ঢাকা, শনিবার, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ২৬ নভেম্বর ২০২২, ০১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

ফিচার

স্মৃতির নাম ‘প্যারিস রোড’

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২২২০ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২২
স্মৃতির নাম ‘প্যারিস রোড’

রাজশাহী থেকে: হাজারো শিক্ষার্থীদের গান, গল্প, প্রেম, ভালোবাসা ও নানা আন্দোলন; সবগুলোকে এক কথায় প্রকাশ করা বেশ কঠিন। তবে কখনো যদি এই সবগুলোকে এক কথায় প্রকাশ করা হয়, তবে বলতে হয় এই সবকিছুর অপর নাম ‘প্যারিস রোড’।

রোববার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী নাইমুল ইসলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পিচঢালা পরিষ্কার যে রাস্তাটির দুই পাশে বেড়ে উঠেছে গগণ শিরীষ গাছ, সেই রাস্তাটি নিয়েই কথা বলছিলেন নাইম।

তার ভাষ্যে, ‘একপাশের গাছগুলো যেন আরেক পাশের গাছগুলোকে আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে। গাছের পাতার এমন মেলবন্ধনে ভালোবাসার পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে সূর্যের আলো। সে আলো আবার সবুজ পাতাকে ভেদ করে রাস্তায় ঠিকরে পড়ছে। কখনো আটকে যাচ্ছে পাতায়। সব মিলিয়ে আলোছায়ার সুন্দর চিত্র নিয়মিত ফুটে ওঠে এই রাস্তায়। সৌন্দর্যের প্রতিমা হয়ে যুগের পর যুগ ধরে জেগে আছে এই ‘প্যারিস রোড’। একই সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য অর্ধশত বছরের পুরনো এই সড়কটি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা ফটক থেকে শেরে বাংলা ফজলুল হক হল পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার ধরে বিস্তৃত এই রাস্তাটিতে রয়েছে এক অন্যরকম অনুভূতি। রাস্তার দুই পাশে গগন শিরিষ গাছ যেন রাস্তার প্রহরী। অনেকটা উপরে গিয়ে ডালপালা মেলেছে চারপাশে। দুই পাশের গাছের ডালপালা রাস্তার মাঝে শূন্যে আলিঙ্গন হওয়ার নেশায় ব্যাকুল। এ যেন প্রকৃতির শরীরী খেলা। গাছের চিড়চিড়ে ঘন পাতা রাস্তায় মেলে ধরেছে এক লম্বা শামিয়ানা। তার পাশেই বড় পুকুর, আছে আম বাগান। সেখানে বসে সময় কাটানোর জন্য আছে বসার বেঞ্চও।

প্যারিস রোড সম্পর্কে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান ইমন বলেন, এ রাস্তায় প্রিয়জনের হাতের আঙুল ধরে হাঁটা যায়, গম্ভীর মনে জেগে ওঠে প্রেম, নির্বাক শ্রোতা গলা ছেড়ে গেয়ে ওঠে গান। যখন পথ হাটি, মনে হয়, এই পথ যদি না শেষ হয়...!

আর বিজ্ঞান বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ইমরান হোসেন বলেন, কেবল সকালের সূর্য নয়, পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাওয়া, কিংবা সন্ধ্যার পর থেকে সারি সারি ল্যাম্পপোস্টের আলোয় এই রাস্তা সাজে বাহারি রূপে। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন ঋতুতে এই রাস্তার দৃশ্য পাল্টে যায়। বসন্তের ঝরা পাতার বৃষ্টি, বর্ষায় পাতা চুঁইয়ে পড়া ফোঁটা ফোঁটা জল কিংবা শীতের সকালে কুয়াশা মোড়ানো রাস্তাটি সত্যিই মন ছুঁয়ে যায়।

এত বিশেষত্ব থাকলেও প্যারিস রোডের জন্মের ইতিহাস কিন্তু অনেকটা সাদামাটা। ১৯৬৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধিকরণের লক্ষ্যে ক্যাম্পাসের কাজলা রোড থেকে শেরেবাংলা হল পর্যন্ত এই গগন শিরীষ গাছ লাগানো হয়। তৎকালীন উপাচার্য এম শামসুল হক ফিলিপাইন থেকে কিছু গাছ নিয়ে আসেন। তিনি এ গাছগুলো রোপণের দায়িত্ব দেন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী মোহাম্মাদ ইউনুসকে। তাঁর হাত ধরেই লাগানো হয় গাছগুলো। তখন এটি ছিল নেহাৎ বৃক্ষরোপণের একটি উদ্যোগ। রাস্তাটির সঙ্গে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের রাস্তাগুলোর অনেকটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় বলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একে প্যারিস রোড বলতে থাকেন। সেই থেকে রাস্তাটি প্যারিস রোড নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

আড্ডা ও গানের আসরেরও একটি আদর্শ জায়গা এ রাস্তা। গভীর রাতেও প্যারিস রোড থেকে ভেসে আসে ছাত্রদের সম্মিলিত কণ্ঠে গানের সুর। মন খারাপের সময়ে দুপাশে সারি সারি সোডিয়াম লাইটের নিচে আলো-আঁধারি পরিবেশে হেঁটে প্রশান্তি খুঁজে পান অনেকে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন কোনো শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে এলে প্রথমেই মনে পড়ে মমতায় ঘেরা রাস্তাটিকে এক নজর দেখে আসি। রাতে হঠাৎ যদি কারো ঘুম উধাও হয় চোখ থেকে, কিংবা বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় গরমে জীবন যায় যায় অবস্থা, সেই মুহূর্তে অনেকের মনে পড়ে প্যারিস রোডের শীতল হাওয়ার আত্মাটাকে একটু জুড়িয়ে নেওয়ার কথা। সব মিলিয়ে এক কথায় স্মৃতির আরেক নাম যেন এই প্যারিস রোড।

বাংলাদেশ সময়: ২২১৯ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২২
এইচএমএস/জেআইএম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa