পাউবো কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও ঠিকাদারদের দুর্নীতির কারণেই ভেঙে গেছে হাওরের ফসল রক্ষার বাঁধগুলো- তাদের অনেকের অভিযোগ এমনটাই।
তবে যাদের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ সেই পাউবোর কর্মকর্তারা কি ভাবছেন? তা জানতে মুখোমুখি হলাম কিশোরগঞ্জ পাউবো অফিসের কর্মকর্তাদের।

বাঁধ ভেঙে হাওরের ফসলহানিতে পাউবোর গাফিলতি কতটুকু? এ প্রশ্নের উত্তরে নিয়তিকেই দায়ী করলেন পাউবো কর্মকর্তারা।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানালেন, ভাটি অঞ্চলের উজানে ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে অসময়ে বৃষ্টিপাতই এর জন্য দায়ী।
তার দাবি উজানে ‘প্রিসিপেটেশন’ কারণে এই ঢল। এর মানে অতি অল্প সময়ে অত্যধিক বৃষ্টি।
তিনি বলেন, এবার অতি অল্প সময়ে অনেক বেশি পানি চলে এসেছে। ২৪ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে ২০ ফুট পানি ঢল আকারে হাওরে প্রবেশ করে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ছয় মিটার উচ্চতার পানি যদি থার্স্ট আকারে আসে তবে কি মাটির ভঙ্গুর বাঁধ এই পানি আটকাতে পারে।
তার মতে, যদি এই পরিমাণ বৃষ্টিই দুই তিন দিনের গ্যাপ দিয়ে দিয়ে হতো, তাহলেও পানি পাস করতে পারতো অনায়াসে। কৃষকরাও কিছুটা হলেও সতর্ক হওয়ার সুযোগ পেত।
২০০৪-৫ সালের দিকে দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীতেও এরকম একটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বললেন, সেদিন রাতেও সেখানে মানুষ হেঁটে নদী পার হয়েছে। অথচ শেষরাতে এক ঘণ্টার মধ্যেই পুরো দুর্গাপুরকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় আচমকা আসা ঢলের পানি। তিনি বলেন, পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা পানির চাপ থাকে অত্যন্ত বেশি। এছাড়া হাওরের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া আমাদের নদীতে বাঁধ নেই। বাঁধ আছে হাওরকে ঘিরে। যদি নদীর দুই ধারে বাঁধ থাকতো তবে হয়তো হাওর তলিয়ে যাওয়া ঠেকানো যেত। এছাড়া নতুন মাটি দিয়ে বাঁধ তৈরি হওয়ার কারণেও পানির চাপ সহ্য করতে পারেনি বাঁধগুলো। মোট কথা এটা একটা ন্যাচারাল ডিজাস্টার।
পাশে বসা ছিলেন একই দপ্তরের সাব ডিভিশনাল প্রকৌশলী মো. আখতারুজ্জামান। তিনি জানালেন, গত ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে এবার এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বৃষ্টি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। আর এই পানি সব প্রবাহিত হয়েছে হাওরের উপর দিয়ে।
পাশাপাশি কিশোরগঞ্জে হাওর তলানোর পেছনে পাউবোর কোনো ভূমিকা নেই উল্লেখ করে তারা জানালেন, এই জেলায় পাউবোর বাঁধের আওতায় তেমন কোনো হাওর নেই। পাউবোর আওতাধীন বাঁধ শুধু আছে অষ্টগ্রামের হুমাইপুর ও দেওঘরে। সেখানে ক্ষতি হয়নি। ইতোমধ্যেই কৃষকরা সেখানে ধান কেটেও নিয়ে গেছেন।
তবে খুব শিগগিরই জাপানি প্রকল্প সহায়তায় বাঁধ দিয়ে কিশোরগঞ্জের নয়টি হাওরকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনার কথা জানালেন পাউবো কর্মকর্তারা।
হাওরে মাটির বদলে কংক্রিটের বাঁধ সমস্যার সমাধান করতে পারে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, কংক্রিট দিয়ে বেঁধে দেয়ার খরচ অত্যন্ত বেশি হবে। এর বদলে নদীর নাব্যতা বাড়াতে হবে। এছাড়া সিসি ব্লক ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রেও খরচ অত্যন্ত বেশি হবে। সিসি ব্লকের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণে ১৫ কোটি টাকারও বেশি খরচ হতে পারে- যোগ করলেন তিনি।
হাওর দ্রুত ডোবার পেছনে পাউবোর ডিজাইনিংয়ে ত্রুটি আছে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে অনেক জায়গায়।
তবে ডিজাইনিংয়ে ত্রুটি থাকার কথা অস্বীকার করলেন পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী।
তিনি বলেন, পাউবোর ডিজাইন বিভাগ গত ২০-৩০ বছরের রেইনফলের ডাটা আমলে নিয়ে বাঁধগুলোর ডিজাইন করেন। কিন্তু এবারে এত অল্প সময়ে এত বেশি বৃষ্টিপাত একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা। সেক্ষেত্রে ডিজাইন বিভাগের উপর দোষ চাপানোর কিছু নেই।
সব মিলিয়ে এবারের অকাল ঢলে হাওর তলিয়ে যাওয়ার পেছনে তাদের কোনো গাফিলতি নেই উল্লেখ করে বিষয়টিকে প্রকৃতির খেয়াল হিসেবেই দাবি করলেন পাউবো কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ সময়: ০৯২৫ ঘণ্টা, মে ১০, ২০১৭