 |
কানে ব্লুটুথ হেড ফোন লাগিয়ে দেশে প্রিয়জনের সাথে কথা বলছিলাম আর অফিসের দৈনন্দিন কাজ করছিলাম। এরই মাঝে অফিসের ল্যান্ড ফোনে একটা কল এলো। নাম্বারটা অপরিচিত হওয়ায় দেশে কথা বলাটাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে ল্যান্ডফোনের কলটি রিসিভ করলাম না। আবারো একই নাম্বার থেকে কল এলো; ভাবলাম জরুরি প্রয়োজনেই হয়তো কেউ বারবার কল দিচ্ছে। দেশের লাইনটা কেটে দিয়ে ল্যান্ডফোনের কলটি রিসিভ করলাম।
ফোন রিসিভ করার পর তার পরিচয় জানার প্রয়োজন হলো না। কারণ, ওপাশ থেকে যে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো সেটা আমার প্রিয়-চেনা স্বর। প্রবাসী জীবনের অনেকটা সময় তার সাথে কেটেছে, তার সাথে শেয়ার করেছি নিজের অনেক অভিজ্ঞতা এবং আমি হয়েছি তার সুখ-দুঃখের অংশীদার। কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতেই বললেন, খুব বেশি ভালো নেই। কারণ, হিসাবে তিনি যা বললেন তা সত্যি অবাক করার মতো। তাতে যা মনে হচ্ছে স্বাভাবিক আয়ের মানুষের সৌদি আরব থাকার সময় ফুরিয়ে এসেছে। একজন শ্রমিক মাসে ২হাজার ৫০০শত রিয়াল (৫০হাজার টাকা) বেতনের চাকরি করলেও নিজের থাকা খাওয়া এবং সংসারের নিত্যদিনের খরচ মিটিয়ে বছরে ১টাকাও সঞ্চয় করা সম্ভব নয়। আর যারা ১হাজার বা তার কিছু বেশি রিয়াল বেতনের চাকরি করে তাদের কথা বাদই দিলাম। আর তার একমাত্র কারণ হচ্ছে সৌদি সরকারের নতুন শ্রমনীতি। আগে একজন শ্রমিকের ইকামা নবায়ন বাবদ বার্ষিক খরচ হতো ৮০০রিয়াল মাত্র এখন সেখানে যাচ্ছে নয় থেকে দশ হাজার রিয়াল।
জানা যায়, সৌদি আরবের নতুন শ্রমনীতি অনুযায়ী একজন অভিবাসীকে তার ইকামা নবায়নের জন্য প্রতিবছর মক্তবে আমেল(লেবার অফিস)-এ ১হাজার ৫শত রিয়াল (আগে বছরে ১শত রিয়াল নেয়া হত), স্বাস্থ্য ইন্সুরেন্স ১হাজার ২শত রিয়াল (আগে ক্ষেত্র অনুযায়ী ৫/৬শত রিয়াল), ইকামা নবায়ন ফি ১হাজার ৬শত রিয়াল (আগে ৭শত পঞ্চাশ রিয়াল নেয়া হত) এবং যে সমস্ত শ্রমিক বাইরে কাজ করে তাদের নিজ নিজ কফিলকে ফায়দা (সুবাদা বা মাসোহারা) ৩ থেকে ৬হাজার রিয়াল পর্যন্ত দিতে হয়। এখানে দেখা যায়, একজন শ্রমিকের হাতে কাজ থাকুক আর নাই থাকুক তাকে বৈধভাবে এখানে থাকতে হলে বছরে ৯হাজার ২শত (২লাখ টাকা) যোগাড় করতেই হবে।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের যে দাম তাতে করে একজন শ্রমিকের বছরে বাড়তি ভাড়া দিতে হয় ন্যূন্যতম ১হাজার ৮শত রিয়াল (ব্যাচেলরদের জন্য), খাবার বাবদ নাস্তাসহ ৬হাজার রিয়াল, টেলিফোন বাবদ ২হাজার ৪শত রিয়াল খরচ হয়। আর যাদের ধূমপান এবং অন্যান্য বাজে অভ্যাস আছে তাদের হিসাব আলাদা।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, এখানে সুস্থতার সঙ্গে বৈধভাবে থাকতে হলে একজন শ্রমিককে বছরে ন্যূনতম ১৯হাজার ৪শত রিয়াল(৪লাখ ১২হাজার টাকা) খরচ করতে হয়। যদি তাই হয়, ধরে নিলাম একজন শ্রমিকের মাসিক বেতন ২হাজার ৫শত রিয়াল( ২৫০০রিয়াল বেতনের লোক সচরাচর চোখে পড়ে না) হিসাবে বছরে ৩০হাজার রিয়াল (৬লাখ ৪০হাজার টাকা) তার বার্ষিক আয়। সৌদি আরবে তার বার্ষিক ব্যয় ১৯হাজার ৪শত রিয়াল। দেশে যদি তার ছোট্ট একটা সংসার থাকে তাহলে তাকে সেখানে প্রতি মাসে কমপক্ষে ১৫থেকে ২০হাজার টাকা দিতে হয়। সেখানে তার নিজেরই তো বার্ষিক ব্যয় ১০হাজার রিয়ালের মতো। এখন দেখা যাচ্ছে একজন শ্রমিকের বার্ষিক ২৯হাজার রিয়ালের ওপরে পড়ে তার আবশ্যকীয় খরচ।
বিভিন্ন আপদ-বিপদের কথা বাদ দিলেও একজন মানুষ পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন ফেলে রেখে তপ্ত মরুভূমিতে হাড়-ভাঙ্গা খাটুনি খেটে বছরে ১০/২০হাজার টাকা সঞ্চয় করতে না পারলে তার ভবিষ্যৎ যে নিশ্চিত অন্ধকারে নিমজ্জিত সেটা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
সৌদি আরবে বিদেশি শ্রমিক বিরোধী নিত্য-নতুন নিয়ম বা আইনগুলো সকল দেশের নাগরিকদের জন্য করা হলেও বাংলাদেশি শ্রমিকরা তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ, অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের তুলনায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের বেতন সহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা কম। একই পদে চাকরিরত অন্যান্য দেশের শ্রমিকের বেতন যেখানে ২/৩হাজার রিয়াল সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকের বেতন এক থেকে দেড় হাজার রিয়ালের বেশি নয়। বিদেশে বাংলাদেশের ইমেজ সংকট এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ থাকার কারণেই এই সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন অভিজ্ঞ মহল।
সৌদি প্রশাসনের নতুন এই বর্ধিত ফির কথা শুনে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, একের পর এক নতুন নতুন নিয়ম আমাদের প্রবাসজীবনের ইতি টানার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর বাংলাদেশ সরকারও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, ভারত সরকার এই অতিরিক্ত ফি প্রত্যাহারের দাবিতে সৌদি আরবে লোক পাঠানো সাময়িক স্থগিত রেখেছে।
বাংলাদেশ সরকার সৌদি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রবাসীদের এই সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হবেন বলে আশা করছেন প্রবাসীরা।
লেখক: সৌদি আরব করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
বাংলাদেশ সময়: ১৪৪৬ ঘণ্টা, ১৮ নভেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা: একে; সম্পাদনা: জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com