৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, মঙ্গলবার মে ২১, ২০১৩ ১০:০৮ এএম BDST banglanew24
08 Nov 2011   10:51:17 AM   Tuesday BdST
E-mail this

পরী, হুমায়ূন আহমেদ ও ঝরা পালকের স্মৃতি


ইকবাল হাসান
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
পরী, হুমায়ূন আহমেদ ও ঝরা পালকের স্মৃতি
হুমায়ূন আহমেদ (জন্ম ১৩ নভেম্বর ১৯৪৮)

প্রিয় পাঠক, প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি একজন বড় লেখকের কথা বলতে গিয়ে নিজের গল্প দিয়ে শুরু করার জন্যে। গল্পের নাম, দুঃখ কষ্টের গল্প। বাবাকে নিয়ে। মনে পড়ে, সারারাত জেগে, বলা যায়, একটানে গল্পটি লিখেছিলাম, আর লিখেই পরদিন দুপুরে দৈনিক বাংলায় কবি-সম্পাদক শ্রদ্ধেয় আহসান হাবীবের টেবিলের সামনে হাজির।

শুকনো মুখ আর চোখে নিদ্রাহীনতার কান্তি দেখে হয়তো মায়া হয়েছিল; হাবীব ভাই গল্পটি ছেপেছিলেন রবিবাসরীয় সাহিত্য পাতায়। দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত আমার প্রথম গল্প। অই গল্পের একটি চরিত্র টুনটুনি। পায়ে সমস্যার কারণে একটু বাঁকা হয়ে হাঁটা বাস্তব চরিত্র। হুমায়ূন আহমেদের ‘নন্দিত নরকে’ এবং‘শঙ্খনীল কারাগার’ পড়ে আমি, সত্যি বলতে কি, তরুণ বয়সে গল্পটি লিখতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম। কিংবা বলা যায় বাধ্য হয়েছিলাম। দুঃখ কষ্টের গল্প-এর জন্মের সুতিকাগারে এই শুভ্র-সত্যটি লুকিয়ে আছে। এখনো মাঝে মাঝে আমার মনোজগতে ভেসে ওঠা ‘নন্দিত নরকে’র মন্টু একটি বাস্তব চরিত্র। টুনটুনির মতো। অনেকটা যেন উডি অ্যালেনের ছবি ‘পারপল রোজ অব কায়রো’র অবাস্তব জগতের  পর্দা থেকে  বাস্তবে নেমে আসা নায়ক চরিত্রটির মতো। হুমায়ূন আহমেদের অসংখ্য চরিত্রে আছে বাস্তব-অবাস্তবের এই মহামিলন। আছে জীবন্ত হয়ে ওঠা অবাস্তবতার হিরন্ময় জগত।

বাস্তব-অবাস্তবের হিরন্ময় জগত থেকে এবার ফিরে আসি প্রকৃত বাস্তবে।
 
আমরা সেবার, ক্যামেরার মানুষ নাসির আলী মামুন ও আমি, নুহাশ পল্লী গিয়েছিলাম হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে।

shankhonil karagarগাড়িতে তিনি একের পর এক গল্প বলে যাচ্ছিলেন। “শুরু করি এসএম সুলতানকে দিয়ে। খুবই বড় মাপের শিল্পী। তাঁর রং ও ব্রাশ দুটোই খুব পাওয়ারফুল। নাসিরের তো একটা এলবাম আছে তাঁকে নিয়ে। চমৎকার। তো ভাবলাম, এতোবড় একজন শিল্পী এর সঙ্গে আমার ছেলেমেয়েদের পরিচয় হওয়া দরকার। স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের নিয়ে নড়াইলে গেলাম তাঁর ওখানে। শিল্পী ও তাঁর পরিবেশ পারিপার্শ্বিকতা দেখে আমার ছেলেমেয়েরা তো অবাক। স্বাভাবিক। সুলতান ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতের মানুষ। তিনি নিজস্ব যে জগতে বাস করতেন ওই জগতের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আন্তরিক অভ্যর্থনা জানালেন, খাতির যত্নও করলেন। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল এ পর্যন্ত। ফেরার সময় ফিসফিস করে বল্লেন, বড় যন্ত্রনায় আছি ভাই।
কেন কী হয়েছে?
খালি কানের কাছে বিড়বিড় করে।
কারা ?
কারা আবার! জ্বীনেরা। ভাই এই জ্বীনদের যন্ত্রনায় অস্থির হয়ে আছি। সারাক্ষণ কানের কাছে বিড়বিড় করে। কী যে বলে কিছুই বুঝি না।”  

