 |
শাহবাগ ১
আজ তোমার চুলে শাহবাগের ঢেউ, গায়ে গৌরবের সৌরভ গন্ধঘ্রাণ
তোমার আঁচলে-ওড়নায় উড়ে শাহবাগের পতাকাবেলুন
তোমার অন্তরবাসে শাহবাগে পুস্পফুলের সুবাসসৌরভ
হাতের উষ্ণতায় শাহবাগের স্পর্শছোঁয়া, পায়ে শাহবাগের ধুলোমাটি
তোমার ষ্ট্যাথিস্কোপে শাহবাগের অস্থিরতা, চুয়াল্লিশে জাগরণের সুর
আর সারা শরীরে শাহবাগের জাগরণযৌবন, উচ্ছ্বলউচ্ছ্বাস চোখেমুখে।
তুমি তোমার রিক্সায় আমাকে সেই শাহবাগ নিয়ে যাও, শুধু শাহবাগ।
স্বপ্নের শাহবাগ গিয়ে আমি নিজেই আরেক শাহবাগ হয়ে যাবো,
শাহবাগ হয়ে আমি তোমার অস্তিত্বে মিশে যাবো একাত্তরের মতো।
শাহবাগ ২
শাহবাগের চোখে ঘুম নেই জেগে থাকে জাদুঘর, জেগে থাকে মন আর মোমবাতি।
অস্থিরতায় কবুতরের বাচ্চার মতো কাঁপে চারুকলার লিচুগাছের পাতা
পিজির শ্বাসকষ্ট, কুড়িগ্রামের মতো তির তির কাঁপছে শরীর
আর বারডেম নিজকে মনে করছে মানসিক রোগী।
ইলেক্ট্রিসিটি তারে ঝুলে আছে সমুদ্রকূলে শুটকি শুকানোর মতো হাজার হাজার মেহেরুনেসার মস্তক।
ফুলের দোকানগুলো এখন ঠাটারি বাজারের কসাইদের দখলে; আর্তনাদ করছে গরীব ফুলবিক্রেতা
তাদের পুস্পগুলো ফুল-বেলুন হয়ে উড়ে গেছে, হারিয়ে গেছে অনন্ত আকাশে।
পৃথিবীর বিলুপ্ত ভাষার মতো বোবা আমার আজিজ মার্কেট।
শাহবাগ ৩
শাহবাগ আমাকে শোনালো নীরবতার স্বরলিপি
শেখালো কি ভাবে জ্বালাতে হয় মনের মোমবাতি
আর দেখালো বেলুনে স্বপ্ন উড়ানো স্মৃতি, শান্তি।
সিলিংফ্যানে চুলে ঝুলানো সহোদরার মস্তক, খুন
সহোদর শাহবাগ দ্রোহে ঘুরে দাঁড়ালো প্রতিবাদে।
ছোট ভাই শেখালো, দেখালো আরেক একাত্তর।
শাহবাগ ৪
আজিজ মার্কেট আমাকে চিনলো না। মনে করলো- এ কোন আগন্তুকের আগমন? যে প্রিয় কাককে নিয়ে ছবি এঁকেছিলাম, বিদ্যুৎতার থেকে তারাও বিরক্ত প্রকাশে কা কা করে কুড়িয়ে খায় কাঁকড়, নেড়ি কুকুর ঘেউ ঘেউ ধমক দিয়ে রাস্তার রাজা হয়ে খুঁজতে থাকে পাগল। একটি মাইক্রোফোন আর টিভি ক্যামারাও ছুটলো তার পিছু পিছু!
শাহবাগ আমাকে চিনলো না! আমার চিরচেনা শহরে আমি অচেনা অতিথি? জোছনায় ভেজা, কামিনীফুলের সুবাস ছড়ানো নগরের অদ্ভূত সেই নম্র নির্জনতা-নিরিবিলিগুলো কোথায় যেনো হারিয়ে গেছে চাঙ্কার পুলের ইতিহাস মতো, মসলিনের মৃত্যু মতো। ঢাকা শহর ঢাকা পড়ে গেছে জটিলতায়। এ শহর আমার শহর নয়; অন্য কোনো নাড়ী!
ট্রাকের চাকার নিচে থেতলে থাকা চ্যাপ্টা বিড়ালের মতো খালঝিলগুলো নির্মিতব্য ভবনের পায়ের তলায় প্রত্নতত্ত্বের উপমায় বিলুপ্ত জীবন। আমার পায়ের শব্দে কেঁদে উঠলো খালঝিলের কংকাল। আর সেই সব হাইরাইজ বিল্ডিং আমাকে লিলিপুট ভেবে আকাশ থেকে তাকিয়ে উপহাসে মুচকি মুচকি হাসলো!
পুরুনো বিলবোর্ড চোখ ফিরিয়ে নিলো আর ডিজিটাল বিলবোর্ডও সন্দেহচিহ্ন চোখে রেখে পাল্টে ফেললো পরবর্তী স্লাইট। খালঝিলগুলো রাতদিন আড্ডা দেয়ার জায়গাগুলো এখন লীগদলের দখলে। আমরা সেখানে কবিতা পড়তাম, খালি পেটে চা খেতাম- সেই স্মৃতিগুলো পাখি হয়ে এলো, চলে গেলো অভিমানে।
আজিমপুরের কবরের মানুষগুলো এদের চেয়ে অনেক ভালো। তারা আমাকে চিনে স্বাগতম জানালো। কিন্তু পল্টনের মোড় চশমা খুলে তাকালো, না দেখার ভান করে চলে গেলো দোতলা বাস। যে লেটার প্রেসে হ্যান্ডকম্পোস করে আমরা লিটিল ম্যাগ করতাম, সেই প্রেস এখন আইসিসিইউতে নাকি কোমায় ঘুমিয়ে আছে।
ভ্রমণ কাহিনীর চরিত্রে নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হলো। মন খারাপ করে রমনা পার্কে ঢুকতেই গাছগাছালির পাতাগুলো নড়ে উঠলো। শীতল ছায়ায় জড়িয়ে নিলো ভাইগাছ, বোনগাছ। বিষণ্ণ মন মিশে গেলো বৃক্ষবন্ধুদের ভালোবাসায়।
বাংলাদেশ সময় : ১৩১৫ ঘণ্টা, ০৫ মার্চ ২০১৩
এমজেএফ