ঢাকা, শনিবার, ৮ মাঘ ১৪২৮, ২২ জানুয়ারি ২০২২, ১৮ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

চট্টগ্রাম প্রতিদিন

পরিবেশের ভারসাম্য হারাচ্ছে বন্দরনগরী

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৬০৪ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৪, ২০১৪
পরিবেশের ভারসাম্য হারাচ্ছে বন্দরনগরী ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

চট্টগ্রাম: নদী-খাল-জলাধারে দূষণ, খাদ্যে ভেজাল, সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য ভালো নেই বন্দরনগরী চট্টগ্রামের।

দেশের মৎস প্রজননের প্রাকৃতিক আধার হালদা, বন্দর নগরীর কর্ণফুলি নদীসহ  বিভিন্ন খাল-দিঘি ‌এবং নগরীতে বিক্রিত ফলমুলের গুণাগুণ পরীক্ষায় উঠে এসেছে এ স্বাস্থ্যহানির চিত্র।



গত ২২ ও ২৩ এপ্রিল পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) সরোজমিন পরিদর্শনে এ পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করে।

কর্ণফুলি ও হালদার ৩৬টি পয়েন্ট, নগরীর ১০টি খাল, ৯টি দিঘি এবং ৯টি বাজারের ১১টি ফলের ৫৩টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণে নগরীর পরিবেশ ভারসাম্য আশঙ্ক্ষাজনক হারে নষ্ট হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে।

বৃহষ্পতিবার সকালে নগরীর প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সামনে পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফল ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে সংগঠনটি।

সংবাদ সম্মেলনে পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক মো. আবদুস সোবহান। বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া, দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশের সিটি এডিটর এম নাসিরুল হক, হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ইদ্রিস আলী, সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) চট্টগ্রামের সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার, মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান মাকসুদ প্রমুখ।

নদীতে আশঙ্ক্ষাজনকহারে কমছে ডিও’র মাত্রা
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, কর্ণফুলির নদীতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাণ আশঙ্ক্ষাজনক হারে কমছে । অধিকাংশ পয়েন্টেই কর্ণফুলির পানিতে ডিও’র পরিমাণ ৫ মিলিগ্রামের কম। যদিও, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী নদীর পানিতে প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম বা তদুর্ধ্ব ডিও‘র উপস্থিতি মৎস চাষ, সেচ কাজ, শিল্প কারখানা ও বিনোদনমূলক কাজে এবং প্রতি লিটারে ৬ মিলিগ্রাম বা তদুর্ধ্ব ডিওর উপস্থিতি বেকল জীবাণুমুক্তকরণের মাধ্যমে সরবরাহের জন্য পানির উৎস হিসেবে ব্যবহার উপযোগী।

বক্তারা বলেন, কর্ণফুলি নদীতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাণ প্রতিলিটারে ৩ দশমিক ৩৭ থেকে ৬ দশমিক ৩৭ মিলিগ্রাম। যেসব স্থান দিয়ে পয়োবর্জ্য ও শিল্প বর্জ্য নির্গত হয় সেসব স্থানে ডিও’র পরিমাণ ৫ মিলিগ্রামের অনেক কম।

একইভাবে হালদা নদীতে ওয়াসার ইনটেকের কাছে ডিও পরিমাণ অনেক কম পাওয়া গেছে। ওয়াসার ইনটেকের উজানে ও ভাটিতে বিদ্যমান ঝুলন্ত লেট্রিন ডিও’র মাত্রা কম হওয়ার জন্য দায়ী।

কর্ণফুলি ও হালদার যে সকল স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে তার মধ্যে ওয়াসা ইনটেকের উজান, ওয়াসা ইনটেক, হালদা ও কর্ণফুলির সংযোগস্থল, কালুরঘাট ব্রিজ, শাহাজী খাল, আমানত শাহ ব্রিজ, সিইউএফএল ইনটেক, কনফিডেন্স সল্টের ভাটিতে, রাজ খালি খাল, এস আলম সল্ট এর ভাটিতে, শিকলবাহা পাওয়া স্টেশন এলাকা উল্লেখযোগ্য।

দখল-দূষণে ব্যবহার অনুপযোগী খাল-দিঘী
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, কর্ণফুলি নদীর পাশাপাশি নগরীর খালগুলোও মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।

ফিশারি খালের অবস্থা তুলে ধরতে গিয়ে বক্তারা বলেন, এ খালে ডিও’র পরিমাণ মাত্র শূণ্য দশমিক শূণ্য সাত মিলিগ্রাম।

একই অবস্থা দেখা গেছে চাক্তাই খাল, গঙ্গাবাড়ি খাল, মহেশ খালে।

দিঘিগুলোর অবস্থা তুলে ধরতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, পরিকল্পনার অভাব ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর দায়িত্বহীনতার অভাবে দিঘিগুলোতে পানির ব্যবহার উপযোগিতা নষ্ট হয়ে গেছে। ব্যবহার অনুপাযোগী হওয়ার পরও অনেকেই এসকল দিঘির পানি ব্যবহার করতে গিয়ে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। অধিকাংশ দিঘিই ভরাট, দখল ও দূষণের শিকার।

বক্তারা বলেন, দিঘিগুলো মূলত গৃহস্থলী বর্জ্যের দ্বারা দূষিত হচ্ছে। দিঘিগুলোকে খনন করে চারপাড়ে হাটার পথ (ওয়াকওয়ে) তৈরী করা গেলে দখল নিয়ন্ত্রণ করা যেতো।

নামেই শুধু ফরমালিনমুক্ত বাজার
নগরীর কাজীর দেউড়ি বাজারসহ বিভিন্ন বাজারকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চললেও সেখানে বিক্রিত ফলমুলে ফরমালিন থাকার অভিযোগ করে পবা। ‌ কাজীর দেউড়ি বাজারের আটটি ফলের নমুনা পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে বক্তারা এ অভিযোগ করেন।

বক্তারা বলেন, ‌এসব বাজার শুধু নামেই ফরমালিনমুক্ত, বাস্তবে এসব বাজারে বিক্রিত ফলমুল-সবজিতে ফরমালিনমুক্ত করা যায়নি। সেখানে যে মেশিনগুলো বসানো হয়েছে সেই মেশিনে ফরিমালিন পরীক্ষার যথার্থ পদ্ধতি কার্যকর হয় না। যার কারণে মেশিন থাকা স্বত্তেও কাজীর দেউড়ি বাজারের ২৬ দশমিক ০৬ পিপিএমের সফেদা পাওয়া গেছে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা নগরীর ৯টি এলাকা থেকে আম, আঙ্গুর, আপেল, মালটা, কলা, কমলা, গাজর, টমেটো, আনারস ও নাশপাতির ৫৩টি নমুনায় ক্ষতিকারক রাসায়ানিক ব্যবহারের চিত্র তুলে ধরেন।

বক্তারা বলেন, খাদ্যে রাসায়ানিকের মাত্রা এতো বেশী যে যা নগরীর জনস্বাস্থ্যকে প্রতিনিয়ত হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আইন আছে প্রয়োগ নেই
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, দূষণ, দখল ও খাদ্যে ভেজাল রোধে দেশে আইনের কোন অভাব নেই। কিন্তু, এসকল আইনের বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনগুলো রহস্যজনকভাবে নীরব।

বক্তারা বলেন, অবিলম্বে আইনের মাধ্যমে এ সকল অসাধু প্রক্রিয়া রোধ করা না গেলে আগামী প্রজন্ম ঝুঁকির মুখে পড়বে।

পরিবেশ রক্ষা ও ভেজাল রোধে ১১ দফা
পরিবেশ রক্ষা ও ভেজাল রোধে সংবাদ সম্মেলনে ১১টি সুপারিশ করে সংগঠনটি। সুপারিশগুলো হলো- নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এর দ্রুত বাস্তবায়ন, খাদ্যে রাসায়ানিক মেশানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট ১৯৭৪ এর ২৫ (গ) ধারা প্রয়োগ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা, নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, রাজনৈতিক বিবেচনাসহ কোন ধরণের বৈষম্য ছাড়াই ভেজাল রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ, টিসিবির মাধ্যমে ফরমালিন আমদানি ও বিক্রি, মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার, পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এনবিআর কর্তৃক রাসায়ানিক পরীক্ষা, গণমাধ্যমে ভেজাল খাদ্যের বিজ্ঞাপন পরিহার, ভেজাল সম্পর্কে জনসচেতনা বৃদ্ধি, পরীক্ষাগারগুলোর সমন্বয় ও সক্ষমতা বৃদ্ধি।

বাংলাদেশ সময়: ১৬০৪ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৪, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa