ঢাকা: অভাব ঘুচিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ২০১৬ সালের দিকে ইরাকে পাড়ি জমান নবাবগঞ্জের দড়িকান্দা গ্রামের মোসলেম মোল্লা (৩০)। কিন্তু ইরাকে থাকাকালীন কয়েকজন বাংলাদেশি মোসলেমকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
এমন করুণ অবস্থা ও নির্যাতনের ভিডিও দেখে ছেলের মুক্তির জন্য কাতর মোসলেমের মা খতেজা বেগম ১২টি বিকাশ নম্বরে ছয় লাখ টাকা পাঠান অপহরণকারী চক্রের কাছে। এই ঘটনায় মোসলেম মোল্লার মা খতেজা বেগম বাদী হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় একটি মামলাও করেন। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে পিবিআই ঢাকা জেলা এই মামলার তদন্তভার নেয়।
তদন্তের এক পর্যায়ে বরিশাল, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মাগুরা এবং খুলনায় অভিযান চালিয়ে আট জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তারা সবাই ইরাকে মোসলেম মোল্লাকে নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনায় জড়িত।
সোমবার (২৯ আগস্ট) পিবিআই সদরদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সংস্থাটির ঢাকা জেলার ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার মো. কুদরত-ই-খুদা।
তিনি বলেন, মোসলেম মোল্লা ২০১৬ সালে জীবিকার তাগিদে কাজের উদ্দেশ্যে ইরাক যান। ইরাকে অবস্থানকালে সেলিম মিয়া ও শামীমসহ আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা আসামিরা মোসলেম মোল্লাকে কাজের কথা বলে ইরাকে তার বর্তমান কর্মস্থল থেকে অন্যত্র অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে ইমো অ্যাপের মাধ্যমে কল দিয়ে সাত লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে তারা। মুক্তিপণ না দিলে তার ছেলেকে হত্যা করবে বলে হুমকি দেয় চক্রটি।
অপহৃতের মা খতেজা বেগম তার ছেলেকে বাঁচানোর জন্য নবাবগঞ্জ থানাধীন পাড়াগ্রাম বাজার থেকে ১২টি বিকাশ নম্বরে ছয় লাখ টাকা দেন। পরবর্তীতে আসামিরা ভুক্তভোগী যুবককে মুক্তি না দিয়ে আবারও তার মায়ের কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করে।
পরে ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর, ৬ অক্টোবর, ২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এবং ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট ও ২৩ আগস্ট বরিশাল, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মাগুরা এবং খুলনায় ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তাররা হলেন আলী হোসেন (৪৯), মো. শামীম (২৫), শিরিন সুলতানা (৩৫), মোহাম্মদ ঘরামী (৫১), রবিউল ঘরামী (২৪), শাহিদা বেগম (৫২), সাহনাজ আক্তার লিপি (৩৮) ও মো. আকবর সরদার (৫৫)।
পুলিশ সুপার মো. কুদরত-ই-খুদা বলেন, ইরাকে অবস্থানকালে ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি সেলিম মিয়া নামের একজনের সঙ্গে ভুক্তভোগী যুবকের পরিচয় হয়। সেলিম ভুক্তভোগী যুবককে ভালো বেতনের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে আসামি আনোয়ার, শাহনেওয়াজ, রুহুল আমিন, মনির, হাসিবুর ও সাব্বিরের হাতে তুলে দেন। আসামিরা ভুক্তভোগী যুবক মোসলেমকে নিয়ে একটি আবদ্ধ রুমে আটক করে তার সঙ্গে থাকা দুই হাজার ইউএস ডলার ও দেড় লাখ টাকা মূল্যের আইফোন ছিনিয়ে নিয়ে তাকে নির্যাতন করতে থাকে।
তিনি বলেন, তিনদিন ধরে নির্মম, বর্বর নির্যাতনের পর সেই নির্যাতনের দৃশ্য ইমো অ্যাপের মাধ্যমে লাইভ ভিডিও কলে নিহত যুবকের মা খতেজা বেগমকে দেখায় এবং সাত লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।
ভুক্তভোগীর মা খতেজা বেগম ছেলের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আসামিদের পাঠানো ১২টি বিকাশ নাম্বারে ২৬টি ট্রানজেকশনের মাধ্যমে মোট ছয় লাখ টাকা পাঠান। আসামি আনোয়ার, শাহনেওয়াজ, রুহুল আমিন, মনির, হাসিবুর ও সাব্বিরকে ইরাকে অবস্থান করলেও বাংলাদেশে তাদের পরিবারের সদস্যরা এই মুক্তিপণের টাকা বিভিন্ন বিকাশ এজেন্টের দোকান ও নিজেদের পারসোনাল বিকাশ নম্বর থেকে ক্যাশ আউট করে নেয়।
শাহনেওয়াজ অপহরণ চক্রের দলনেতা। গ্রেপ্তার আট জন আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হলে ছয় জন ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন।
পুলিশ সুপার আরও জানান, আটক আসামিদের নামে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এরমধ্যে আলী হোসেন (৪৯), মোহাম্মদ ঘরামী (৫১) ও রবিউল ঘরামীর (২৪) বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর ও মুন্সীগঞ্জের সদর থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা রয়েছে। এছাড়াও আসামি মো. আকবর সরদারের (৫৫) বিরুদ্ধে মাগুরার মহম্মদপুর থানার মামলা মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা রয়েছে।
বাংলাদেশ সময়: ১৯৪০ ঘণ্টা, আগস্ট ২৮, ২০২৩
এসজেএ/এসআইএ