বান্দরবন থেকে ফিরে: কর্পোরেট সোস্যাল রেসপন্সিবিলিটির (সিএসআর) আড়ালে তামাক চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি)। শুধুমাত্র কোম্পানির তালিকাভুক্ত কয়েক’শ চাষীর মাঝে ‘দীপ্ত’ প্রকল্পের সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। অথচ পাহাড়ে অন্ধকার দূর করে আলো জ্বালানো হয়েছে বলে কোটি টাকা খরচে বিজ্ঞাপন প্রচার করেছে বিএটিবি। আইনের ফাঁক গলে এসব বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে কোম্পানির লোগো প্রচার করিয়ে নিচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূলত অন্য কোম্পানির চাষীদের আকৃষ্ট করতে এবং পত্রিকায় নিজেদের লোগো ব্যবহার করতেই এসব সোলার বিতরণ করছে বিএটিবি।
বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির ৪টি গ্রামের ৫৭৬টি পরিবারকে ‘দীপ্ত’ প্রকল্পের অধীনে সৌরবিদ্যুত দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএটিবি। হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে এ প্রকল্পের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুত সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে প্রচারণা চালালেও, দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র নিজ চাষীদের। এদের মধ্যে অনেক অবস্থাসম্পন্ন কৃষকও রয়েছেন।
তামাকচাষীরা জানান, ২০ ওয়াটের এ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে তিনটি বাতি জ্বালানো সম্ভব।
সূত্র জানিয়েছে, এ ধরনের একটি সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিএটিবি’র খরচ হয়েছে মাত্র ২৫ হাজার টাকা। অথচ বিজ্ঞাপনেই খরচ করেছে কোটি টাকার ওপর।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সাল থেকেই স্থানীয় র্কতাব্যক্তিদের সঙ্গে এ সৌরবিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য কথার্বাতা চালাতে থাকে বিএটিবি। এ ক্ষেত্রে পাড়ার হেডম্যান, উপজেলার বিভিন্ন সরকারি অফিসের কর্মকর্তা ও ব্যাবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে চাষীদের তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করার এ প্রকল্পের প্রচারণা করতে দেশের একটি বাংলা ও ইংরেজি দৈনিকে ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৫৭ লাখ টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দিয়েছে বিএটিবি।
দেশের ওই দু’টি দৈনিকে তিন দিন করে বিজ্ঞাপন দিয়েছে তারা।
জানা যায়, বাংলা পত্রিকাটিতে প্রথম পাতায় ৬৪ ইঞ্চি বিজ্ঞাপনের খরচ পড়েছে প্রতিদিন ১১ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। ইংরেজি দৈনিকটিতে প্রথম পাতায় ৬৪ ইঞ্চি বিজ্ঞাপনের জন্যে প্রতিদিন দিতে হয়েছে ৭ লাখ ৪ হাজার টাকা। দু’টি পত্রিকাতেই মোট ৫৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকার বিজ্ঞাপন দিয়েছে বিএটিবি।
তবে অন্যান্য পত্রিকার বিজ্ঞাপন মিলে এ অর্থের পরিমান কোটি টাকা ছাড়ায় বলে জানিয়েছে বিএটিবি সূত্র।
সরজমিন লামা উপজলোর রুপসীপাড়া ইউনয়িনের ১ নং ওয়ার্ডের বৌদ্ধভিটায় গিয়ে দেখা যায় সেখানে ১০০টি ঘরে সৌরবিদ্যুত দিয়েছে বিএটিবি। এই ১০০টি ঘর মাঝখানে রেখে চারদিকের জমিতে শুধেই তামাক ক্ষেত। কথা বলে জানা যায় সাত বা আট ঘর বাদ দিলে এ পাড়ার প্রায় প্রত্যেকটি ঘরের কৃষকই বিএটিবি’র চাষী।
একই গ্রামের পাশ্বর্বতী র্পূবাসর পাড়ার সলিম মিয়া ঢাকা টোবাকোর তালিকাভুক্ত চাষী। তিনি জানান, বৌদ্ধভিটায় একসঙ্গে সবচেয়ে বেশি বিএটিবি’র চাষী বাস করে। এ জন্যে ওই পাড়াতেই সৌরবিদ্যুত দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বৌদ্ধভিটার চাষীরা আমাদের জানিয়েছে আমাদের পাড়ার অনেকেই যদি একসঙ্গে বিএটিবি’র তালিকাভুক্ত হয়, তাহলে আগামীতে র্পূবাসরেও সৌরবিদ্যুত দেবে কোম্পানি।
একই প্রলোভনে আলীকদম উপজেলায় মহ্নলাপাড়াতেও সৌরবিদ্যুৎ দিয়েছে বিএটিবি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ পাড়ায় মূলত আদিবাসী তামাক চাষীদের বাস। এসব চাষীরা যেন স্থায়ীভাবেই বিএটিবি’র তালিকাভুক্ত থাকে সে প্রচেষ্টাতেই বিএটিবি’র এ কৌশল।
লামা থেকে আলীকদম যেতে হাতের ডানে মহ্নলাপাড়ায় ৫০ টির মতো বাড়িতে এ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হয়েছে।
লামা উপজেলা কৃষি র্কমর্কতা এনামুল হক বাংলানিউজকে জানান, ২০১২-১৩ অথবছরে উপজেলার ১০৭৫ হেক্টর জমিতে তামাকের চাষ হয়েছে। তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করার বিভিন্ন র্কমসূচি থাকলেও তামাক কোম্পানিগুলো কৃষকদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে নেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. সালেহউদ্দনি আহমদেরে কাছে জানতে চাইলে তিনি বাংলানউজকে বলেন, “তামাক কোম্পানি যেহেতু জনস্বার্থের জন্যে ক্ষতিকর তাই তাদের অবশ্যই সিএসআর’র মাধ্যমে ভালো কিছু করতে হবে। তবে তাদের সিএসআর’এ বাধা নেই। কিন্তু যদি সাধারণ মানুষের উপকারের কথা না ভেবে নিজেদের ব্যবসার প্রচারের কথা ভেবে কোনো কিছু করে তবে সেটা সিএসআর নয়।”
তিনি বলেন, “প্রশাসনকেও খেয়াল রাখতে হবে সিএসআর করার পেছনে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা রয়েছে কি না।”
কথা বলে তথ্য দেয়া হয় না জানালে, এ ব্যাপারে বিএটিবির প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা (জনসংযোগ) আনোয়ারুল আমিনের কাছে বিস্তারিত জানতে চেয়ে মেইল পাঠালেও, তার জবাব দেননি তিনি।
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন (২০০৫) ও সংশোধনী বিল ২০১৩ অনুযায়ী কোন সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির অংশ হিসেবে সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিলেও তামাক বা তামাকজাত দ্রব্যের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, সিল, সাইন, প্রতীক ব্যাবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এছাড়াও এ ধারার বিধান লংঘন করলে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই ধরনের অপরাধ ফের করলে দণ্ডও দ্বিগুন হারে হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ সমস্ত ধারা বজায় রেখে সংসদে উত্থাপিত বিলটি যদি পাশ করা হয়, তবে সিএসআর এর অজুহাতে তামাক কোম্পানির প্রচারণা চালানো এবং লোগো ব্যাবহার করে এসব বিজ্ঞাপন বন্ধ হবে বলে মত দিয়েছেন তামাক বিরোধী সংগঠনগুলো।
বাংলাদেশ সময় ১০০৬ ঘণ্টা, মার্চ ১৮, ২০১৩
এমএন/এমএমকে/ জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর