ও সুমন্ত চক্রবর্তী |
চালা ওয়েল ফেয়ার ক্লাব মাঠ (কাপাসিয়া) থেকে: বেঈমান, দুর্নীতিবাজ ও হত্যাকারীদের দল বলে আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করার আহবান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
শনিবার বিকেলে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ঘাগটিয়া চালা ওয়েলফেয়ার ক্লাব মাঠে আয়োজিত জনসভায় দেওয়া প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ আহবান জানান।
মূলত সাংসদ পদ থেকে সোহেল তাজ পদত্যাগ করার পর আগামী উপ- নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী ব্রিগেডিয়ার (অব.) হান্নান শাহর পক্ষে ভোট চাইতেই এ জনসভা আয়োজন করা হয়।
তবে ভোট ছাড়াও সমসাময়িক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরার পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের কড়া সমালোচনা করেন বিরোধী দলের নেতা।
বিএনপি আমলের উন্নয়নের নাতিদীর্ঘ ফিরিস্তিও তুলে ধরেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
``দেশের মানুষ আজ আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করেছে`` বলে দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, `` একুশ বছর তাদের রাস্তায় ঘুরতে হয়েছে। জনগণের কাছে কান্নাকাটি করে ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু এবার তারা যা করেছে আগামী ৪২ বছরেও তাদের কেউ আর বিশ্বাস করবে না।``
খালেদা জিয়া বলেন, ``আওয়ামী লীগ একটি বেঈমান পার্টি, দুর্নীতিবাজ দল, হত্যাকারীদের দল। তাদের প্রতিহত করতে হবে।``
এ সময় ``আওয়ামী লীগের নীতি, ঘরে থাকলে খুন, বাইরে গেলে গুম`` এ কথা এখন তাদের লোকেরাই বলছে বলেও মন্তব্য করেন বিএনপি প্রধান।
র্যাব-পুলিশ ও গুণ্ডাদের দিয়ে সরকার একটি বাহিনী গঠন করেছে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, এরাই গুম হত্যার ঘটনা ঘটাচ্ছে। ইলিয়াস আলীকেও তারাই গুম করেছে এমন অভিযোগ করেন খালেদা জিয়া।
র্যাব-পুলিশের প্রতি হুশিঁয়ারি উচ্চারণ করে খালেদা জিয়া বলেন, ``এই সরকারের মেয়াদ আর মাত্র কয়দিন, তখন র্যাবকে রক্ষা করবে কে?``
তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এইসব র্যাব-পুলিশ সবারই বিচার হবে।``
``আওয়ামী লীগের ওপর এখন আর ভারতের আশীর্বাদ নেই`` বলে মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, ``তাদের একটাই ভরসা ছিলো ভারত। কিন্তু ভারতও এখন তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। প্রণব মুখার্জি বলে গেছেন, তার দেশ সব দলের সঙ্গেই সুসম্পর্ক গড়তে চায়।``
ভারতীয় অর্থমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের সময় তার সঙ্গে আলোচনায়ও কোনো একক দলের প্রতি ভারতের কোনো বিশেষ আগ্রহ নেই এমনটাই জানান বলে জনসভায় উল্লেখ করেন খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়া বলেন, ``এ সরকার পরিবর্তন করতে হবে। তা সম্ভব হবে ভোটের মাধ্যমে।”
তিনি বলেন, ``আমরা বলেছি, আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। কারণ, কেবল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নিরপেক্ষ ভোট হওয়া সম্ভব।``
কাপাসিয়াবাসীর কাছে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আসম হান্নান শাহ’র পক্ষে ভোট চেয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ``আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছি, দরিদ্র থাকার জন্য নয়। আমরা ক্ষমতায় গেলে দেশকে উন্নত করবো। ``
বিএনপিকে আবারও ক্ষমতায় আনার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ৪০ মিনিটে বক্তব্য শেষ করেন খালেদা জিয়া।
এতে তিনি আরো বলেন, ``এ সরকার বাইরের দেশ থেকে ঋণ নিচ্ছে। আবার দেশের মধ্যে নতুন নতুন ব্যাংক খুলছে। এসব ব্যাংকের টাকা কোথা থেকে আসছে? আসলে শেয়ারবাজারের লুট করা টাকায়ই এসব ব্যাংক হচ্ছে। আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় গেল এসব টাকার হিসাব চাইবে।``
``উন্নয়ন বিএনপি ক্ষমতায় এলেই হয়``-- এমন দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, ``সারাদেশে জনপথ, রাস্তাঘাট, মসজিদ-মাদ্রাসা সব বিএনপি’র অবদান।``
``তিন বছর ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ উন্নয়ন করেনি, লুটপাট করেছে`` উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, `` বিএনপি’র সময় যেসব শিল্প, কল-কারখানা ছিলো সেসবও বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ সরকার বিদ্যুৎ দিতে পারছে না। কুইক রেন্টালের নামে আত্মীয়-স্বজনকে পাওয়ার স্টেশন করার সুযোগ দিয়ে বিদ্যুৎ খাতে কোনো উন্নয়নই নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার।``
গ্যাসের দাম বৃদ্ধি ও সারের দাম বৃদ্ধির সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, ``এতে জনগণের দুর্ভোগই বেড়েছে।``
আওয়ামী লীগ কাউকে সম্মান দিতে জানে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ``নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অসম্মান করছে। আওয়ামী লীগ সুন্দর করে কথা বলতে পারে না, করে গালিগালাজ। তারা নোবেলজয়ীকে গালিগালাজ করে। আমাকে গালিগালাজ করে, কিন্তু যেখানে প্রয়োজন সেখানে কথা বলতে পারে না।``
‘এ সরকার ১৪ জন সাংবাদিককে হত্যা করেছে’ অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘সাগর-রুনি সরকারের দুর্নীতির খবর প্রকাশ করতে চেয়েছিল। তাই তাদের হত্যা করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়েছিলেন, কিন্তু খুনিদের শনাক্ত করতে পারেননি। খুনিদের তারা দেশের বাইরে পার করে দিয়েছে।’
খালেদা জিয়া বলেন, ‘সরকারের লোকেরা মানুষের বাড়ি, মসজিদ-মন্দির, দোকানপাট দখল করেছে। কোর্টে নিজেদের লোক বসিয়েছে। মন্ত্রী বস্তা ভর্তি টাকা নিয়ে গেছে। ড্রাইভার তথ্য ফাঁস করে দিতে পারে বলে নিখোঁজ করা হয়েছে। আর সেই মন্ত্রীকে বাঁচাতেই ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়েছে।”
খালেদা জিয়া বলেন, ‘ইলিয়াস আলী বলিষ্ঠ সংগঠক ছিলেন, তাই সরকার তাকে গুম করেছে।’
খালেদা বলেন, ‘প্রতিদিন সীমান্তে মানুষ খুন হচ্ছে। কিন্তু সরকারের প্রতিবাদ করার সাহস নেই। এই সরকার দুর্বল সরকার। ’
খালেদা জিয়া বলেন, ‘পদ্মা সেতুর কাজ শুরুর আগেই বিশ্বব্যাংক দুর্নীতি ধরে ফেলেছে। এই দুর্নীতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের লোকজন জড়িত। আমরা ক্ষমতায় গেলে গুম, খুন ও জঙ্গিবাদের রাজনীতি বন্ধ করে দেব। ক্ষমতায় গেলে কৃষিপণ্যের দাম নিশ্চিত করবো। বিদেশ থেকে নয়, দেশে উৎপাদন করে চাহিদা মেটাবো। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করবো।’
আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এ সরকারের আমলে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস শুরু হয়েছে। আমরা জঙ্গি ও সন্ত্রাসী নির্মূল করেছি।’
‘মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে এই সরকার ভালো সম্পর্ক রাখতে পারছে না।’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, কূটনৈতিক হত্যার বিচার হয়নি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমাদের লোক ফেরত আসছে। মালয়েশিয়া থেকেও লোক ফেরত আসা শুরু হয়েছে।’
স্থানীয় বিএনপি সভাপতি খলিলুল রহমানের সভাপতিত্বে জনসভায় বক্তব্য রাখেন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, সহসভাপতি আলতাফ হোসেন চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক এম এ মান্নান, শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, স্বেচছাসেবক দলের সভাপতি হাবিবউন নবী খান সোহেল, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, ছাত্রদল সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া প্রমুখ।
বাংলাদেশ সময়: ১৭৫৫ ঘণ্টা, মে ২০১২
সম্পাদনা: জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর;
জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর
Jewel_mazhar@yahoo.com