জ্বীনদের কথা উঠলো যখন এবার একটি বাস্তব ঘটনার কথা বলি।
আমার এক বোনের মেয়ে, নামটি উহ্য রাখলাম। আচ্ছা ধরা যাক, ওর নাম পরী। নাম পরী হলেও ও দেখতে মোটেই পরীদের মতো নয়। তবে একবারে ফেলানিও না। বাংলাদেশে ‘ফেলানি’দের বিয়ে হতে সময় লাগে ওর লাগেনি! ওর বিয়েও হয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদের এমন কোনো লেখা নেই যা ও পড়েনি। ওর প্রিয় চরিত্র হিমু নয় মিসির আলী। হিমুকে ওর ভালো লাগে না। কারণ, হিমু খালি পায়ে হাঁটে। আর হলুদ রং ওর খুব অপছন্দের। যে কারণে গায়ে হলুদের সময়, তখন ছিল শীতকাল ও একটু ঝামেলা করেছিল।

২.
২০১০ এ আমি যখন বাংলাদেশে গেলাম পরী তখন শ্বশুড়বাড়ি থেকে পিতৃগৃহে ইচ্ছে করে যে বেড়াতে এসেছে তা নয়। বিয়ের দু’বছরের মাথায় ওর স্বামী ও শ্বশুর এসে ওকে বাবার বাড়ি রেখে গেছে। অভিযোগ, ওর মাথায় ‘ছিট’ আছে। শীতকালে ও অনর্গল কথা বলে একা একা। বৌকে চিকিৎসা করানোর সময় ও সাহস স্বামীর নেই। কিছু পুরুষ মানুষ আছে বাইরে বাঘ আর ঘরে বিড়াল। পরীর স্বামী এই গোত্রের। সে রাজনীতি নিয়ে সদা ব্যস্ত। সবসময়ই সরকারী দলে থাকে। তার বাড়িতে নৌকা, ধানের শিষ আর লাঙ্গলের পাশাপাশি হাসিনা, খালেদা ও এরশাদের ছবি মজুদ আছে। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে সে দলের অধিপতি দেয়ালে উঠে যায়। তো আমি ওকে একবার প্রশ্ন করেছিলাম, ...তা বাবাজি এভাবে বারবার দল বদল..., উত্তরে কোনো রাখঢাক নেই, বল্লো, আঙ্কেল আমিতো বদলে যাইনি। আমিতো আমার জায়গায়ই আছি। সরকার বদলে গেলে আমার কী দোষ।
   
পরীর চিকিৎসার দায়িত্ব তাদের নয়। শ্বশুরের এক কথা, জেনেশুনেই ওরা ছিটগ্রস্থ মেয়েকে ছেলের সঙ্গে গছিয়ে দিয়েছে। পিতা মহাদয়ের এই অকাট্য যুক্তির সামনে ‘বিড়াল’ স্বামীর মিউমিউ করা ছাড়া আর কীইবা করার আছে।

পরী আমাকে দেখেই বল্লো, মামা তুমিতো খুব বিখ্যাত হয়ে গেছ। জানো?

কিভাবে?

fountain-pen হুমায়ূন আহমেদ তাঁর আত্মজীবনী ‘ফাউন্টেনপেন’ এ তোমাকে নিয়ে লিখেছে। তোমাকে বিখ্যাত করে দিয়েছে। তুমি খুশি না?

বাহ, খুশি হবো না কেন? উঁনার মতো একজন জনপ্রিয় প্রতিভাবান লেখক আমার মতো একজন মেধাহীন মানুষের কথা লিখেছেন এটাইতো আমার জন্যে যথেষ্ট। আমাদের দেশের বড় লেখকরা তো কারো নামই উচ্চারণ করতে চান না।

তোমাকে একটা কথা বলি। উনার উচিত হয়নি তোমাকে নিয়ে লেখা।

তা কেন ?

কারণ তুমি হুমায়ূন আহমেদের বিরুদ্ধে যা খুশি তাই লিখেছো। যে সাক্ষাৎকারটির কথা উনি উল্লেখ করেছেন সেটি আমি কয়েকবার পড়েছি তোমার ‘দূরের মানুষ কাছের মানুষ’ বইটিতে। দেশি-বিদেশি লেখকদের কথা বলে আর নানা কায়দা কৌশল করে তুমি প্রমাণের চেষ্টা করেছো যে উনি কোনো বড় লেখকই না। আমার কী মনে হয়েছে জানো, তুমি উনার ভালো ভালো বইগুলো পড়ে দ্যাখোনি। একটিও না।

এই অভিযোগটি সর্বাংশে সত্য নয়।

হান্ড্রেট পারসেন্ট সত্যি। মনে পড়ে, আমি তোমাকে হুমায়ূন আহমেদের মাত্র পাঁচটি বইয়ের নাম বলেছিলাম তুমি একটিও পড়োনি। তারপরও উনি খুব মহৎ ও বড় হৃদয়ের মানুষ বলেই তোমাকে নিয়ে লিখেছেন।

বড় লেখকরা এরকমই হয় মহৎ এবং বড় হৃদয়ের মানুষ।

পরীর সঙ্গে উপরোল্লিখিত কথোপকথনে আমার একবারও মনে হয়নি ওর মাথায় ছিট আছে কিংবা ও শীতকালে একা একা কথা বলার মানুষ।

বরং মনে হয়েছে ওর প্রতিটি কথা যুক্তিপূর্ণ। ও হুমায়ূন আহমেদ’কে একজন বড় মাপের অসাধারণ লেখক মনে করে।

বল্লাম, আমিও ওর সঙ্গে একমত। হুমায়ূন আহমেদ এই সময়ের সবচে’ জনপ্রিয় লেখক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গল্পের চৌকস কারিগর হুমায়ূন আহমেদ নিষ্ঠা মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে আমাদের সাহিত্যকে জনপ্রিয় করে তোলার জটিল ও দুরুহ কাজটি সম্পন্ন করেছেন। যা এর আগে যা একমাত্র রবীন্দ্রনাথের হাতেই সম্পন্ন হয়েছিল।

৩.
গল্পের কথা বলতেই পরী বল্লো, তোমাকে একটি তথ্য দেবো হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে যা তুমি জানো না।
কেউ জানে না। তবে প্রমিজ করতে হবে তুমি আমার একটি অনুরোধ রাখবে।
তথ্যটি আগে শুনবো। তারপরে প্রমিজ।
নো, আগে প্রমিজ তারপর তথ্য।
ওকে, প্রমিজ।
তুমি আমাকে নুহাশ পল্লী নিয়ে যাবে ?
কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে বলতে পারবো।(কর্তৃপক্ষ মানে অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলাম)। তবে নিয়ে যেতে পারবো আশা করি। এবার তথ্যটি বলো।
কাউকে বলবা না তো।
না, বলবো না। এবার বলো।
আমি মরে গেলে তারপর বলতে চাইলে বলবে।
উহ গড! এতো প্যাঁচাচ্ছো কেন ? তুমি এতো তাড়াতাড়ি মরছো না। তথ্যটি এবার শুনি।
তথ্যটি হুমায়ূন আহমেদের গল্প নিয়ে। আই মিন তাঁর গল্পের উৎস নিয়ে।
মানে ? আর না পেঁচিয়ে দয়া করে এবার তথ্যটি বলো।
বলছি। মনোযোগ দিয়ে শুনবে। হুমায়ূন আহমেদ নিয়মিত নুহাশ পল্লী যান। যান না ?
হ্যাঁ যান তো। তা কী হয়েছে।
কেন যান জানো ?
ওটা তাঁর সেকেন্ড হোম।
না, সে কারণে না। ওখানে যায় গল্প পেতে। হিহিহিহিহি।
ওভাবে বোকার মতো না হেসে খুলে বলো।
শোনো মামা, আমি যা জানি তুমি তা জানো না। হুমায়ূন আহমেদ ওখানে রাতের বেলা থাকেন। গভীর রাতে যখন পৃথিবীর সব আলো নিভে যায় তখন তিনি উঠে ড্রয়িংরুমের অন্ধকার মেঝেতে গিয়ে বসেন অনেকটা ধ্যানমগ্ন গৌতম বুদ্ধের মতো। তখন তাঁর কাছে জ্বীন আর পরীরা আসে। ওরা গোল হয়ে বসে তাঁর চারপাশে। তারপর গল্প শোনায়। হুমায়ূন আহমেদ মুখস্থ করে রাখেন, খুবই ট্যালেন্টেড মানুষ, ক্যামিস্ট্রিতে পিএইচডি কিছুই ভোলেন না। পরে লেখেন এক এক করে। এই যে প্রথমআলো, সমকাল, অন্যদিন, কালের কন্ঠে প্রতিবছর তাঁর উপন্যাস ছাপা হচ্ছে তোমার কি ধারণা এগুলো সব তিনি বানিয়ে বানিয়ে লিখেছেন! মোটেই না। এগুলো সব জ্বীনদের কাছ থেকে পাওয়া গল্প। আর অই হিমু, মিসির আলী ওসব জ্বীন পরীদের দেওয়া নাম।
পরী, এসব আজগুবী তথ্য কে দিয়েছে তোমাকে ?  
কেউ দেয়নি, আমি নিজের চোখে দেখেছি।
মানে ? এবার আমার সত্যি বিস্মিত হবার পালা।
আমি একদিন গভীর রাতে পরীদের সাথে নুহাশ পল্লী গিয়েছিলাম। অমাবস্যার রাত ছিল। নিজের চোখে সব দেখে এসেছি। চারপাশে জ্বীন-পরী, আর মাঝখানে গৌতম বুদ্ধের ব্রোঞ্জ মূর্তির মতো বুকের সামনে একহাত তুলে বসে আছেন তিনি।
আমার মাথাটা ঝিমঝিম করছে। রাত অনেক হয়েছে, বাইরে শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ হেলে পড়েছে কিছুটা পশ্চিমে।
পরীর ব্রেন ক্যানসার ধরা পড়লো একদম শেষ মুহূর্তে। মাত্র দু’মাস আগে ঝরা পালকের স্মৃতি রেখে অলৌকিক ডানায় ভর করে পরী উড়ে গেছে দূর কোনো নক্ষত্রের দিকে।

পুনশ্চ: পরীর মতো লাখো লাখো মানুষের হৃদয় জয় করার অসাধারণ ক্ষমতা রাখেন যে মানুষ ‘ক্যানসার’ জয় করা তো তাঁর কাছে মামুলি ব্যাপার। হুমায়ূন আহমেদ, আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে যাবেন। আপনার জন্যে দু’হাত বাড়িয়ে অপেক্ষা করে আছে লাল সবুজের মমতা মাখানো উষ্ণ-আলিঙ্গন। আর এই দূর দেশ থেকে আমরা ক‘জন সুমন রহমান, মনজুর কাদের, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, শহীদুল ইসলাম মিন্টু, নাহিদ কবীর কাকলি, তসলিমা হাসান, শিখা আহমাদ, দিলওয়ার এলাহী, জসিম মল্লিক, আঞ্জুমান আরা রোজি, ফারহানা পল্লব, আহসানুল হাবীব ও আমার পক্ষ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা। আমরা আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করি।

iqbal hasan

 

ইকবাল হাসান,

থান্ডার বে’, অন্টারিও, কানাডা থেকে

 

 

বাংলাদেশ সময় ১৭২৯, নভেম্বর ০৯, ২০১১

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান