ঢাকা, শনিবার, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২৫ মে ২০২৪, ১৬ জিলকদ ১৪৪৫

আইন ও আদালত

রাজনৈতিক এবং নির্বাচনী সংস্কার জাতীয় অগ্রাধিকার

সাইফ উদ্দিন আহমেদ | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩২৪ ঘণ্টা, এপ্রিল ১০, ২০১৪
রাজনৈতিক এবং নির্বাচনী সংস্কার জাতীয় অগ্রাধিকার

ঢাকা: বাংলাদেশের জনগণ উৎসবমূখর পরিবেশে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পছন্দ করে। নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশা করে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য স্থানীয় এবং জাতীয় নির্বাচন।


 
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিরপেক্ষভাবে দুর্নীতির তদন্ত করবে। সমাজের সকলের জন্য আইনের সমান প্রয়োগ হবে। কথায় কথায় রাস্তায় তাণ্ডব সৃষ্টি, জ্বালাও-পোড়াও এর বদলে সংসদই হবে আলাপ-আলোচনা, যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান এবং জাতির অগ্রগমনের বিষয়ে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেয়ার স্থান।

শিক্ষার উন্নয়ন, স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান, নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবেশ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হবে রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতির মূল ইস্যু- এ প্রত্যাশা আমাদের সকলের।

রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের এ প্রত্যাশা পূরণ হবে না কারণ ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি সমাজে ধনী-দরিদ্রর ব্যবধান বাড়ানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। ক্ষমতাকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে দলমত নির্বিশেষে একদল অন্যায়ভাবে পয়সাওয়ালা হয় আর ক্ষমতা কাঠামোর যাতাকলে সাধারণ মানুষ দিন দিন নিঃস্ব হয়।
 
রাজনীতিবিদগণ দেশ পরিচালনা করেন। তাদের যোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা, দূরদর্শিতা এবং রাজনৈতিক দর্শনের উপর নির্ভর করে দেশ কতটা এগুবে কিংবা কত দ্রুত এগুবে।

তারা ক্ষমতায় থাকেন কিংবা বিরোধী দলে থাকেন ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে গঠনমূলক এবং ইতিবাচক রাজনীতি করতে হবে। জনগণের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন নিশ্চিতকরণ এবং জাতীয় স্বার্থে তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভংগি ও সংস্কৃতি এক এবং অভিন্ন হতে হবে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। জনগণ তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে আইন প্রণয়নে সাংবিধানিক ক্ষমতা ভোগ করে থাকে এবং এই প্রতিনিধিত্ব হয়ে থাকে সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে।

১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে পরবর্তী সংসদগুলো প্রত্যাশিত পর্যায়ে ভূমিকা পালন করছে না। আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদের মূল কাজ হলো আইন প্রণয়ন করা, সরকারের নির্বাহী বিভাগের কাজ পর্যবেক্ষণ বা তদারকি করা, কমিটির শুনানির মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া।

বাংলাদেশের সংসদ সদস্য সংক্রান্ত সাংবিধানিক ও আইনি বিধি-বিধানে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকায় আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির তেমন পরিবর্তন ঘটছে না। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংসদ সদস্য হিসেবে বিভিন্ন আর্থিক ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা না থাকা, সংসদ সদস্যদের জন্য আচরণবিধি না থাকা, সংসদে ৮৯ কার্যদিবস পর্যন্ত অনুপস্থিতির অনুমোদন, দলের বিপক্ষে ভোট দিলে বা দলের পক্ষে ভোটদানে বিরত থাকলে সদস্যপদ বাতিল, উপজেলা পরিষদে ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ থাকা অন্যতম।

অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় উন্নয়ন বরাদ্দের অপব্যবহার, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের সাথে ক্ষমতাধরদের সংশিশ্লষ্টতার অভিযোগ পত্রিকায় প্রায়শ‍ঃই দেখা যায়। এসব নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে সরকারদলীয়-বিরোধীদলীয়, নারী-পুরুষ, মন্ত্রীসভার সদস্যপদ ইত্যাদি বিষয় কোনো প্রভাব ফেলে না।
 
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সংসদকে সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও ৭ম সংসদ মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১) মোট ৩৮২ কার্যদিবসের মধ্যে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সংসদ বর্জন করে ১৬৩ কার্যদিবস। ৮ম জাতীয় সংসদের মেয়াদে (২০০১-২০০৬) মোট ৩৭৩ কার্যদিবসের মধ্যে ২২৩ কার্যদিবস সংসদে অনুপস্থিত থাকে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ।

টিআইবির সদ্য প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নবম সংসদ মেয়াদে (২০০৯-১৩) মোট ৪১৮ কার্যদিবসের মধ্যে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ৩৪২ কার্যদিবস সংসদ বর্জন করে।

১০ম সাধারণ নির্বাচন আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে অন্ধকারময় করে দিলো যেখানে মোট আসনের অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্যগণ নির্বাচিত হয়েছেন।

মন্ত্রী-সাংসদদের হলফনামা নিয়ে রাজনীতিতে যখন সমালোচনার ঝড় বইছে, তখনই একটি খবর প্রচারিত হলো যে, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান ও ঢাকার সাংসদ আসলামুল হক নির্বাচন কমিশনে ভুল তথ্য দিয়েছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যাদের সম্পপদের হিসাব নিয়েছে, তারাই ভুল তথ্য দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন। দুদক যদি অন্যদের হিসাব চাইত তাহলে এই স্বঘোষিত তথ্যদাতার সংখ্যা হয়ত অনেক বেশি হতো। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন ভুল তথ্য দেয়ার জন্য সদস্যপদ বাতিল করার বিধান রাখার যে প্রস্তাব করেছিল, সেটিই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

১৯৭৩ সাল থেকে শুরু করে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১০টি সংসদ পেয়েছে বাংলাদেশের জনগণ। দারিদ্র, শিক্ষার অনগ্রসরতা, যাতায়াত ব্যবস্থার অসুবিধা এদেশের ভোটারদের দমিয়ে রাখতে পারেনি কখনো। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালে ১ম সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছে ৫৩.৫৪% ভোটার, ১৯৭৯ সালে ২য় সংসদ নির্বাচনে ৪৯.৬৭%, ১৯৮৬ সালে ৩য় সংসদ নির্বাচনে ৫৯.৫৮% ভোটার, ১৯৮৮ সালে ৪র্থ সংসদ নির্বাচনে ৫৭,২০% ভোটার, ১৯৯১ সালে ৫ম সংসদ নির্বাচনে ৫৪.৯৩% ভোটার, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারি ৬ষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে ২০.৯৭% ভোটার, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন ৭ম সংসদ নির্বাচনে ৭৪.৮১%, ২০০১ সালে ৮ম সংসদ নির্বাচনে ৭৪.৩৭%, ২০০৮ সালে ৮৬.৩৪% এবং ২০১৪ সালে ৪০% ভোটার ভোট দিয়েছে।

রাজনৈতিক এবং নির্বাচনী সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এলে আগামীতে স্থানীয় এবং জাতীয় নির্বাচনগুলোতে ৯ কোটি ২১ লাখ ২৯ হাজার ৮৫২ ভোটারের মধ্যে ন্যূনতম ৮০% ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে।

১ম সংসদ নির্বাচনে ১১ জন, ২য় সংসদ নির্বাচনে ১১ জন, ৪র্থ সংসদ নির্বাচনে ১৮ জন, ৬ষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে ৪৯ জন এবং ১০ম সংসদ নির্বাচনে ১৫৩ জন মাননীয় সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অপমানকর। ভবিষ্যতে এ ঘটনা আর ঘটবে না তা জাতি হিসেবে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোকেও খুজে বের করতে হবে ১৯৯১ সালের পর থেকে ক্ষমতাসীন দলগুলোই কেন বারবার নির্বাচনে হেরে যাচ্ছে। জনগণ হয়ত বারবারই ক্ষমতাসীনদের বিদায় করছে। দলীয় আদর্শকে ছড়িয়ে দেয়ার পরিবর্তে জোটের রাজনীতিতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো। দ্বিদলীয় বৃত্তে আটকে গেছে বাংলাদেশ। যতই দিন যাচ্ছে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দলের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ৭ম সংসদে ৮১টি রাজনৈতিক দল, ৮ম সংসদে ৫৫টি দল, ৯ম সংসদে ৩৮টি রাজনৈতিক দল এবং ১০ম সংসদ নির্বাচনে মাত্র ১২টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।

অনুষ্ঠিত হচ্ছে উপজেলা নির্বাচন ২০১৪। বিরোধীদের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালের আন্দালন গড়ে তুলতে না দেয়ার উদ্দেশ্যে সম্ভবত নির্বাচনকে টেনে দীর্ঘায়িত করা হলো। উপজেলা পরিষদ এর কাজ কি কি হবে এবং সংসদ সদস্যদের ভুমিকা ও কর্তত্ব কি থাকবে সেটা অনিষ্পন্ন রেখেই ৫ পর্বে অনুষ্ঠিত হলো স্থানীয় সরকারের এ গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। মে মাসে অনুষ্ঠিত হবে ৬ষ্ঠ দফার নির্বাচন। দফায় দফায় যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে নির্বাচন কমিশন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে তাদের সদিচ্ছা ও দক্ষতার প্রমাণ রাখতে পারেনি। নির্বাচন নিয়ে সহিংসতা, জাল ভোট দেয়া, নির্বাচনী এজেন্টকে বের করে দেয়া, ভোটকেন্দ্র দখলের মতো যে বিষয়গুলো আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতি থেকে বিদায় নিয়েছিল, বলতে গেলে তার সবই ফেরত এসেছে এবারের উপজেলা নির্বাচনে। আচরণবিধি লংঘনের ঘটনা ঘটছে কিন্তু কোনো আইন লংঘনকারী শাস্তি পেয়েছে বলে আমরা শুনিনি।
  
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বিশাল আয়তনের এবং অনেক ভাষাভাষী, বর্ণ ও গোত্রের মানুষের দেশ হওয়া স্বত্ত্বেও সে দেশের নির্বাচন কমিশন জনগণের আস্থার প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিণত হতে পেরেছে। সরকার, বিরোধী দল, গণমাধ্যম ও জনগণ সকলেই কমিশনকে সহায়তা করে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, সুষ্ঠু ও নিরেপক্ষভাবে দায়িত্ব পালন, সময়পোযোগী সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণ এ সফলতার মূল রহস্য বলে জানিয়েছেন সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে যাওয়া ভারতের প্রাক্তন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এস ওয়াই কুরায়শী।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও সম্ভব জনআস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার। এর জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সার্চ কমিটির মাধ্যমে আমাদের নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের বাছাইকরণ একটি উদ্যোগ প্রসংশনীয়। তবে বাছাই প্রক্রিয়ায় শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত এবং সমর্থন নিশ্চিত করা আবশ্যক।

স্থানীয় এবং জাতীয় নির্বাচনের সময় ক্ষমতাসীনদের বিশেষ সুবিধা গ্রহণ একেবারে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে এবং সকল প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনকালীন সময়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য, টেলিভিশনে প্রচারিত খবর, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভিযোগ প্রতিনিয়ত আমলে নিতে হবে এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। গণমাধ্যম তথ্য ও ছবি দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করতে পারে।

নির্বাচনী আচরণবিধি প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক সকলেই যাতে মেনে চলে তা নিশ্চিত করতে হবে কমিশনকে। তরুণদের এবং নারীদের ভোটার হতে উদ্বুদ্ধ করতে প্রতিছর বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে কমিশন। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নারীদের জন্য আলাদা বুথ এবং বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করাকে সর্বচ্চো অগ্রাধিকার হিসেবে নিতে হবে কমিশনকে। কমিশনের উদ্যোগে আচরণবিধি লিফলেট আকারে, পত্র-পত্রিকায়, রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচার করতে হবে।

প্রত্যেক প্রার্থীকে নির্বাচনের পূর্বে ব্যাংক একাউন্ট খুলতে বাধ্য করতে হবে এবং তার মাধ্যমে যাবতীয় খরচ করতে হবে। আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে আয়কর বিভাগের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। নির্বাচনকালীন ব্যয় পর্যবেক্ষণের জন্য মোবাইল টিম করে দিতে হবে। প্রার্থীর আয়-ব্যয়, সম্পদ ও দায়-দেনার হিসাব যাতে এলাকার ভোটাররা ভোট প্রদানের পূর্বে জানতে পারে, কমিশনকে সে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তুলনামূলক তথ্য বিবরণী লিফলেট আকারে ছাপিয়ে প্রার্থীদের নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের মাঝে বিতরণ করতে হবে যাতে ভোটারা জেনে-শুনে-বুঝে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী বাছাই করতে পারে।

গণমাধ্যমকে সহযোগী করে রাজনৈতিক দলগুলোকে আইন মানতে বাধ্য করা গেলে এবং জনগণকে প্রার্থী সম্পর্কে জেনে-শুনে-বুঝে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দিতে পারলে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন হতে পারে কার্যকর ও সৃজনশীল তথা জন আস্থার প্রতিষ্ঠান।

রাজনৈতিক দল একটি সংবিধান স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান এবং দলের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব কমিশনে জমা দেয়ার বিধান করা হয়েছে। দলের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা জনগণের কাছে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই তথ্য প্রকাশ করা উচিত কিন্তু নির্বাচন কমিশনে জমাকৃত রাজনৈতিক দলগুলোর আয়-ব্যয়ের তথ্য দেশের ভোটাররা জানে না।
     
এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ দিয়ে আইন অনুযায়ী তা ন্যায়নীতির ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাজনীতি ব্যবসার মূল প্লাটফর্ম হয়ে দাড়িয়েছে। ভূমি দস্যুরা রাজনৈতিক শক্তিতেই তাদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে আসছে। এগুলোর সাথে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবনমনের যোগসূত্র অস্বীকার করার উপায় নেই।

বাংলাদেশে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের জন্য একটি নতুন নির্বাচন প্রয়োজন এবং সেই নির্বাচন কোন ব্যবস্থায় হবে, সে জন্য বাংলাদেশের প্রধান দুটি দলের মধ্যে সমঝোতা আবশ্যক - ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মানবাধিকার-বিষয়ক সর্বদলীয় কমিটির আয়োজনে ৩১ মার্চ ২০১৪ লন্ডনে অনুষ্ঠিত এক সভায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টেরিয়ানরা এই অভিমত প্রকাশ করেছেন।

৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর বাংলাদেশের দুই প্রধান দলের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এই আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, নতুন একটি নির্বাচন না হলে দেশটির গণতন্ত্রের ভবিষ্যত হবে ভয়াবহ। বিএনপির অভিযোগ দেশে আওয়ামী লীগ কর্তৃক একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে এবং অর্থনীতির স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতের যোগসাজশে দেশটিতে মৌলবাদের উত্থান ও সহিংস পন্থায় সরকার উৎখাতের চেষ্টা চালানোর জন্য বিএনপিকে দায়ী করে আওয়ামী লীগের পক্ষ থকে দাবী করা হয়, দেশে এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে এবং উন্নয়নের ধারায় তা অগ্রসর হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের ইস্যু এড়িয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগ বলছে, বিএনপি যখন সিটি কর্পোরেশন এবং উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে, তখন বর্তমান সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে তাদের অস্বীকৃতি আযৌক্তক ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত। বিএনপি বলছে, পুলিশ ও প্রশাসনের দলীয়করণের কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলেই বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি এবং ভবিষ্যতেও নেবেনা বলে জানিয়েছে।

বাইরের কোনো শক্তি নয়, দাতাগোষ্ঠীর চাপে নয়, আমাদের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান আমাদরেকই করতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নে প্রধান দুটি দলের দিকেই তাকিয়ে আছে সারাদেশের মানুষ। নির্বাচন কমিশন যতই শক্তিশালী হোক মূলত‍ঃ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। দুদক যতই দুর্নীতিবাজদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে সচেষ্ট হোক সরকারের নিরপেক্ষ মনোভাব ছাড়া সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত ও কলুষমুক্ত রাখা সম্ভব নয়।

মাননীয় সংসদ সদস্যগণ শুধুমাত্র নিজ দল এবং সমর্থকদের প্রতিনিধি না হয়ে দেশের সকল জনগণের প্রতিনিধি হতে পারলে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নের চাকাকে সচল করার এ প্রচেষ্টায় প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান, অনুসন্ধানী গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি, উপস্থাপন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধো দূরত্ব দূর করতে কার্যকর অনুঘটকের ভুমিকা পালন করতে পারে দেশের দায়িত্বশীল দলনিরপেক্ষ গণমাধ্যম এবং  সুশীল সমাজ।

সাইফ উদ্দিন আহমেদ, সিনিয়র প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর (গর্ভন্যান্স), দি হাঙ্গার প্রজেক্ট।

বাংলাদেশ সময়: ১৩১৮ ঘণ্টা, এপ্রিল ১০, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।