ঢাকা, শুক্রবার, ২২ আশ্বিন ১৪২৯, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

জাতীয়

কবর দেওয়ার জন্য জায়গা মেলেনা হিজড়াদের!

সুমন কুমার রায়, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১২ ঘণ্টা, আগস্ট ১১, ২০২২
কবর দেওয়ার জন্য জায়গা মেলেনা হিজড়াদের! ফাইল ছবি

টাঙ্গাইল: দেশে ‘হিজড়া’ বলে পরিচিত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা পরিবার ও সমাজ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। তারা যথাযথ মর্যাদা পায় না।

খাদ্য-বস্ত্রের প্রয়োজনে রাস্তায়-রাস্তায় কাটে তাদের পুরো জীবন। কেউ কেউ তাদের ‘চাঁদাবাজ’ আখ্যায়িত করলেও হিজড়া সম্প্রদায়ের দাবি জীবন-জীবীকার তাগিদে বাধ্য হয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলতে হয়।  

সরেজমিনে হিজড়াদের জীবন মান দেখে বোঝা যায়, খাদ্য-বস্ত্রের খোঁজেই পার হয় হিজড়াদের জীবন। অধিকাংশ হিজড়াদের নেই নিজস্ব বাসস্থান, নেই মানসম্মত কর্মসংস্থান। ভাড়া বাড়িতে কাটিয়ে দিতে হয় তাদের পুরো জীবন। সারাদিন ঘুরে যে উপার্জন হয় তাতে খাদ্য আর বস্ত্রের ব্যবস্থা করাই দায়। এমনকি মৃত্যুর পরও মেলে না কবর দেওয়ার জায়গার অধিকার! 

হিজড়াদের জীবনমান নিয়ে বাংলানিউজের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় অসংখ্য হিজড়ার সঙ্গে। বেরিয়ে আসে তাদের জীবনযাত্রার প্রকৃত চিত্র।

হিজড়ারা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। অথচ সমাজে অবহেলার দায় নিতে হয় নিজেদেরকে। জন্মের পর বোঝার উপায় নেই কে হিজড়া। ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে থাকে তাদের আচরণ। যখন পরিবার বুঝতে পারে তাদের সন্তান হিজড়া তখন পরিবার নানাভাবে সামাজিক চাপে পড়তে থাকে। সামাজিক চাপে পরিবার সন্তানের প্রতি কদর কমিয়ে দেয়। পরিবারের পর মেলে খেলার সঙ্গীদের অবহেলা। বন্ধুদের কাছ থেকে এমন প্রাপ্তি যেন হিজড়াদেরকে নতুন সমাজ গঠনের দিকে ঠেলে দেয়। হিজড়া শিশুরা অধিকাংশ স্কুলে ভর্তি হতে পারে না। নানা কৌশলে তাদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়। সমাজে হেয় হয়ে যখন হতাশাগ্রস্থ হয় তখন হিজড়ারা খুঁজে একটি দল, সঙ্গ। পাশেই হিজড়াদের ঐক্যবদ্ধ চলাচল দেখে তখন তারা দলে ভিরে। এভাবেই হিজড়ারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে চলাচল শুরু করে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের যথাযথ দায়বদ্ধতা থাকলে হিজড়াদের হয়তো রাস্তায়-রাস্তায় জীবন পার করতে হতো না।
সামাজিক সম্মানবোধ ও অধিকার বঞ্চিত, অবহেলিত, যথাযথ কর্মক্ষেত্রের অভাববোধ থেকে হিজড়ারা মানুষের কাছে হাত পেতে জীবন জীবিকা চালাতে শুরু করে। এদেরকে স্বাভাবিক কর্মক্ষেত্রের ব্যবস্থা করাটা জরুরি মনে করেন হিজড়া নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো।

বাংলাদেশে হিজড়া সম্প্রদায় মোট জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ হলেও সমাজসেবা অধিদফতরের প্রাথমিক জরিপ মতে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার ছিল। তবে ২০২২ সালের জনশুমারি মতে দেশে হিজড়ার সংখ্যা ১২ হাজার ৬শ’ ২৯ জন। এ জনগোষ্ঠী অবহেলিত ও অনগ্রসর গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। সমাজে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার এ জনগোষ্ঠীর পারিবারিক, আর্থসামাজিক, শিক্ষা ব্যবস্থা, বাসস্থান, স্বাস্থ্যগত উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ সর্বোপরি সমাজের মূলধারায় এনে দেশের সার্বিক উন্নয়নে সম্পৃক্তকরণ অতি জরুরি বলে মনে করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

টাঙ্গাইল জেলা হিজড়া সংগঠন বন্ধনের দেওয়া তথ্য মতে, জেলাতে সাতশ’র বেশি হিজড়া রয়েছে। সুবিধাবঞ্চিত এসব হিজড়াদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তাদের জীবনমান।  

জেলার ধনবাড়ির লিলি নামের একজন হিজড়া জানান, শৈশবেই শুরু হয় পরিবারের অবহেলা। অতপর বন্ধু ও সমাজের অবহেলা থেকে চলে আসেন হিজড়া সম্প্রদায়ের দলে। এখন এ দলের সঙ্গে মিশেই চলছে তার জীবন জীবীকা।  

একই কারণে হিজড়া দলে চলে এসেছেন কালিহাতীর বৈশাখী। পরিবারের সঙ্গে তার তেমন কোনো যোগাযোগ নেই। সমাজের চাপ থেকে পরিবারকে রেহাই দিতে পরিবার বিচ্ছিন্ন বৈশাখী।

নাগরপুরের জেরিন শেখ জানান, শৈশবে তার শরীর ও মানসিক পরিবর্তন হতে থাকলে শুরু হয় অবহেলা। বন্ধুদের সঙ্গে মেশার সুযোগ পাননি। স্কুলে গেলে বন্ধুরা তার সঙ্গে মেশেনি। বন্ধুরা বলতেন ‘হিজড়া’, ‘হাফ লেডিস’। পরিবারও তাকে সাপোর্ট করেনি। এরপর স্কুল ছাড়েন জেরিন। তারপর আর পড়ালেখা করতে পারেননি তিনি। সরকারিভাবে বিউটিশিয়ানের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরও তিনি আর্থিক সহযোগিতা না পাওয়ায় পার্লার চালু করতে পারছেন না।  

একই অপবাদে তৃতীয় শ্রেণির পর আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেনি এলেঙ্গা পৌর এলাকার মর্জিনা। সমাজে নানা অধিকার বঞ্চিত হয়ে হিজড়া দলে যোগ দিয়েছেন টাঙ্গাইল সদরের সোহানা।

টাঙ্গাইল জেলা হিজড়া সংগঠন বন্ধনের সভাপতি জেরিন শেখ বলেন, জেলাতে সাত শতাধিক হিজড়া রয়েছেন। এরা সুবিধা বঞ্চিত মানুষ। সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে এরা সবসময় সুবিধা বঞ্চিত থাকেন। সম্মানজনক কর্মসংস্থান না পেয়ে এরা রাস্তায় রাস্তা ঘুরে উপার্জন করেন। মানসম্মত উপার্জন ব্যবস্থা থাকলে এদের রাস্তায় ঘুরে উপার্জন করতে হতো না।

উপার্জনের বড় অংশ ধারাবাহিকভাবে গুরুদের ভাগ দিতে হয়। এরপর যা থাকে জীবন জীবীকা চালানোই কষ্টকর। সরকারিভাবে ৫০০ টাকা হিজড়া ভাতা থাকার নিয়ম থাকলেও ভাতা পাচ্ছে ৫০ উর্ধ্ব বয়সের হিজড়ারা। কম বয়সি হিজড়ারা জীবন জীবীকার খোঁজে রাস্তায় নামেন।

তিনি বলেন, সমাজে আমাদের সম্মান নেই। আমরা হোটেলে বসলে স্বাভাবিক মানুষ অন্য টেবিলে চলে যান। বাসের সিটে বসলে উঠিয়ে দেন। কখনও স্বাভাবিক মানুষ চলে যান অন্য সিটে। হাসপাতালে একজন হিজড়া ভর্তি হলে রোগিরা অন্য সিটে চলে যায়। এমন কি কবরস্থানেও কবর দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত এরা। একজন হিজড়া মারা গেলে অনুরোধ করে কবর দেওয়ার জায়গা নিতে হয়। আমি নিজেও টাঙ্গাইলের একটি কবরস্থানে দুই শতাংশ জায়গা কিনে রেখেছি আমার কবরের জন্য।

সংগঠনের পক্ষ থেকে জেরিন আরও বলেন, তিনটি লিঙ্গের একটিকে বাদ দিয়ে দেশকে উন্নয়ন করা সম্ভব না। দেশকে উন্নয়ন করতে হলে তিন জাতিকেই সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে। হিজরাদের পূণর্বাসন, হিজড়া ভাতা নিশ্চিত করা, চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আলাদা সিটের ব্যবস্থা করা, সকল কাজে হিজড়াদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি নিশ্চিত করাসহ হিজড়াদের জন্য আলাদা কলোনি তৈরির দাবি জানান তিনি।

তবে সমাজসেবা অধিদফতর তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। সমাজসেবা অধিদফতরের তথ্য অনুসারে, ২০১২-১৩ অর্থ বছর ৭টি জেলাতে পাইলট প্রকল্প শুরু হয়। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে মোট বরাদ্দ ছিল বাহাত্তর লাখ  সতের হাজার টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ১৪টি জেলায় কর্মসূচি সসম্প্রসারণ করে মোট ২১টি জেলায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। ওই অর্থ বছরে ২১টি জেলার জন্য মোট বরাদ্দ ছিল চার কোটি সাত লাখ একত্রিশ হাজার ছয়শত টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে পূর্বের ২১ জেলায় বাস্তবায়িত হয়। ওই অর্থ বছরে কর্মসূচির মোট বরাদ্দ ছিল চার কোটি আটান্ন লাখ বাহাত্তর হাজার টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে পূর্বের ২১ জেলাসহ নতুন ৪৩টি জেলায় কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে মোট ৬৪ জেলায় এ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে মোট বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ আট কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে মোট বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ নয় কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে মোট বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ এগার কোটি পয়ত্রিশ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে মোট বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ এগার কোটি চল্লিশ লাখ  টাকা। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে মোট বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ পাঁচ কোটি ছাপ্পান্ন লাখ টাকা। ২০২০-২১ অর্থ বছরে মোট বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ পাঁচ কোটি ছাপ্পান্ন লাখ টাকা। স্কুলগামী হিজড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৪ স্তরে (জনপ্রতি মাসিক প্রাথমিক ৭০০, মাধ্যমিক ৮০০, উচ্চ মাধ্যমিক ১০০০ এবং উচ্চতর ১২০০ টাকা হারে) উপবৃত্তি দেওয়ার কথা থাকলেও স্কুলে ভর্তি হতেই হোঁচট খেতে হয় তাদের।

এদিকে ৫০ বছর বা তদুর্ধ বয়সের অক্ষম ও অসচ্ছল হিজড়াদের বিশেষ ভাতা জনপ্রতি মাসিক ৫০০ টাকা দেওয়া হলেও ১-৪৯ বছর বয়সিদের অন্যের কাছে হাত পেতেই চলতে হয়। হিজড়াদের দাবি তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনে বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া।

মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আজাদ বলেন, হিজড়াদের জীবন অত্যন্ত মানবেতর। হিজড়াদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের তেমন সুযোগ নেই। জীবন জীবিকার তাগিদে হিজড়া সম্প্রদায় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাটা জরুরি। জাতির উন্নয়নে পুরুষ-স্ত্রীর পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গ হিজড়াদের সম্পৃক্ততার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

টাঙ্গাইল জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. শাহ আলম জানান, টাঙ্গাইলে ৩ শতাধিক হিজড়া রয়েছে। এদের মধ্যে ৫০ ঊর্ধ্ব বয়সী ৫৮ জনকে সরকার ভাতা দিচ্ছে। প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে বয়সসীমা নেই। হিজড়াদের ক্ষেত্রেও বয়সসীমা শিথিল করতে আমরা সুপারিশ করেছি। পুনর্বাসন নিয়েও সরকার ভাবছে।

বাংলাদেশ সময়: ২০১০ ঘণ্টা, আগস্ট ১১, ২০২২
এসএ
 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa