 |
মানুষের বোন
তুমি তো গাছ নও, মানুষের বোন
একবার দেহ থেকে ঝরে গেলে ফুল
আর বার ফুটবে না
স্বপ্নের বিপুল ভারে নুয়ে গেলে মাথা
আর বার উঠবে না— মনে রেখো—
তুমি তো গাছ নও, মানুষের বোন।
জমি
কতো বিঘা পৃথিবী তোমার
আমি দেহ লুকাবার এক-কবর ভূমি পাবো,
ধান পাবো না
জমিদার ধান পাবে, বৃষ্টির জল পাবে
আমি আকাশ, আকাশের সূর্য-তারা।
(পাখি হতে চেয়ে, গাছ হতে চেয়ে
এ-জন্ম আজ ডানা ও শিকড়হারা।)
তুমি জল-ফল সবই পাবে
আমি অবলোকনে শান্তিকে ছুঁয়ে ফিরে যাবো
পৃথিবীর মাটিঘেরা বাড়ি, তাতে ব্যাঙের সর্দি,
বিড়ালের পুত্রস্নেহ আর পাবো আত্মধিক্কার
কতো বিঘা পৃথিবী তোমার
আমি দেহ লুকাবার এক-কবর জমি পাবো
ভূমিদার ধান পাবে, আমি পেট ভরে ক্ষুধা!
ভাত পাবো না;
অবলোকনে রঙিন উড়ন্ত পতাকা পাবো
পা-তলে দেশ পাবো না।
গান
জলে যেমন পাখিদের স্নান
‘আমার সকল গান’ ছুঁয়ে গেছ উপর-উপর
ডুবে যাবে
সেই অবসর চাওনি নিজেই
অথচ প্রত্যেক গানে,
ভেবেছি ডুবে যাবে জলহাতি যেরকম ডুবে যায় গহিন সাগর
না
‘আমার সকল গান’ তুমি ছুঁয়ে গেছ উপর-উপর
ডুবে দেখোনি
কতশত গুহা তাতে গুহার ভিতর কতো আলো কতো অন্ধকার
পাখি তুমি
করে গেছ সংক্ষিপ্ত স্নান
ঝেড়ে ফেলে চলেও গেছো মাটি ছেড়ে ঐ উঁচু মেঘে
আকাশগঙ্গা পারে
‘আমার সকল গান’ ফেলে গেছ অবহেলে, বৃষ্টির জলে
গলিত ভুবন
রোদে পুড়ে তামা হতে হতে জলকে স্থান করে দিতে
উদ্গ্রীব হয়ে আছে মাটি
একদিন সব মাটি জল হয়ে গেলে, গলে যাবে তোমারও ভুবন
তখন কোথায় ফেলবে নোঙর আর কোথায় খুঁড়বে কবর
তুমিও কি গলে-গলে জল হবে, দেশ ভুলে হবে নিরুদ্দেশ
‘সূর্যের কৃপা কিংবা পাতাল সায়র থেকে চার ফোঁটা জলভিক্ষা’ ভেবে,
সেই মতো স্নান শেষে জলধিরে সন্দেহ করে গেছি বুঝিনি জলের অভিপ্রায়!
হয়তো একদিন সব মাটি জল হবে, গলে যাবে কবর
নোঙর ভেসে যাবে নিরুদ্দেশ জলে
পাগল
এক.
তাকে পাওয়া যায়নি কোথাও
সে এখন বর্ষাঘুমে দূর পাহাড়ে-গুহায়
হয়তো-বা সমুদ্রে জাহাজডুবি ঘটে গেছে
এবং সে তুলে আনছে মানুষের জীবন্ত চেহারা!
তাকে পাওয়া যায়নি কোথাও
সে এখন দুরবিন হাতে মেঘে বসে আছে
হয়তো-বা দেখে নিচ্ছে ছেলেখেলা!
(তাঁর স্মৃতি কেউ কেটে নিয়েছিলো বলে
ভুলে গেছে মা, ধর্ম এবং বাড়ি।)
দুই.
পৃথিবীর সন্তান, তোমাকে খুঁজতে আমি
এসেছি এই পাহাড়ের পাদদেশে, আদিবাসী গ্রামে;
তুমি ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে রাজপুরী চলে গেলে
আমি হারিয়ে ফেলি ছায়া, স্মৃতির নদীরূপে
কেউ আমার কণাগুলো হনন করে;
আমি বাঁচি একা হাজার বালিকার ভিড়ে
প্রেম এসে বিদ্ধ করে আমার স্বপ্নের বীজতলা।
স্বপ্নের পাহাড়
ওই যে এলোমেলো বনভূমি
অগোছালো ফকিরের বেশে পড়ে আছে লোকালয় ছেড়ে দূরে-
একদিন বীজতলা ছিলো পৃথিবীর প্রথম কৃষকের, যে-পুরুষ
মাটি কেটে জলকে নদীর নামে প্রবাহিত করেছিল দেশে দেশে।
কোনো এক কুক্ষণে
জরা ও ব্যাধিরূপে মৃত্যুর থাবা পড়ে গিয়েছিলো তার স্বপ্নের ঘাড়ে
এবং বীজতলা একা বেড়ে গেছে বনে
বহন করোনি তুমি তার উত্তর-অধিকার এবং না-জানো
বনগুলো বন নয় কারও স্বপ্নের পাহাড়!
পিতা ও পুত্র এবং হিংসুক বালিকা
Hell is other people. : Jean-Paul Sartre
বজ্র ও বৃষ্টির ভিতর পুত্র ও পিতা, বোঝা মাথায়, না-জানে কোথায় চলেছে
শুধু পৌঁছে যেতে হবে, জেনে, বজ্র ও বৃষ্টির ভিতর একটানা মেনে নিচ্ছে
জল ও আলোর প্রহার।
পিতা ও পুত্রের ‘পরে মেঘের আক্রোশ, কেউ নয়, নির্জন বালিকা এক
জানালায় চোখ রেখে, মানুষের ব্যথাগুলো, বৃষ্টিভেজা স্বপ্নের বোঝা দেখে ফেলে
আর গ্রামঘরে রটায় কুৎসা; পিতা ও পুত্রের প্রতি লাল চোখে দেখে জনতা,
ভাবে, বজ্র ও বৃষ্টিতে ওরা হেঁটে গেছে পাপ থেকে মুক্তি চেয়ে...
বৃষ্টি শেষ হলে পিতা-পুত্র খুঁজে পায় ফুলগাছ, মাছে ভরা নদী;
এবং বালিকা হিংসুক, স্বামীর মৃত্যু হলে ফিরে আসে মায়ের সংসারে,
জানালায় চোখ রাখে, দেখে, পিতা ও পুত্র হাঁটে রোদে, তারা প্রেমের কথা বলে!
আউটসাইডার
সমূল সন্ধ্যায় গান গায় আগন্তুক
জানে না এ-দেশে রাজা
মুকুট হারানোর ভয়ে পলাতক
দখলে নিয়েছে রাজ্য পাখি ও প্রজা।
কারও বেদনাই জানে না যে-লোক
সেই তবে আগন্তুক
দেশে দেশে মেঘের সদৃশ
যে কোনো আকাশে স্থির হয় ঝরে পড়ে
ফিরে যায় সঙ্গে নিয়ে নিরক্ষর বেদনার
বোবা হাহাকার!
লজ্জা
Death is the mother of beauty. : Wallace Stevens
মসজিদের উঁচু মিনার থেকে একদিন
লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়বে আমার
মৃত্যু-সংবাদ
ভাবতেই কেমন লজ্জা লাগছে!
কিন্তু এ-দেশে এটাই তো নিয়ম
খোলামেলা ভাবে প্রচার করা ‘কেউ নেই’ যাতে
তার প্রতি ধাবিত ছুরি ও চুম্বন
অন্যদিকে ঘুরে যেতে পারে
কিন্তু আমার লজ্জা
তুমি যদি জেনে ফেলো আমার এই
চিরপতনের খবর!
বিজয়িনীর হাসিটুকুও দেখার শক্তি নাই যার
সে কেমন পুরুষ বা প্রেমিক!!
আমি যদি একটু হলেও বেঁচে থাকতাম
সেদিন আমার মৃত্যুদিনে
তাহলে চোরের মতো নিঃশব্দ রাতে
সরে যেতাম এই বাড়িঘর ছেড়ে
তুমি আমার মৃত্যুর বাতাসও পেতে না
কিন্তু হায়!
মসজিদের উঁচু মিনার থেকে
একদিন লোকালয়ে ছড়িয়ে
পড়বে আমার
মৃত্যু-সংবাদ
কালের পুত্র
তুমি না কি কালের পুত্র
তোমার প্রতিভা থেকে আলো
হলুদ নদীর দেশে নেমে এলে
গাছের নীলাভ পাতা,
সোনালি গোলাপের বন
ভালো লেগে যাবে ওই
আদিবাসী মেয়েটির
নির্জন
তুমি না কি কালের পুত্র
তোমার প্রতিভা থেকে আলো
শহরের উপকণ্ঠে
নেমে এলে
গোলাপবালারা দেখি
কাতর মিনতি করে
‘কিনে নিয়ে ধন্য করো মানব
জীবন’
বাংলাদেশ সময় : ১৩১৭ ঘণ্টা, ২২ জানুয়ারি ২০১৩